জানালায় মায়ের মুখ

প্রশান্ত মৃধাঃ
এতদিন পরে একটা ব্যাপার ভেবে অবাক হই! ঢাকা থেকে বাগেরহাট যাওয়ার সময়ে রূপসা ঘাটের কাছে বাস এলেই, সারারাতের ক্লান্তি প্রায় উধাও, এতক্ষণ ঘুমজড়ানো চোখ খুলে গেছে। ফেরি ওপারে থাকলে বিরক্তি, এখনও আসছে না কেন? অথচ আরিচা-দৌলতদিয়া ঘাটের অনিশ্চয়তা ও পদ্মায় ফেরি সংক্রান্ত জাটিলতা উজিয়ে এই যে রূপসা নদীর কূল পর্যন্ত পৌঁছেছি, এত ক্লান্তিতে এখন বাসের সিটে চোখ বুজে সেঁধিয়ে থাকার কথা। তা ঘটত না। তখন অপেক্ষা বাস কখন ওপারে যাবে?

ওপারে গেলেই আজন্ম পরিচিত ভূগোল। বিশেষ করে সেই সদ্য আলো ফোটা সকালে নিচু রাস্তার দু’পাশের গাছ ও ক্ষেত, সেখানে নিশির শিশির কিছু জমে আছে এখনও; বর্ষাকাল হলে চারদিকে ভেজা ভাব, আশ্বিনে ধানগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, কোথাও ক্ষেতের মাঝখানে কি এক পাশে চিংড়ির ঘের। প্রতিটি বাড়ির সীমানায় নারকেল-সুপারি আর দু-একটি তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই কাঁটাখালির মোড়ে এসে বাসটা বাঁয়ে ঘুরে যাবে। তারপর আর কতটাইবা পথ! সে পথের দু-পাশের প্রকৃতিও একই। গাছের পাতার রঙের সবুজ একটু কালচে অথবা গাঢ় সবুজ! পাশের রাস্তার পাশের খাল কি ক্ষেতের মাঝখানের পগারের জলের নোনা রঙ। হ্যাঁ, নোনা রঙ; অর্থাৎ জল ঘন আর ঘোলাটে, হাতে নিলে বোঝা যায় ভারি। এইসব এমনভাবে দেখি, যেন বহু বহু দিন দেখা হয়নি এসব কিছুই।

আমি ফিরছি। তখনও, বলাই বাহুল্য, রূপসা সেতু হয়নি। ঘরে ফেরার কথা তো লিখতাম চিঠিতে। তাছাড়া বিভিন্ন পার্বণের ছুটিতে ছেলে যে আসবেই এ কথাও বাড়ির সবারই জানা থাকত। তবে বাবার চিঠিতে বাড়ি ফেরা নিয়ে কোনো নির্দেশ না থাকলেও মায়ের চিঠিতে লেখা থাকত, ছুটি হলেই বাড়ি আসবি!

কিন্তু, আজও ভেবে পাই না, রূপসা নদী পেরোলেই কেন অমন লাগত! চারদিকের চেনা প্রকৃতি। সেও তো আমি ছেড়ে গেছি অনেক দিন, এখন আমার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিদিনের চেনা গণ্ডি। সেখানে বন্ধু ও সহপাঠী। প্রয়োজনে ঢাকা শহরে যাই। সেখানেও আছে স্কুলজীবনের বন্ধুরা। এই যে প্রকৃতি আমায় জাগিয়ে তুলছে, একি আজন্ম বেড়ে ওঠা নিজের পরিচিত জমি বলে? নাকি মায়ের কাছে যাচ্ছি? মাকে চিঠিতে জানিয়েছি, আজ আসব আমি। জানি মা আলো ফোটার আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছেন জানালার কাছে। কখন দেখা যাবে আমার রিকশা! কোনো কোনোবার এত ভোরে ফিরি যে, তখনও আবছা আঁধার, কখনও বেলা উঠে যায়। কিন্তু সব সময়ই ঘরে পৌঁছানোর আগে দেখি, মা জানালায় তাকিয়ে আছেন।

অথচ, যেদিন এসব ছেড়ে গিয়েছিলাম? যেতে হয়েছিল। যেভাবে অনেককেই যেতে হয়। এপ্রিলের সেই বিকেলটার কথা আজও স্পষ্ট মনে আছে। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে বেশ আগেই, কিন্তু তেজ কমেনি। আমি বাক্স-পোটলা নিয়ে তৈরি। বিকেল পাঁচটা কি সাড়ে পাঁচটায় বাস। ঘর থেকে বের হওয়ার পরে বুঝলাম, এখনও দিনের আলো থাকবে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক।

কিন্তু রিকশাটা আমাদের গলি থেকে বড় রাস্তায় পড়তেই, মায়ের মুখ মনে পড়ে। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছি, ‘মা, আসি বলে।’ যেভাবে স্কুল বা কলেজে যাওয়ার আগে বলতাম। কিন্তু আসার সময় মা বুঝে গেছে, এই যে ছেলে পড়তে যায়, এই যে বাড়ির বাইরে যাচ্ছে, আর হয়তো সেভাবে ফিরবে না। আমার সঙ্গে বাবা, তুলে দিতে সঙ্গে যাচ্ছেন স্টেডিয়ামের সামনে ঢাকার নাইট কোচের স্ট্যান্ড পর্যন্ত। সেখানে দেখা করতে বন্ধুদের কেউ না কেউ আসবে। সে সময়ে আমরা কয়েকজন মিলে ঢাকায় আসতাম। আজ আমি যাদের সঙ্গে যাব, তাদেরও পৌঁছে দিতে কেউ না কেউ আসবে। বাসস্ট্যান্ডে কিছুক্ষণ ছোটখাটো আড্ডা হবে। তখন জানা যাবে, এখন যারা ছাড়তে এসেছে তাদের কে-কে ক’দিন বাদে আসছে ঢাকায়।

এই দিনগুলোও একদিন শেষ হয়। তারপর কেউ আবার বাড়ি ফেরে, বেশির ভাগই ফেরে না। জীবিকার প্রশ্নে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। জীবনের নিয়মে সেখানে বদল ঘটে। তখন বাড়ি ফেরা তার কাছে আয়োজন। এই বাড়ি ফেরা অর্থ যদি হয় মায়ের কাছে ফেরা, সেখানে সে আয়োজনের যে চিরকালীন টান তা সহজেই বুঝতে পারি, আমার সঙ্গে অনেকেই মিলেমিশে যাবে। তাই খুব স্বাভাবিক। মফস্বল শহর থেকে কি গ্রাম থেকে যারা দূরের শহরে পড়তে যায়, তাদের কাছে ফেলে আসা নিজের পরিচিত গণ্ডি ফিরে যাওয়া কখনও কখনও কয়েকদিনের জন্য দেখতে যাওয়ার। সেখানে পরিবার, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব যারা আছে, তাদের সঙ্গে দেখা হয়। প্রায় সবার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন তার কাছে, কবে এসেছে? এর পরই পরের প্রশ্ন, কবে যাবে? তার মানে এই মানুষটা এখন এখানে প্রায় আগন্তুক। অথচ, এর ঠিক উল্টোটা মায়ের কাছে। সন্তান তো মায়ের কাছে এসেছে, কিন্তু যাওয়ার কথা উঠলেই মা বলবে, আর দুটো দিন থেকে যা। যদি সুযোগ থাকে থেকে যাওয়ার, যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসার আগে আবার বলবে আরও একটা দিন থাকতে পারবি না?

তাই, ঘরে ফেরা যদি মায়ের কাছে ফেরা হয়, যদি ‘দেখিলে মায়ের মুখ ঘুচে যায় সব দুখ’-এর মতো লোকছড়ার গুরুত্ব এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, তাহলে সেই মুখ দেখার জন্য মহাসড়ক ও নৌপথের অব্যবস্থাপনা ও জট, ক্লান্তি আর কষ্ট জানা থাকার পরেও সবাই যায়। তাই কখনও কখনও মনে হয়, ওই যে রূপসা নদ পার হওয়ার পরে আমার ইন্দ্রিয়গুলো জেগে যেত, তা যেমন একই সঙ্গে নিজস্ব প্রকৃতির কাছে ফিরতে পারার অবর্ণনীয় আনন্দের জন্য, একই সঙ্গে একটু পরে মার সঙ্গে দেখা হবে, মা পথ চেয়ে বসে আছে, সে জন্যও! দুই-আড়াই দশক আগে সবারই তাই ঘটত। কিন্তু গত অন্তত পনেরো বছর ধরে বিষয়টা একটু উল্টে গেছে মোবাইল ফোনের জন্য।

ঘরে পৌঁছানোমাত্র মায়ের জানতে চাওয়া, পথে অসুবিধা হয়েছে?

বলতাম, ‘না, আরিচায় ফেরির সিরিয়ালে অনেক সময় গেছে।’

‘রাতে খাইচিস কিছু?’

‘হু। ঘাটে (অথবা ফেরিতে) ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত।’

‘তাও তো তোর মুখটা এমন শুকনো শুকনো লাগতিচে কেন?’

এই প্রশ্নের উত্তর কী? কোনো সন্তান জানে? মা যে সব জান্তা। ছেলের মুখ দেখে সব বুঝে যায়। হয়তো তখন রাস্তা তৈরি হচ্ছে রাজবাড়ী থেকে যশোর পর্যন্ত, অথবা যশোরের পর থেকে খুলনা পর্যন্ত, ঝাঁকুনিতে সারারাত দু’চোখ এক করা যায়নি। অথবা, পথে দু’বার টায়ার পাংচার হয়েছে বাসের। অথবা, রাজবাড়ী কি ঝিনাইদহে অল্পের জন্য অ্যাকসিডেন্ট হয়নি আমাদের বাসটার, অথবা হয়েছে। কিন্তু সে কথা বলে এখন মাকে উদ্বিগ্ন করার কী দরকার, বাড়ি তো এসেছি ঠিকঠাক। তবু চুপ করে তো থাকা যায় না।

‘না, এমনি।’

‘এত যখন দেরি হয়েছে, যশোরে থামার পরে একটু চা-বিস্কুট খেয়ে নিতি।’

মার ধারণা, হয়তো সব বাঙালি মার ধারণা খিদে লাগলেই মুখ শুকিয়ে যায়, অথবা মুখ শুকানোর আসল কারণ ছেলের খিদে লেগেছে। কিন্তু নিজে বুঝতে পারছি মুখটুখ কিছু শুকোয়নি, পথের ক্লান্তিতে এই দশা।

ততক্ষণে সামনে বসিয়ে মাথায় হাত বুলানো শেষ। মা সেই ভোর কি সকালে ছেলের জন্য চা বানাতে গেছে।

আর যদি বাস আসতে বেশি দেরি হয়ে থাকে, তাহলে মায়ের উৎকণ্ঠার জবাবে কী বলা যায়। যদিও মা বলে চলে, ‘আজ টেনশনে শেষ, তোর আসতে এত কেন দেরি হয়। কতক্ষণ যায় আর আমি জানালার কাছে যাই, এই বুঝি তুই আসিস। একবার ভাবি, পথে কোনো কিছু হলো কি-না? (মা অ্যাকসিডেন্ট বা দুর্ঘটনা বলবে না। ওই ‘কিছু’ ভেতরে সেটা আছে, ওকথা মুখে যেমন আনতে চায় না, মনেও না), তারপর তোর বাবা হাঁটতে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে খোঁজ নিয়ে শোনে আজ একটা বাসও আসেনি। ঘাটে কী যেন হয়েছে।’

জানি, ওকথা জানার পরেও মার জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ানো নিশ্চয় বিরাম ছিল না। শুনে, মার মুখটাই আমার বরং শুকনো লাগে। কেন যেন মনে হয়, মা সারারাত ঠিক মতো ঘুমায়নি।

চা-র জল চাপিয়ে দিয়ে এসে মার প্রথম কথা, ‘হাতমুখ ধো। জামা-কাপড় ছাড়। পথের ধুলো।’

আমি জানি, এই আদেশ মেনে একটু যদি তাড়াতাড়ি মায়ের সামনে ফিরে না আসি, তাহলে অন্য ঘরে আমাকে খুঁজতে যাবে। ডেকে এনে সামনে বসাবে। বিস্কুট ও চায়ের কাপ সামনে দিয়ে সামনেই বসে থাকবে। এই ক’মাসে আমার কী পরিবর্তন হয়েছে তা দেখবে। স্বাস্থ্য ভালো হয়ে থাকলে সে কথা বলবে না। কিন্তু একটু যদি রোগা লাগে তাহলে বলবে, ‘তুই কিন্তু একটু শুকিয়ে গেছিস! আজকাল খাও-টাও না? নাকি সারাদিন টো টো করে খালি ঘোর?’

অন্য সময় হলে হয়তো একটু ঝাঁজের সঙ্গে বলতাম, ‘কী যে বলো?’ কিন্তু এই মাত্র এসেছি, এখন এভাবে বলা যায়? তাছাড়া গত কয়েক বছর বাড়ি ছাড়ার পরে এ কথাও তো জানা হয়েছে, মার এই পর্যবেক্ষণ চলবে। হলে কী খাই, সে খাওয়া কেমন তার জানা আছে। তাই হয়তো খেতে বসলে পাতে আরও এক টুকরো বা একটা মাছ তুলে দিতে দিতে বলবে, ‘হলে কী খাও না খাও! এই দুইদিন বাড়ি আইচো, বেশি করে খা!’

দুই দিন। এ যদি এ সপ্তাহ কিংবা পনেরো দিনের ছুটিও হয়, তবু এই দুই দিন। দুই দিন কোনোভাবেই বাড়ে না। হয়তো সে দিনগুলো অনেক অনেক দিন দূরে সরিয়ে রেখে এসে এখনও মায়ের কাছে ফিরলে সেই দু’দিন কোনোক্রমেই বাড়েনি। যদিও এখন দু’দিনই যেন আমার কাছে আক্ষরিক অর্থে সত্যি। তা কখনও কখনও বেড়ে এক সপ্তাহ হয়। এর বেশি তো মার কাছে থাকা হয় না। সে সুযোগও ঘটে না।

কিন্তু সেই যে ফেরা, মায়ের কাছে যাচ্ছি, তা তো প্রায় একই আছে। যদিও মোবাইল নামক প্রযুক্তির কল্যাণে মাকে আর সেই উৎকণ্ঠা পোহাতে হয় না। অন্যদিকে ব্যবস্থাটা উল্টে গেছে। যতই বাড়ির দিকে এগোয় ততই মাঝে মাঝে ফোন আসতে থাকে, এখন কোথায়? এত দেরি হচ্ছে কেন? আর কতক্ষণ লাগবে? কখনও দুপুরের দিকে পৌঁছানোর কথা থাকে, তাহলে না খেয়ে বসে থাকবে মা। তখন যদি ফোন করে বলি, মা আমার পৌঁছতে দেরি হবে, তুমি না খেয়ে বসে থেকো না। সেকথা শোনার মানুষ মা নন। খুব সকালে পৌঁছানোর কথা জানলে তখন একটু দেরি হলেই ফোন, আর কতক্ষণ?

সন্তানকে কাছে পাওয়ার আকুতিই প্রকাশিত হয় এ জানতে চাওয়ায়। আবার আমিও তো যাচ্ছি মার কাছে। মার কাছে কখনও বড় হওয়া হয়ে ওঠে না। কখনও বুঝমান হওয়াও না। তার কাছে মনে হয়, বাড়ির পথ আজও যেন চিনি না ঠিকঠাক। তাই বারবার ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে এটা জেনে নেওয়ার সে তাগিদ তার। হয়তো জানালার সামনে দাঁড়িয়ে মা দেখতে পায়, ছেলের শৈশব আর কৈশোরকে। স্কুল থেকে কেন আসছে না। সন্ধ্যা হয়ে গেল এখনও খেলে ফিরছে না কেন? মা মনে করে, ছেলে তার এখনও তাই আছে। একমাত্র সামনে এলেই স্বস্তি!

আর আমিও, সেই ঘরে না ফেরা বালক কিংবা কিশোর কিংবা সদ্য তরুণ! আমারও চোখে ভাসে জানালার কাছে মায়ের মুখ। একটু দেরি হলে মার অবধারিত গালমন্দ! মার কাছে ফেরা মনে পড়লে, জানালার কাছে মার সেই মুখখানা কোনোভাবেই চোখে থেকে সরে না। আমাকে দেখামাত্র সে মুখ হাসল না, কিন্তু চোখের একদম ভেতর পর্যন্ত যে জুড়িয়ে গেল, তা কোনোদিন ভোলা যায় না!

তাই, মার কাছে ফেরা মানে, নিজস্ব প্রকৃতির ভেতরে যেমন নিজেকে পাওয়া, একই সঙ্গে মার ওই মুখটাও দেখা! যে মুখ আমার কাছে সেই শৈশব থেকে আজও পর্যন্ত একই! কোনো দিনও তা বদল হবে না!