বিছানার পাশে আম্মা!

রুবী রহমানঃ
আমার শৈশবের আনন্দময় স্মৃতিগুলোর একটি হলো আমার মায়ের গলায় রবীন্দ্রনাতের কবিতা শুনতে পাওয়া। আমার মায়ের খুব প্রিয় বই ছিলো রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা। আমার শৈশবে, তাঁর গৃহকর্মের ফাঁকে, সময়ে-অসময়ে তিনি সজোরে আবৃত্তি করতেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা। বরান্দায় একখানা চেয়ার পাতা থাকত। কাজের ফাঁকে তিনি চেয়ারটিতে গিয়ে বসতেন আর সঞ্চয়িতা খুলে উচ্চকণ্ঠে পড়তেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা।

ছেলেবেলাতেই শিশু ভোলানাথের কবিতাগুলো আমার প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছিলো মায়ের গলায় শুনে শুনে। ‘তিনটে শালিখ ঝগড়া করে রান্না ঘরের চালে’- এই ছবিটা খুব সহজেই মিলিয়ে নিতে পারতাম পরিচিত গৃহস্থালীর সঙ্গে। কবিতার সঙ্গে আমার সংশ্নেষের ভবিতব্যটিও হয়তো সেই সময়েই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

আমাদের আট ভাইবোনের মা তিনি। অনেক গুন ছিল আমাদের মায়ের। তিনি গান গাইতেন। চমৎকার অর্গান বাজাতেন তিনি। অর্গানের রিডে তাঁর ফর্সা নৃত্যপর আঙুলের দ্রুত সঞ্চালন আর সুরের মায়া মিলে যেন একটা ম্যাজিক ঘটে যেত। ভালো ছবি আঁকতেন তিনি। আর নিপুন এমব্রয়ডারি করতেন।

সর্বোপরি খুব ভালো রান্না করতেন আমাদের মা, আমরা তাঁকে ‘আম্মা’ বলে সম্বোধন করেছি। ছেলেবেলায় একেবারে ‘বিনামূল্যে’ পেয়ে গেছি আম্মার সমস্তটুকু। তাই কোন কিছুই মূল্যবান বলে জ্ঞান করিনি। এখন ভাবনা-চিন্তা করে আম্মা যে ভাবে রান্না করতেন সেভাবে রাঁধবার চেষ্টা করি। এখন, এই পরিণত বয়সে, মনে হয় আম্মা বোধকরি সব কাজকেই শিল্পিত করে তুলবার চেষ্টা করেছেন। এমনকি রন্ধনকেও তিনি শিল্পে পরিণত করেছিলেন। আম্মার রান্নাগুলো ছিল দৃষ্টিনন্দন আর বর্ণিল। হালুয়া বানিয়ে তিনি আলপনা-করা সাজে ঢেলে নয়নাভিরাম খাদ্যবস্তু আমাদের মুখে তুলে দিতেন। তিমি মাছের স্টু রান্না করতেন। কী অনবদ্য পরিমিতিবোধ ছিল সেই রুই মাছের স্টুতে। কিছু মিষ্টান্ন রান্না করতেন আমাদের মা। দুধের ক্ষির বানিয়ে তাতে পোস্তদানায় খাবার রঙ মাখিয়ে সেই পোস্তদানায় মুড়ে দিতেন মিস্টিগুলো। সেই মিষ্টির বর্ণচ্ছটা আর স্বাদ- কোনটিই ভুলবার নয়।

সবার ভাগ্যে কি আর মায়ের কাছে ফেরা হয়! যারা চাইলেই, এখুনি, মায়ের কাছে ফিরতে পারেন তাঁরা নিঃসন্দেহে ঈর্ষনীয়। শৈশবে মাকে ছাড়া এক-পা-হাঁটা যে সন্তানের পক্ষে সম্ভব হয়নি, পরিণত বয়সে সে পৃথিবীতে ঘুরে ফিরে বেড়ায় মায়ের দৃষ্টিসীমার বাইরেই। মায়ের মনশ্চক্ষুতে অবশ্য দুর্ণিরীক্ষ্য সন্তানকেও কখনও কখনও দেখা সম্ভব হয়ে ওঠে। অলৌকিকতা ব্যতিরেকেও তা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু মায়ের কাছে ফেরা! সে হয়তো কোনো কোনো মানুষের জন্য কেবল স্বপ্নেই সম্ভব হয়ে থাকে। আমি, নিজে, এখনও কোনো সংকটে পড়ে হয়তো স্বপ্ন দেখি আমার আম্মা পরিবারের সকলকে নিয়ে বসে আছেন খবার টেবিলে, কিম্বা শোবার ঘরে, বিছানায়। বিছানায় বা বিছানার পাশে আম্মা! আহা কীূ আরাম! এতেই তো কেটে যায় অর্ধেক আধার। মানে অর্ধেক সংকট।