বীরাঙ্গণা রমা চৌধুরীকে মনে রাখার যোগ্য আমরা?

অজয় দাশগুপ্তঃ
মুক্তিযুদ্ধ এখন একটা বিপণনের বিষয়। বিশ্বাস না হলে দেশের দিকে তাকান। নিজেই উত্তর খুঁজে পাবেন। এই যে রমা চৌধুরীর বিদায় নিয়ে দেখুন কী কাণ্ড! তাঁর মৃত্যুর পর মিডিয়া খুলে মনে হবে কত আনন্দে আর ভালোবাসায় ছিলেন তিনি? আসলে কি তাই?

আমি নিজে দেখেছি তাঁর কষ্ট ও বেদনা কত প্রচণ্ড ছিল। এরা আমাদের দেশের সেই মানুষ যাঁদের ত্যাগ বিনা এদেশের জন্ম হতোনা। কিন্তু সব ফাঁকা বুলি। সব লোক দেখানো। তাঁর কষ্টের জীবন আর দু:খ নিয়ে কথা বাড়াতে চাইনা। একদিন যারা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছিল তারাই আজ মায়াকান্না কাঁদছে। এটাই অপমানের।

আমাদের দেশ ও সমাজ কতটা নষ্ট হয়েছে তার একটা বড় চিত্র আছে এতে। রমা চৌধুরীর জীবিত ছেলেটি এখন মিডিয়ায় এসে কান্নাকাটি করছে। কারণ তার জানা আছে এখন স্পর্শকাতর সময়ে ভালো করে অভিনয় করতে পারলে কিছু নগদ জুটবে। এটাই আমাদের দেশের বাস্তবতা। এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি এমনকি রমাদি’র বইয়ের টাকা শোধ না করা বি চৌধুরীসহ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে দেখাবেন কে কতটা করতে পারেন। এই ছেলে সে সুযোগ নেয়ার জন্য তৈরি। অথচ জীবদ্দশায় মায়ের খোঁজ নেয়নি।

যে নিয়েছিল সে জন্মসূত্রে মুসলিম। আলাউদ্দিন খোকন নামের এই লোকটি সারাজীবন রমাদি’কে সহায়তা করে গেছেন। গাঁটের টাকা বা টাকা জোগাড় করে তাঁর বই বের করে দিয়েছেন। মা ডাকা আর মা মানা দুটি ভিন্ন বিষয়। এই মানুষটি মেনেছিলেন। তাই কখনো রমাদি’র অমর্যাদা হতে দেননি। আজ তিনি পাদ-প্রদীপের আলোয় নাই। বরং বলে দিয়েছেন কিছু দিলে ছেলেকে দেয়া হোক। কে বলে আমাদের সমাজে সব মন্দ? সব ভেসে গেছে খারাপের বন্যায়? এই মানুষটি প্রমাণ করে দিয়েছেন ধর্ম-বর্ণ বা জাত এগুলো বিষয় না। বিষয় না সাম্প্রদায়িকতা। দেশে যখন ধর্ম আর আচার মিলে সর্বগ্রাসী মানুষ মানুষকে সেভাবে দেখার কারণে বন্ধুত্ব-আত্মীয়তা এমনকি সম্পর্ক প্রায় নষ্টের পথে তখন আলাউদ্দীনের মতো কিছু মানুষই আলোকবর্তিকা।

কই আমরা কেউতো পারিনি! কেউ তো এগিয়ে এসে দিদির জীবনে দাঁড়াইনি। কারণ সবার একটা হিসেব নিকেশ আছে। কতটা করলে কতটা লাভ বা লোকসান। সে হিসেবের বাইরে সবাই পা রাখতে পারেনা। একটা দেশে মুক্তিযুদ্ধ বা তার ইতিহাস কখন বেগবান হয়? কখন সত্যিকারের পথ খুঁজে পায়? আসুন প্রকাশিত একটা খবরে চোখ রাখি:

“বঙ্গভবনের দরবার হল ও কার্নিভাল হলের মাঝখানের করিডোর। বাঙালি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিকপাল হিসেবে এখানে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ জন বিখ্যাত মণিষীর ছবির পোর্ট্রেট টাঙানো। কিন্তু এ ছবিগুলোয় অনুপস্থিত বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

প্রদর্শিত ছবিগুলো দেখে মনে হয়েছে শুধুমাত্র ১৯৪৭ সালের আগে ও পরের মণিষীদেরই বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি এসময়ের বিখ্যাত কাউকেই রাখা হয়নি এখানে।

যেমন ছবির সারিতে নেই, অতীশ দীপঙ্কর, নেই বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বোস বা জগদীশ চন্দ্র বসুর পোর্ট্রেট। কবিদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, কায়কোবাদ ও জসীম উদ্‌দীনের পোর্ট্রেট থাকলেও, নেই বাংলা ভাষার অন্যতম কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা জীবনানন্দ দাশের মুখচ্ছবি। নারীদের মধ্যে বেগম রোকেয়া স্থান পেলেও নেই প্রীতিলতার ছবি। তিতুমীরের পোর্ট্রেট থাকলেও, নেই মাস্টারদা সূর্যসেন।”

এই খবর দেখে আপনার কি মনে হয় যে আসলেই আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক জাতি? বা যারা এখন মসনদে তাঁরা আসলেই অসাম্প্রদায়িক? যদি তাঁরা তা হতেন এ খবর কি তাদের অজানা? জানার পর ও তারা কোন অ্যাকশানে যায়নি। কারণ তারা ভালো জানেন, এদেশের আমজনতাকে খুশি রাখতে হলে মুখে যা বলেন কাজে তা করা যায়না। বা করবেন না। এরপর আপনি কিভাবে নিশ্চিত যে রমা চৌধুরী এদেশের ইতিহাসে জায়গা পাবেন? আমি খেয়াল করে দেখেছি ইতিহাস গান কবিতায় ঈশা খাঁ বা তীতুমীরকে নিয়ে কথা থাকলেও বাস্তবে সূর্যসেন বা প্রীতিলতা নাই। কেন নাই? অথচ বাকি দুজন নন, এরাই আমাদের ভূমির সন্তান। কিন্তু জন্ম বা জন্মভূমির চাইতে সম্প্রদায়গত পরিচয় বড় হয়ে উঠলে তখন তো তারা থাকবেন না, এটাই স্বাভাবিক। একই কারণে বরিশালের জীবনানন্দ কিংবা বাংলার অতীশ দীপংকর বা সত্যেন বোস নাই। কারণ মন থেকে হয়তো আমরা তাদের নিজেদের মানুষ মনে করি না। বলবেন তো যে রবীন্দ্রনাথ আছেন কী করে? মূলত তিনি এবং নজরুল দুজনই ওপার বাংলার সন্তান। কেউ আমাদের ভূমিতে জন্মাননি। তাতে তাঁদের গৌরব বা সম্মান কোনটার কোনও লাভ লোকসান কিছু নাই। কিন্তু তাঁদের ছাড়া আমাদের চলে না আর তাঁরা এত ব্যাপক আর এত আলোময় না থাকলে, আমরাই অন্ধকারের জীবে পরিণত হই। তাই হয়তো তাঁরা থাকেন।

এভাবে আর যাই হোক ইতিহাস বা শুদ্ধতা রাখা যায়না। তাই তা নেইও। আজ বীরাঙ্গণা রমা চৌধুরীকে নিয়ে যারা ফেণা তুলছেন তারা বাসায় ফিরে হয়তো ঠিক উল্টো কিছু বলছেন। কেউ বলবেন ঠিক হয়েছিল। পাকি সৈন্যরা ‘গনিমত’ এর মাল ভোগ করে অন্যায় কিছু করেনি। আর একদল বলবেন তাদের ভাবলেই গা ঘিনঘিন করে তবু যেতে হয় বলে যাওয়া। এই হিপোক্রেসি আমাদের জাতিকে দিনদিন ক্লীব আর দুর্বল করে তুলেছে। এখন তার আর রূখে দাঁড়ানোরও শক্তি নাই। যা আছে তার নাম প্রদর্শন। এইভাবে তাই কাউকে না যায় সম্মান জানানো, না করা যায় অসম্মান।

এদেশের ইতিহাসে একাত্তর যতটা গুরুত্পূর্ণ ছিল, ঠিক ততটাই তাকে টেনে নামাচ্ছি আমরা। দেখুন চোখ খুলে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ডেকে নিয়ে গেছিলেন বলে তিনি ‘লাইমলাইটে’ কিছুটা এসেছিলেন। তারপর? যেই কপাল, সেই মাথা। দু’লাখ টাকা দেবার পর আর কেউ কোনও খোঁজ নিয়েছিল? দেশে এত মুক্তিযুদ্ধ প্রেমিক সরকারী দলে, এত মহান সব একাত্তরবিদ, চাটগাঁয় এত সুশীল, এত এত বুদ্ধিজীবী- কেউ তাঁর খবর রাখেননি। যখন তিনি নাই, তখন লাল সবুজে ঢেকে শোক প্রকাশ। জানি লাল সবুজ তাঁকে ভালোবাসে। কেউ পরিয়ে না দিলেও এই জাতীয় পতাকা নিজ থেকেই তাঁকে জড়িয়ে নিতো। প্রকৃতি বা সময় আমাদের মত বেঈমান না। তাদের কাছেই এদের আসল আশ্রয়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চেতনা ও ইতিহাস ধীরে ধীরে একা হয়ে পড়ছে। এরা একেকজন চলে গেলে আমাদের সেসব মানুষদের আর কেউই থাকবেন না যারা এদেশের জন্ম আর ইতিহাস দেখেছিলেন। যারা নিজেরা ইতিহাস হয়েছিলেন সম্ভ্রম বা জীবন হারিয়ে । যারা সম্ভ্রম হারিয়ে আমাদের চরিত্র দিয়ে গেলেন তাদেরও আমরা ঠিকভাবে দেখে রাখিনা। রমা চৌধুরী তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত প্রেমিকেরা কী ইতিহাসকে আগলে রাখতে আবারো ঐক্যবদ্ধ হতে পারবেন এদেশে?