রোহিঙ্গা: জাতিসংঘে কথা হলো, উদ্যোগ এলো না

অনলাইন ডেস্কঃ
রাখাইনে রোহিঙ্গা ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ হোতা হিসেবে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের দায়ী করে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জাতিসংঘে আলোচনা হলেও কোনো পদক্ষেপের কথা হয়নি।

মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, পশ্চিমা বিশ্বের রাষ্ট্রদূতরা ও অভিনেত্রী কেইট ব্লানচেট উদ্যোগের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে গণহত্যা, ধর্ষণ ও সাত লাখের বেশি মানুষকে তাদের ঘর থেকে বাস্তুচ্যুত করাসহ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত এসব নৃশংশতা উঠে এলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কোনো কথা বলেনি।

এমনকি বক্তব্যে ওই প্রতিবেদনের উল্লেখ করলেও গুতেরেজ নিজে একবারও গণহত্যা শব্দটি উচ্চারণ করেননি বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, আমি মনে করি, এই প্রতিবেদনের ফলাফল ও সুপারিশ জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার গুরুতর বিবেচনার দাবি রাখে।”

সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আইন প্রয়োগের নামে ভয়ঙ্কর ওই অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের সেনাপ্রধান এবং জ্যেষ্ঠ পাঁচ জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘গণহত্যার অভিপ্রায়’ থেকেই রাখাইনের অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটিয়েছে। আর মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সু চির বেসামরিক সরকার ‘বিদ্বেষমূলক প্রচারকে উসকে’ দিয়ে, গুরুত্বপূর্ণ ‘আলামত ধ্বংস’ করে এবং সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা না করে সেই নৃশংসতায় ‘ভূমিকা’ রেখেছে।

সভায় জাতিসংঘ মহাসচিব গত জুলাই মাসে তার কক্সবাজার সফরের সময় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মর্মস্পর্শী বর্ণনা উপস্থাপন করেন।

গুতেরেস বলেন, “ইতিমধ্যে এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সমস্যা অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না। নিরাপত্তা পরিষদ প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্ট গ্রহণে একতা দেখিয়েছিল। এই একতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন যদি আমরা যথাযথ কাজের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দাবী পূরণ করতে চাই।”

কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা পুনরুল্লেখ করে জাতিসংঘ এবং এর বিভিন্ন সংস্থাসমূহকে রাখাইন প্রদেশে বাধাহীন প্রবেশাধিকার দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সেনা অভিযানে দমন-পীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট বাংলাদেশ সীমান্তে নামে রোহিঙ্গাদের ঢল। কয়েক মাসেই শরণার্থীর সংখ্যা ৭ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

রাখাইনে অভিযানকে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে মিয়ানমার তুলে ধরতে চাইলেও জাতিসংঘ একে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবেই দেখছে।

ওই ঘটনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের অগাস্ট মাসের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাজ্য এই আলোচনার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ্ ও জাতিসংঘ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লর্ড তারিক মাহমুদ আহমাদ সভাপতিত্ব করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব ছাড়াও জাতিসংঘ মানবিধকার কমিশনের শুভেচ্ছা দূত অভিনেত্রী কেইট ব্লানচেট ও ইউএনডিপির অ্যাসোসিয়েট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর তেগেগনিঅর্ক গেট্টু এবং নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এই সভায় বক্তব্য দেন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন গত একবছর ধরে রোহিঙ্গা ইস্যু সামনে রেখে সমাধানে কাজ করে যাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ধন্যবাদ জানান।

রাষ্ট্রদূত বলেন, “রোহিঙ্গাদের মানবিক সহযোগিতা প্রদানের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পদক্ষেপসমূহের টেকসই বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও উদারভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দেবে।”

“মিয়ানমারের ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করার জন্য মিয়ানমারকেই এগিয়ে আসতে হবে। রাখাইন প্রদেশে স্থায়ী প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হলেই কেবল বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা ফিরে যাওয়ার জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসবে।”

প্রত্যাবসনের পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার কর্তৃক চারটি আশু পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সুপারিশ করেন তিনি।

১. রাখাইন প্রদেশের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম ও শহরগুলোতে প্রয়োজনীয় মানবিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইউএনডিপি ও ইউএনএইচসিআরকে বাধাহীনভাবে প্রবেশাধিকার দিতে হবে, যা মিয়ানমারের সাথে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২. বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে আটকে থাকা কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত নেওয়া এবং ফেরত না নেওয়া পর্যন্ত মিয়ানমারের পক্ষ থেকেই তাদের মানবিক সহায়তা প্রদান করতে হবে।

৩. রাখাইন রাজ্যের আইডিপি ক্যাম্প উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং সেখানে আটক মানুষেরা যাতে নিজ বাসভূমিতে বা তাদের অন্য কোন পছন্দনীয় স্থানে পূর্ণ অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে টেকসইভাবে প্রত্যাবর্তন করতে পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশ্বাস ও পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং হিংসা উদ্রেককারী বক্তব্য ছড়ানো যা সহিংসতা ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে তা দমন করতে হবে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হাউ দু সুয়ান রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের মায়াকান্নার প্রতিচ্ছবির প্রকাশ ঘটে রাষ্ট্রদূত এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলার ঘটনার মধ্য দিয়ে, যা ছিল কূটনীতিক শিষ্টাচার পরিপন্থি।

রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর মিয়ানমার প্রশাসনের বর্বরতার লোমহর্ষক ঘটনাবলি ধামাচাপা দিতে মিয়ানমারের এই রাষ্ট্রদূতের মেকি কান্নায় ‘চিড়া ভিজেনি’ বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।

সূত্রঃ বিডিনিউজ