বাংলা এখনও জ্ঞানচর্চার ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠেনি

সাহিত্য ডেস্কঃ
সমাজতাত্ত্বিক ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর শেষ জীবন অবধি অভিযোগ করে গিয়েছিলেন যে তাঁর লেখা বাংলা বইয়ের কোনও পাঠক নেই। তাঁর মৌলিক ও মননশীল বাংলা রচনা কোনও পাঠক পায়নি, এ আক্ষেপ তাঁর সারা জীবন ছিল। একদম শেষ জীবনে তিনি লিখেছিলেন: ‘আসলে কলকাতা শহরে ইন্টেলেকচুয়াল ক্লাস তৈরি হল না। ভালোমন্দ জানি না, তবে বুঝলাম হলো না।’ এক সময় প্রবন্ধ বলতে যেমন রচনা বা সন্দর্ভ বোঝাত, তেমনই এই শব্দের অর্থ ছিল বাক্য কৌশল, চাতুরি বা চালাকি। বাঙালি পাঠকের মনে প্রবন্ধের এই পূর্বতন অর্থ এখনও শিকড় গেড়ে আছে। বেশির ভাগ প্রবন্ধ মানে জ্ঞানের আড়ম্বর, চালাকি, বস্তুত বেশির ভাগ প্রবন্ধই এক ধরনের কপট প্রবন্ধ, আজকের ভাষায় এক ধরনের আঁতলামি, এই মানসিকতা থেকে বাঙালি কোনও দিন মুক্ত হতে পারেনি। ঠিক যেমন সঠিক জ্ঞান, যুক্তি, অভিজ্ঞতার অভাবে মানুষ নির্বোধ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনই বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার কোনও ঐতিহ্য তৈরি না হওয়াতে পাঠকের এ বিষয়ে কোনও বোধবুদ্ধি বিকশিত হয়নি। জ্ঞানচর্চা সম্বন্ধে এই অনাগ্রহ, অনুৎসাহ, অবহেলা, ঔদাসীন্য, বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই। এখানে জ্ঞানচর্চা বলতে আমি সমাজবিদ্যা, সমাজদর্শন, রাজনীতি, রাজনৈতিক দর্শন, সংস্কৃতি, দর্শন ও তত্ত্বমূলক বিষয়গুলির কথা বলছি। বিজ্ঞান আমার আলোচনার বিষয় নয়। বাঙালির পাঠাভ্যাসের কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করলাম এই জন্য যে একটি ভাষা-গোষ্ঠীর ভাষার বিকাশ নির্ভর করে মানুষ কী পড়ছে না পড়ছে তার উপরে। ভাষা একটা সামাজিক প্রক্রিয়া। প্রশ্ন হল বাংলায় জ্ঞানচর্চার ভাষা কতটা সমৃদ্ধ, কতটাই বা শক্তিশালী? আমরা চাই বা না চাই আন্তর্জাতিক স্তরে জ্ঞানের প্রসার থেমে থাকে না এবং এই নবলব্ধ জ্ঞানের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগও করতে হবে। তাই ভাষাকে এক জায়গায় থেমে থাকলে চলবে না, তাকে ক্রমাগত নিজের বিকাশ সাধন করতে হবে। প্রশ্ন হল, আমাদের বাংলা ভাষা এখন যে অবস্থায় আছে তাতে পৃথিবীর জ্ঞানচর্চার অনায়াস রূপান্তর সম্ভব? না কি এই ভাষার যা ক্ষমতা তাতে সাম্প্রতিক জ্ঞানচর্চার এক ভাসা-ভাসা তরলীকৃত আভাসমাত্র দেওয়া যেতে পারে? আমার নিজের মত হল, বাংলায় জ্ঞানচর্চার ভাষার অস্তিত্ব যেটুকু আছে তা নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। এই ভাষায় পৃথিবীর সাম্প্রতিকতম জ্ঞানচর্চার কোনও ধারণা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। সামান্য কিছু আভাসমাত্র পাওয়া যেতে পারে।

খুব বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই, যদি দর্শনকে জ্ঞানচর্চার এক প্রধান বিষয় বলে ধরে নিই, তা হলে প্রশ্ন করা যায় পশ্চিমে দর্শনের যে বিশাল জ্ঞানভান্ডার আছে তার কতটুকু বাংলা ভাষায় পাওয়া যায়? হেগেল মারা যান ১৮৩১ সালে, আজও তাঁর ক’টি রচনা বাংলা ভাষায় পাঠক পড়তে পারবেন? বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার জন্য প্রয়োজন সমৃদ্ধ, কার্যকর, উপযুক্ত ভাষা। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত বাংলায় নতুন পরিভাষার সংযোজন, আবার পরিভাষা তৈরি করতে জ্ঞানচর্চা অর্থাৎ লেখা ও পড়া দুই-ই করতে হবে। আমাদের রাজ্যে একটা পপুলার মত আছে, মূলত বাংলা ভাষাপ্রেমীদের মধ্যে, যে দোকানপত্রের নাম বাংলা ভাষায় লিখলে এবং প্রশাসনিক কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার করলে ভাষার প্রভূত উন্নতিসাধন হবে। বস্তুত ভাষা যদি চিন্তার উপকরণ ও সাধন জোগাতে না পারে সে ভাষার মানুষ কার্যত পঙ্গুজীবন অতিবাহিত করবে। যেহেতু বাংলা ভাষা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে দুর্বল, অপুষ্ট, এই ভাষা যেহেতু সমসাময়িক জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে অক্ষম, অপারগ, তাই প্রবন্ধসাহিত্যও রুগ্ন, অতিসরলীকরণ দোষে দুষ্ট, অসমৃদ্ধ। বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যা বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে কোনও স্থানই পায়নি, কারণ এই সব বিষয়ে লেখার কোনও ভাষাই তৈরি হয়নি। যদি কেউ এই সব বিষয় নিয়ে লিখতে চান তা হলে তাঁকে পরিভাষা-সমেত একটা ভাষা তৈরি করে নিতে হয়, কিন্তু সে ক্ষেত্রে সমস্যা হল, পরিভাষা বোধ্য হবে তো এবং এই পরিভাষার প্রচারিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা? তবুও পাঠকের যদি জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ থাকত, তা হলে এই সমস্যা অলঙ্ঘনীয় হত না, কিন্তু বাঙালি পাঠকের জ্ঞানচর্চায় কোনও আগ্রহ নেই, প্রবন্ধ তাঁরা পড়েন না। আসলে কোনও দিনই পড়তেন না।

যদি ভাষা দুর্বল, অক্ষম হয়, যদি কোনও উপযুক্ত পরিভাষা উদ্ভব না হয়, তা হলে সামান্য তত্ত্বও সঠিকভাবে উপস্থাপন করা যায় না। উনিশ শতকে বাংলা ভাষা যখন বিকশিত হচ্ছিল, তখন নৈয়ায়িকরা তাঁদের দর্শনচর্চার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে বিবেচনার মধ্যে আনতেন না। তাঁরা বলতেন সংস্কৃতে যা দু-চার পঙ্‌ক্তিতে বলা যায়, বাংলা ভাষায় তা দু-চার পাতায়ও শেষ হবে না। অর্থাৎ ভাষা অপরিণত, অসমৃদ্ধ, আর সেই কারণেই এই সমস্যা। আরও বড় সমস্যা হল, জ্ঞানচর্চার নতুন নতুন ধ্যানধারণা, সংজ্ঞা, প্রত্যয় প্রভৃতির শুধু পরিভাষা তৈরি করলে চলবে না, যাঁরা এই সম্বন্ধে জানতে বা বুঝতে আগ্রহী তাঁদের এই পরিভাষাকে চিনতে ও বুঝতে দিতে হবে। অবোধ্য পরিভাষা চালু করে কোনও লাভ নেই। ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ তাঁর একটি বাংলা বইয়ে ‘সাবজেক্টিভ’-এর বাংলা করেছিলেন ‘স্বগম’ এবং ‘অবজেক্টিভ’-এর ‘পরংগম’। এই পরিভাষা পড়ে আমি রীতিমতো ঘাবড়ে যাই, ভাবি তা হলে ‘সাবজেক্ট’, ‘সাবজেক্টিফিকেশন’, ‘অবজেক্ট’, ‘অবজেক্টিফিকেশন’ ইত্যাদির বাংলা পরিভাষা কী রকম জটিল হবে। মূল কথা হল, পরিভাষা সৃষ্টি করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এ রকম ভাবাও ভুল। সেই পরিভাষা যদি প্রচলিতই না হয়, অথবা এমন বেখাপ্পা বা বেঢপ হয় যে কেউ ব্যবহার করার আগে দশ বার ভাবে তা হলে কী লাভ? আর প্রচলিত হতে গেলে তাকে ব্যবহার করতে হবে। অর্থাৎ সেই বিষয়ে চর্চা করতে হবে, সেই বিষয় নিয়ে আগ্রহী পাঠক ও লেখক দুই-ই থাকতে হবে। সহজ কথায় পরিভাষা চেনা, জানার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য থাকলে এই প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়, না থাকলে তা নানাবিধ সঙ্কটের সূচনা করে। বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের রুগ্নতা সেই সঙ্কটের কথা বলে। অন্য ভাবে আমরা বলতে পারি, পরিভাষাকে ভাষার মধ্যে তার স্বাভাবিকতা অর্জন করতে গেলে সেই ভাষা-গোষ্ঠীর মধ্যে জ্ঞানচর্চার একটা ঐতিহ্য থাকা প্রয়োজন। এই ঐতিহ্যই জ্ঞানচর্চার নতুন পরিভাষার প্রচলনে সাহায্য করে। এটা একটা দুষ্টচক্রের মতো: জ্ঞানচর্চা না হলে তার পরিভাষা সৃষ্টি হয় না, আবার ঠিকমতো পরিভাষা না থাকলে কেউ নিজের ভাষায় জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী হয় না। বাংলায় জ্ঞানচর্চার ভাষার সমস্যা ও সঙ্কট এইখানে।

কিন্তু এই সমস্যা আরও এক গভীর সঙ্কটের সূচনাবাহী। দার্শনিক লুট্‌ভিক ভিট্‌গেনস্টাইন বলতেন, ভাষা হল জীবনের প্রকার বা অভিব্যক্তি। যে ভাষায় অনুরোধ বা প্রশ্ন করা যায় না, সেই ভাষার মানুষদের মধ্যে এই কাজগুলিও নেই। এক এক ভাষা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এক এক ধরনের জীবনের প্রকারের সূচনা দেয়। যে ভাষায় জ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, সেই ভাষা-গোষ্ঠীর মানুষদের জীবন ও চিন্তা, যে-ভাষায় এটা সম্ভব তাদের চেয়ে ভিন্ন হবে। জ্ঞানচর্চার ভাষার দৈন্য প্রতিফলিত হবে চিন্তার ক্ষেত্রেও, দেখা যাবে চিন্তার দৈন্য। যে চিন্তার ভাষা নেই, সেই চিন্তাও সম্ভব নয়। বাংলাভাষাভাষী মানুষদের ক্ষেত্রে এই চিন্তার দৈন্য অত্যন্ত প্রকট। বাঙালি লেখক হিসেবে কাব্য, উপন্যাস লিখতে যতটা আগ্রহী, নিজের ভাষায় মৌলিক চিন্তাসমৃদ্ধ জ্ঞানচর্চায় ততটাই অনাগ্রহী। এত পরিশ্রমও বাঙালির ধাতে সয় না। তাই বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে কোনও রকম ধারাবাহিকতাই খুঁজে পাওয়া শক্ত। কারণ জ্ঞানচর্চার কোনও ভাষাই তৈরি হয়নি। আরও সঠিক ভাবে বলতে গেলে জ্ঞানচর্চার ভাষার যে অস্তিত্ব আছে, তা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত ও প্রাথমিক স্তরের। সুতরাং চিন্তার ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন হতে বাধ্য। বাংলা ভাষাভাষীদের চিন্তার গুণগত মান প্রাথমিক স্তরেই থেকে যাবে।

আমার বক্তব্য এই নয় যে পশ্চিমের জ্ঞানকে জানলেই সত্যিকারের জ্ঞানচর্চা সম্ভব। বরং আমার বক্তব্য এই যে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা করতে হলে জ্ঞানের আন্তর্জাতিক বিকাশের ধারা সম্বন্ধে অবহিত থাকতে হবে। আমরা এই জ্ঞানকে গ্রহণ বা বর্জন যা-ই করি না কেন, এই জ্ঞানকে জেনেই তা করতে হবে। অন্য দিকে যদি কেউ বলেন নিজেদের ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করে জ্ঞানের বিকাশ ঘটাব, পরিভাষাও নেব নিজেদের ঐতিহ্য থেকে, তর্কের খাতিরে যদি স্বীকারও করে নিই যে এ রকম প্রচেষ্টাও জ্ঞানচর্চা, তা হলে এটাও মেনে নিতে হবে যে বাংলা ভাষায় এ রকম কোনও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা বা নিদর্শনের সন্ধান মেলে না। মূল কথা হল, পশ্চিমের বৃহত্তর জ্ঞানচর্চার কোনও পরিভাষা বাংলা ভাষায় তৈরি না হওয়ার ফলে বাংলা ভাষার উপরে যাঁরা নির্ভর করেন তাঁদের কূপমণ্ডূকতা যেমন ঘোচেনি, তেমনই বাংলা ভাষায় যাঁরা জ্ঞানচর্চা করতে চান তাঁদেরও এক সীমিত পরিসরে কাজ করতে হয়েছে। মনে রাখতে হবে জ্ঞানের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক বেশ জটিল, তাই পরিভাষা সৃষ্টি করলেই জ্ঞানচর্চা উন্নত হবে এ রকম এক সহজ সরল সমীকরণের উপর নির্ভর করা ভুল হবে। তবুও বলব নতুন এক
পরিভাষা ভাষায় শুধু নতুন এক শব্দই যোগ করে না, নতুন নানাবিধ সম্পর্কও সৃষ্টি করে, অনেক সময় ভাষার গঠনকেই বদলে দেয়। জ্ঞানচর্চার ভাষার সব সময়ই এক সৃষ্টিশীল ভূমিকা রয়েছে, আর সেই ভাষা বিকশিত না হলে সৃষ্টিশীলতাও থেমে থাকে। প্রকৃত জ্ঞানচর্চার ভাষা নানাবিধ সংযোগ ঘটিয়ে চলে সব সময়, সেই জন্যই এই ভাষা সক্রিয় ও সৃষ্টিশীল।

উনিশ শতকে শিক্ষিত বাঙালি, যেমন রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ভেবেছিলেন ভবিষ্যতে সব কিছুই বাংলা ভাষায় চর্চা করা সম্ভব হবে আর সেই জন্যই সাধারণ ভাবে জোর দিয়েছিলেন প্রতিশব্দ সৃষ্টি করার দিকে। অলস, অপদার্থ বাঙালি সেই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাই শিক্ষিত বাঙালি, খুবই অল্প সংখ্যক বলতে হবে, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে অন্য একটা পথ অবলম্বন করে আসছেন বহু দিন ধরে। সেটা হল জ্ঞানের বিষয়ের বইগুলি ইংরেজি ভাষাতেই পড়া। কিন্তু তাঁদের পক্ষে ওই বিষয়ে বাংলা ভাষায় লেখা সম্ভব হয় না। ভাষাই তো নেই। অনেকেই বলতে পারেন এবং বলেনও যে, সব জ্ঞানকে বাংলা ভাষায় রূপান্তরের কী প্রয়োজন? ইংরেজি যখন জানি তখন ইংরেজি ভাষায় বইগুলি পড়ে নিলেই হয়। তা হলে এ কথাও মেনে নিতে হবে যে, বাংলা ভাষা আধুনিক ভাবনাচিন্তার উপযুক্ত ভাষা হবে না, হতেও পারবে না, বাংলা ভাষা একটা কাজ চালানোর ভাষা হিসেবেই কাজ করবে। আমরা রাস্তায় যে ট্র্যাফিক সিগনাল দেখে চলাফেরা করি, সেই ট্র্যাফিক সিগনালও একটি ভাষা। কিন্তু সেই ভাষায় সাহিত্যও সৃষ্টি হয় না, দর্শনচিন্তাও হয় না। ওটা হল একটা কেজো ভাষা। সত্য কথাটা হল, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাংলা ভাষাকে
অবলম্বন করে যে খুব একটা এগোনো যাবে না, এটা মোটামুটি সকলের জানা হয়ে গেছে। জ্ঞানচর্চা করতে হলে বাঙালিকে আরও একটি ভাষা ভাল ভাবে জানতে হবে, এটাই সকলে মেনে নিয়েছেন। বাংলা ভাষা যাঁদের একমাত্র অবলম্বন তাঁদের যে গাড্ডায় পড়ে থাকতে হবে এ ব্যাপারে আর কোনও সন্দেহ নেই।

বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে পরিভাষা-সংক্রান্ত সমস্যার কোনও সমাধান আজও হয়নি। আসলে বর্তমান কালে কোনও ভাবনাচিন্তাই হয়নি। বরং যত দিন গেছে তত মনে হয়েছে এ বিষয়ে আর কিছু হওয়ার নয়, বাঙালি হার মেনে নিয়েছে। এ ব্যাপারে দুই ভাবে আমরা ভাবতে পারি। এ রকম ভাবা যায় যে, বাংলা ভাষার এক সহজাত সীমাবদ্ধতা আছে, যার ফলে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার ভাষা কোনও দিনই গড়ে উঠবে না। এই ভাষায় আমরা জ্ঞানের এক সহজ সরল রূপই প্রকাশ করতে পারব, তার বেশি কিছু নয়। অন্য মত হতে পারে যে, দোষ ভাষার নয়, সীমাবদ্ধতাও ভাষার নয়, সীমাবদ্ধতা হল এই ভাষাভাষী মানুষদের। তাঁরা যদি জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী না হন তা হলে ভাষা গড়ে উঠবে কেমন করে? জ্ঞানচর্চার দৈন্য সামাজিক স্তরে চিন্তার দৈন্যকেই প্রকাশ করে। চিন্তার দৈন্য বা চিন্তাশূন্যতার প্রতিফলন আমরা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ভাবে বাঙালির রাজনৈতিক জীবনে দেখতে পাচ্ছি। বস্তুত যে চিন্তার ভাষা নেই, সেই চিন্তাও সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা বাঙালিরা জ্ঞানচর্চার ভাষা গড়ে তুলতে পারিনি বলে জগতে জ্ঞানচর্চা থেমে থাকবে, এমন তো নয়। জ্ঞানচর্চা এগিয়ে চলবে তার নিজের মতো করেই। শুধু বাংলা ভাষা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না। বাঙালি নির্বোধের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে।

সূত্রঃ আনন্দবাজার অনলাইন