রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এখনো আশাবাদী বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্কঃ
একবছর ধরে নানা তৎপরতার পরও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব না হলেও তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে এখনো আশাবাদী বাংলাদেশ।

বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া সেই শরণার্থী সঙ্কটের বছরপূর্তিতে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা আশাবাদী রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশে ফিরতে পারবে। এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদী। কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তারা ফিরে যাবে।”

রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে গতবছরের ২৫ অগাস্ট থেকে এ পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। গ্রামে গ্রামে নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়াবহ বিবরণ উঠে এসেছে তাদের কথায়।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা মিয়ানমারের বাহিনীর ওই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।

বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে গত বছর রাখাইনে সেনা অভিযানের তিন মাসের মাথায় রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে একটি সম্মতিপত্রে সই করে মিয়ানমার সরকার।

এর ভিত্তিতে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয় এবং ১৬ জানুয়ারি ওই গ্রুপের প্রথম বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিভিন্ন বিষয় ঠিক করে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ স্বাক্ষরিত হয়।

এরপর প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মিয়ানমার সরকারকে আট হাজারের মতো রোহিঙ্গার একটি তালিকা দেওয়া হলেও কেউ এখনও রাখাইনে ফিরতে পারেনি।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযানের’ মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর প্রস্তুতি দেখতে গত ১১ অগাস্ট সেখানে রাখাইন এবং ম্রো জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কেইন গয়ি এলাকা দেখে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সফররত বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ‘ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ধারার মধ্যে’ বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোগান্তি দেখে এসেছেন।

ঘর নয়, রোহিঙ্গাদের কাছে নিরাপত্তাই এখন একমাত্র চাওয়া জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “আমি তাদের (যারা বাংলাদেশে শরণার্থী ক্যাম্পে আছে) বলতে শুনেছি, ‘আমাদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার দরকার নেই, শুধু আমাদের সুরক্ষা আর নিরাপত্তা নিশ্চিত কর… আমরা নিজেদের ঘর নিজেরাই তৈরি করে নেব’।”

রাখাইনে কয়েকশ বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসবাসের ইতিহাস থাকলেও ১৯৮২ সালে আইন করে তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়।

রাখাইনে ওই সেনা অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান নেতৃত্বাধীন কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সঙ্কটের মূল কারণ রয়েছে মিয়ানমারেই।

বলপ্রয়োগের পথ ছেড়ে মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার উপর জোর দেয় এই কমিশন।

কফি আনান গত বছর ২৪ অগাস্ট মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির হাতে ওই প্রতিবেদন দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাখাইনের ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলা হয়।

রোহিঙ্গা বিতাড়নের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা প্রশ্নে বাংলাদেশের মতামত জানতে চেয়ে চলতি বছরের মে মাসে চিঠি দিয়েছিল হেগের আন্তর্জাতিক আদালত। জুনের শুরুতে বাংলাদেশ সরকার ওই চিঠির জবাব দেয়।

এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিলম্বের জন্য ঢাকা যেখানে মিয়ানমারকে দায়ী করে আসছে, দেশটির নেত্রী অং সান সু চি সেখানে বাংলাদেশকে পাল্টা চাপে রাখতে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কাজটা বাংলাদেশের’ বলে মন্তব্য করেছেন।

এ ধরনের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া খুব সহজ নয় জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, “তবে কোনো সঙ্কটই সমাধানের বাইরে নয়। যদি দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে তবে সব কিছু থেকে উত্তরণ সম্ভব।বাকীটা শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।”

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখাকেও সাধুবাদ জানান তিনি।

“সার্বিকভাবে চাপ বজায় রয়েছে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সভাপতিত্ব করবে, তারা এই সঙ্কট তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় রাষ্ট্রপ্রধানরা এ বিষয়ে আলোচনা করবেন।”

এক বছর ধরেই চাপ বজায় আছে জানিয়ে একে ‘ইতিবাচক’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্রঃ বিডিনিউজ