ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে দরকার পরিমিত আহার ও শরীরচর্চা

লাইফস্টাইল ডেস্কঃ
ডায়াবিটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ডায়াবিটিস থেকে শরীরে নানা সমস্যা তৈরি হয়। অন্য রোগ জটিল আকার নেয়। এই রোগের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করলেন চিকিৎসক ষষ্ঠীনারায়ণ চক্রবর্তী।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিস বা মধুমেহ আসলে কী?

উত্তর: রক্তে শর্করা বা সুগারের নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। ডায়াবিটিস বা মধুমেহ হল রক্তে শর্করার পরিমাণ সেই নির্দিষ্ট মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিস কেন হয়?

উত্তর: এই রোগ কেন হয়, এক কথায় বলা খুব মুশকিল। এটা সাধারণত নির্ভর করে কী ধরনের ডায়াবিটিস হয়েছে তার উপরে। সারা বিশ্বে ৯০-৯৫ শতাংশ টাইপ-টু প্রকারের ডায়াবিটিস হয়। এই ধরনের ডায়াবিটিস হওয়ার কারণ অনেকগুলি। যেমন, অনিয়ন্ত্রিত ও অনিয়মিত খাদ্যাভাস, অলস জীবনযাপন, স্থূলতা, নেশা ইত্যাদি। এই বিষয়গুলির যে কোনও একটি বা একসঙ্গে রক্তের শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে।

প্রশ্ন: এই রোগ হওয়ার কী কোনও নির্দিষ্ট বয়স আছে?

উত্তর: সাধারণত মধ্যবয়সীদের (৪০ ঊর্ধ্বে) টাইপ-টু ডায়াবিটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভারতীয়দের ক্ষেত্রে এই রোগ ৩০ বছর বয়স থেকেই হতে পারে। আর টাইপ-ওয়ান ডায়াবিটিস ১০-১৪ বছর বয়সীদের হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

প্রশ্ন: কী করে বোঝা যেতে পারে কারও ডায়াবিটিস হয়েছে, অর্থাৎ এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ কী?

উত্তর: দেখুন, লক্ষণ কী হবে এটাও নির্ভর করে কী ধরনের ডায়াবিটিস হয়েছে তার উপরে। টাইপ ওয়ানের ক্ষেত্রে ঘন ঘন খিদে পাওয়া, ঘন ঘন প্রসাবে পাওয়া, তেষ্টা পাওয়া, হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলি দেখা দেয়। কিন্তু টাইপ-টু ডায়াবিটিসে এই লক্ষণগুলি সব সময় নাও দেখা যেতে পারে। এই প্রকারের ডায়াবিটিস ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনও লক্ষণই দেখতে পাওয়া যায় না। রোগ ধরা পরে অন্য কোনও রোগের চিকিৎসা বা নির্ণয়ের সময়ে। যে লক্ষণগুলি বাকি রোগীদের ক্ষেত্রে পাওয়া যেতে পারে সেগুলি হল, দুর্বল ভাব, বিরক্তি ভাব, ঘন ঘন নানা সংক্রমণ হওয়া, কোনও আঘাত লাগা জায়গা না শুকানো ইত্যাদি।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিস কি পুরোপুরি সেরে যেতে পারে?

উত্তর: টাইপ-ওয়ানের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। যে হেতু এই রোগে শরীরে ইনসুলিন তৈরির কোষগুলি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। টাইপ-টু ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে কিছু রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে ডায়াবিটিসের প্রথম ধাপে থাকা রোগীদের। খুব নিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা, খাদ্যাভাস মেনে চললে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু টাইপ টু-এর ক্ষেত্রেও বেশিরভাগ রোগীদের ওষুধ বা ইনসুলিনের উপরেই ভরসা করে থাকতে হয়।

প্রশ্ন: এই ইনসুলিন নিয়েও রোগীদের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে। যেমন ইনসুলিন কি সারা জীবন নিতে হবে? দীর্ঘদিন নিলে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী?

উত্তর: টাইপ-ওয়ান ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে ইনসুলিন ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। টাইপ-টু ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে অনেক রোগীকেই আবার ট্যাবলেট দেওয়া যেতে পারে। তবে সেটা নির্ভর করে অনেকগুলি বিষয়ের উপরে। যেমন, সুগারের মাত্রা কতটা, অন্য কোনও আপৎকালীন চিকিৎসার জন্য সুগার দেওয়া হয়েছিল কি না, শরীরে ইনসুলিন তৈরির কোষ কী পরিমাণে আছে ইত্যাদি। ইনসুলিন আমাদের শরীরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। তাই কোনও কারণে বাইরের ইনসুলিন প্রয়োজন পড়লে সেই রকম কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা নয়। যদি ইনসুলিনের ডোজ ঠিকঠাক হয়ে থাকে।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিসের রোগীরা কি ফল খেতে পারেন? অনেকেই বলেন, আম, আপেল, কলার মতো বেশ কিছু ফল না খাওয়ার কথা।

উত্তর: খুব ভুল ধারণা। বরং ডায়াবিটিসের রোগীদের যে কোনও একটি ফল (নির্ভর করে কী ধরনের ফল, সুগারের মাত্রা এবং অনান্য বিষয়ের উপর) নিয়মিত খাওয়া দরকার। ফলে সামান্য ক্যালোরি থাকে। ফাইবার, ভিটামিন অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। যেগুলি ডায়াবিটিসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: ডায়াবিটিসের রোগীদের প্রতি দিন হাঁটা কি খুব প্রয়োজন?

উত্তর: সপ্তাহে ১৫০ মিনিট হাঁটা ডায়াবিটিসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় রয়েছে। নিয়মিত হাঁটলে সুগার মাত্রার মধ্যে থাকে। ওষুধের পরিমাণ ও ডোজ কম লাগে। হাড়ের শক্তি বৃদ্ধি হয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। তা ছাড়া আরও অনেক উপকার রয়েছে।

প্রশ্ন: হাঁটা কি সবার জন্যই প্রযোজ্য?

উত্তর: সবার জন্য একই রকম চিকিৎসা বা জীবনযাত্রার কথা কখনই হয় না। হার্টের রোগ, ওজন বেশি, অতিরিক্ত সুগার, অতিরিক্ত স্থূলতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রথম দিকে হাঁটা মানা করা হয়। ধীরে ধীরে সুগার নিয়ন্ত্রণ, ওজন নিয়ন্ত্রণ, হাঁটুর রোগের চিকিৎসার পরে আবার নিয়মিত হাঁটার উপদেশ দেওয়া হয়। তবে যাই করবেন, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। নিজের ইচ্ছামতো কিছু না করাই ভাল।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন ডায়াবিটিসে ভুগলে কী হতে পারে?

উত্তর: দীর্ঘদিন ডায়াবিটিসে ভুগলে হার্টের রোগ, স্ট্রোক, পায়ের রক্তনালীর রোগ, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, নার্ভের রোগ, চোখের রোগ ইত্যাদি হতে পারে। এই জন্যই চিকিৎসকেরা ডায়াবিটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে কিছু মাস পরে (কিছু ক্ষেত্রে বছরে এক বার) রক্ত এবং অন্যান্য পরীক্ষা করাতে বলেন।

প্রশ্ন: অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ডায়াবিটিসের রোগীরা চিকিৎসা করানো পরে খুব রোগা বা মোটা হতে থাকেন। এর কারণ কী?

উত্তর: সরাসরি উত্তর দেওয়া খুবই জটিল। তবুও বলা যেতে পারে, ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও কাজ করার ধরন, রোগীদের খুব বেশি পরিমাণ খাওয়া বা কম খাওয়া বা অন্তর্নিহিত কিছু রোগ এর জন্য দায়ী হতে পারে। স্থূলতায় ভোগা রোগীরা ওজন কমালে দীর্ঘমেয়াদী ভাবে তাঁদের উপকার হয়। তবে অতিরিক্ত ওজন বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রশ্ন: গর্ভাবস্থায় কী ডায়াবিটিস হতে পারে? হলে কী সমস্যা হয়?

উত্তর: অবশ্যই, গর্ভাবস্থায় বিশেষ ধরনের ডায়াবিটিস হতে পারে। ভারতীয়রা এমনিতেই গর্ভাবস্থায় ডায়াবিটিস রোগে ভোগার ঝুঁকির দলে পড়েন। গর্ভাবস্থায় মধুমেহ রোগ নির্ধারণ ও চিকিৎসা সাধারণ মধুমেহ রোগের মতো নয়। গর্ভাবস্থায় ডায়াবিটিস হলে মা ও বাচ্চা দুজনেরই সমস্যা হতে পারে। বাচ্চার ওজন খুব বেশি হওয়া, ভবিষ্যতে তার ডায়াবিটিস হওয়া, জন্মগত ত্রুটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মায়ের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ জনিত রোগ ও খিঁচুনি, অপারেশনের আশঙ্কাও বেড়ে যায়। তা ছাড়া আরও অনেক সমস্যা হতে পারে।

প্রশ্ন: যে সব রোগীদের পায়ে ডায়াবিটিসের জন্য নার্ভের সমস্যা হয়, তাঁদের কী সাবধানতা নেওয়া দরকার?

উত্তর: দেখুন, যে সব ডায়াবিটিসের রোগীদের নার্ভের রোগ হয়েছে তাঁদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যে হেতু পায়ের সাড় একটু কমে যায়, তাই আঘাত লাগলে বোঝা মুশকিল। সে জন্য ঘুম থেকে উঠে এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে পায়ের দিকে ভাল করে লক্ষ রাখতে হবে। নরম জুতো ব্যবহার করা ভাল। প্রতি দিন জুতো জোড়া ভাল করে দেখুন, কোনও কাঁটা বা পিন জাতীয় কিছু আছে কি না। ত্বকে ময়েশ্চারাইজার
ব্যবহার করা যেতে পারে কিছু ক্ষেত্রে। সর্বোপরি, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতেই হবে।

প্রশ্ন: অনেক রোগীর হাইপোগ্লাইসেমিয়া ( হঠাৎ সুগার কমে যাওয়া) ভোগেন। এ ক্ষেত্রে অনেকেই হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই মারা যান। হাইপোগ্লাইসেমিয়া কী ভাবে আটকানো যেতে পারে?

উত্তর: হাইপোগ্লাইসেমিয়া আটকানোর সব থেকে ভাল উপায় ঠিক মাত্রায় ডায়াবিটিসের ওষুধ খাওয়া বা ইনসুলিন নেওয়া। সময়ে সময়ে খাওয়াও জরুরি। সব কিছু ঠিক থাকলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া প্রায় থাকেই না। যদি কোনও ভাবে হঠাৎ সুগার কমে গিয়ে থাকে, তা হলে সাধারণ লক্ষণগুলি দেখে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যেমন, হঠাৎ খুব দুর্বল হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, হঠাৎ ঘাম ঝরতে থাকা ইত্যাদি। এই রকম কোনও লক্ষণ পেলেই সুগার মাপার যন্ত্রের মাধ্যমে সুগার পরীক্ষা করুন। যদি সুগারের মাত্রা ৭০ এমজি-র কম থাকে তা হলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

প্রশ্ন: অনেক রোগীই অভিযোগ করেন, তৎক্ষণাৎ সুগার মাপার যন্ত্রের ফলাফল পরীক্ষাগারের রিপোর্টের সঙ্গে মেলে না। যন্ত্রগুলি কতটা ঠিক পরিমাপ দেয়?

উত্তর: না, আমার তা মনে হয় না। বাজারে যে সব যন্ত্রগুলি পাওয়া যায়, সেগুলির ঠিক পদ্ধতি মেনে ব্যবহার শেখাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতি আপনার চিকিৎসক বা ডায়াটেশিয়ান এডুকেটর সহজেই বলে দিতে পারেন। বিশেষ কিছু ক্ষেত্র বাদ দিলে বাজারে পাওয়া যায় এমন সুগার মাপার যন্ত্রের রিপোর্ট ঠিকঠাক থাকে।

প্রশ্ন: যোগ ব্যায়ামের সঙ্গে সুগার নিয়ন্ত্রণের কোনও সম্পর্ক আছে?

উত্তর: অবশ্যই। যোগ ব্যায়াম শরীরের স্ট্রেস অনেকটাই কমাতে পারে। যা মধুমেহ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তবে সেই যোগ ব্যায়াম অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো করা দরকার।

প্রশ্ন: হাঁটা ছাড়া আর কী কী ব্যায়াম বা জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন করা যেতে পারে?

উত্তর: সাইকেলিং, সাঁতার, স্কিপিং, মাংসপেশীর ব্যায়াম ইত্যাদি করা যেতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রশ্ন: ভারতে ডায়াবিটিস রোগীর সংখ্যা চীনের পরেই। ডায়াবিটিস প্রতিরোধের কোনও সহজ উপায় আছে কি?

উত্তর: টাইপ-ওয়ান ডায়াবিটিস প্রতিরোধ করা আপনার হাতে প্রায় নেই বললেই চলে। টাইপ-টু যেটা ৯০-৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে হয়, কিছু সাবধানতা নিলে প্রতিরোধ করা যায়। অলস জীবন ছেড়ে কর্মব্যস্ত জীবনযাপন করুন। খেলাধুলো করুন। নিয়মিত হাঁটুন যদি না বিশেষ কিছু রোগ থাকে। ফল ও আনাজ বেশি করে খান। শর্করা, প্রোটিন ও ফ্যাটের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করতে হবে। ধূমপান বর্জন করুন, মদ্যপান কমিয়ে দিন (ছেড়ে দিলেই ভাল), ৩০ বছর বয়স হলে প্রতি বছর সুগারের পরীক্ষা করান, ওজন কমানোর চেষ্টা করুন। এগুলি করলে এই রোগ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে।

সাক্ষাৎকার: বিপ্লব ভট্টাচার্য

সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা