ইউপি ভোটে সহিংসতার দায় নিচ্ছে না কেউ

এই নির্বাচনে রক্তপাতের জন্য বিএনপি সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকেই দুষছে। সাংবিধানিক ক্ষমতার দিকে ইঙ্গিত করে ভোট সংঘাতমুক্ত রাখার দায়িত্ব ইসির উপরই দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তৃত্ব দৃশ্যত নিতে না পারার মধ্যে সহিংসতার জন্য সরকারের দিকে অভিযোগ রয়েছে নির্বাচন কমিশনারদের। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল পুলিশের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেছে।

দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত প্রথম এই নির্বাচনে সংঘাতের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে প্রধান কারণ দেখাচ্ছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের অনেকে।

তার বিপরীতে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব না নেওয়ার পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, রাজনৈতিক কারণ নয়, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব থেকেই ভোটে এই সংঘাত।

সবার এই দায় অস্বীকারের মধ্যে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে একদিন আগেই নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত লেবু মণ্ডলের স্ত্রী সাহিদা বেগমের প্রশ্ন- তার স্বামী তো রাজনীতি করে না, তাহলে মরতে হল কেন?

এসব মৃত্যুর দায় তাহলে কার- সেই প্রশ্ন রেখে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেছেন, “কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। কিন্তু এভাবে নির্বাচনের নামে সহিংসতা ও অনিয়ম চলতে পারে না।”

নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে নির্বাচনী সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এবার ইউপি ভোটে কেন্দ্র দখল, কারচুপি, জালভোট ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলির পাশাপাশি প্রার্থীদের সমর্থকদের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটেছে।

এই স্থানীয় ভোটে প্রাণহানির সংখ্যা দশম সংসদ নির্বাচনে সহিংসতায় মৃত্যুর তিনগুণ বেশি। বিএনপির বর্জন-প্রতিরোধের মুখে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনে সহিংসতায় ২১ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।

এই সহিংসতা বন্ধে ইসিকেই প্রধান উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন।

চতুর্থ পর্বে আরও আটজনের মৃত্যু দেখার পর তিনি রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্বাচন কমিশনকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে সহিংসতা রোধে।”

“শৃঙ্খলার ভার পুলিশের উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে তো হবে না। কন্ট্রোল করতে হবে। ইসির কথা তারা শুনছে কি না- তাও জনগণকে বোঝাতে হবে। সহিংসতা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।”

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সহিংসতা ধাপে ধাপে বেড়েই চলছে।

“এক্ষেত্রে ব্যর্থতা নিরূপণের কথা এলে বলতে হবে- নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ভোটের নামে চলমান প্রাণ সংহারের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।”

নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাসহ সবারই দায় আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এটা সামষ্টিক ব্যর্থতা। কেন এবং কোন প্রেক্ষিতে এসব হচ্ছে, তা বের করতে হবে।”

এবার অনেক স্থানেই চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থী দেখা গেছে। তাদের মধ্যে সংঘাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

ছহুল বলেন, “অনেক দল অংশ নিলেও যেন এক দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। দল মনোনীত ও বিদ্রোহীদের ঝামেলা থামানোই যাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনেরও গা ছাড়া ভাব, এ নিয়ে তাদের সদিচ্ছা আছে বলে মনে হয় না।”

জানিপপ চেয়ারম্যান কলিমুল্লাহ বলেন, “দল থেকে মনোনয়ন পাননি, আর যিনি মনোনয়ন পেয়েছেন- তাদের লড়াই চলছে; না জিতলে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থাকবে না- এমন মনোভাব ছাড়তে হবে।”

উদাসীনতার সমালোচনার মধ্যেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলছেন, তারা নির্লিপ্ত নন। ভোটের সময় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাও নিচ্ছেন তারা। ফলে গোলযোগের মাত্রা ধাপে ধাপে কমছে।

এর আগে একজন নির্বাচন কমিশনার সহিংসতার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা সরকারের ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তার প্রতিক্রিয়া এলেও সম্প্রতি গাজীপুরের পুলিশ সুপারকে পুনর্বহালে ইসির সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলোচনা না করাকে ভালো চোখে দেখছেন না ভোট পর্যবেক্ষকরা।

তবে এরপর ইসির পদক্ষেপকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে সব সবক্ষেত্রেই উত্তরসূরিদের এমন ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন আগের কমিশনে দায়িত্ব পালনকারী ছহুল হোসাইন।

“পুলিশকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, আবার না জানিয়ে পুনর্বহালের আদেশ হয়েছে। ইসি মন্ত্রণালয়কে এ নিয়ে চিঠি দিয়েছে- এভাবেই তো কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। চাইলে তো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে।”

তার মতে, চেয়ে সাড়া না পেলে তখনই ইসি জোর দিয়ে বলতে পারবে যে সহায়তা পাচ্ছে না তারা।

অধ্যাপক কলিমুল্লাহর পরামর্শ, “ইসির একার পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তবুও বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে অন্তত ভোটের দিন সিইসিসহ পাঁচ সদস্যের ইসিকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে যেতে হবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সবখানে।”

চার ধাপে প্রায় আড়াই হাজার ইউনিয়নে ভোট শেষ হয়েছে। ২৮ মে ও ৪ জুন শেষ দুই ধাপে আরও প্রায় দেড় হাজার ইউপির ভোট হবে।

ভোটের অনিয়ম ও সহিংসতার এখনকার চিত্রে হতাশ ছহুল আশা করছেন, ইসি গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে।

তা না হলে যে গণতন্ত্রেরই ক্ষতি, তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

[বিডিনিউজ]