বিচারক অপসারণ ক্ষমতা সংসদকে দেওয়া অবৈধ: হাই কোর্ট

সুপ্রিম কোর্টের ৯ আইনজীবীর করা একটি রিট আবেদনে দেওয়া রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের বিশেষ বেঞ্চ বৃহস্পতিবার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে এই রায় ঘোষণা করে।

রায়ে আদালত বলেছে, “সংসদের মাধ্যমে বিচারকগণের অপসারণ প্রক্রিয়া ইতিহাসের একটি দুর্ঘটনা।”

বিভিন্ন দেশের নজির তুলে ধরে ঘোষিত রায়ে আদালত বলে, “আমাদের বলতে দ্বিধা নেই, ষোড়শ সংশোধনী একটি কালারেবল লেজিসলেশন (কোনো কাজ সংবিধানের মধ্যে থেকে করার সুযোগ না থাকলে আইনসভা যখন ছদ্ম আবরণে ভিন্ন প্রয়োজনের যুক্তি দেখিয়ে একটি আইন তৈরি করে), যা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন সভা থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘন।

“এটা সংবিধানের দুটি মূল কাঠামো ৯৪(৪)১৪৭(২) অনুচ্ছেদেরও লঙ্ঘন। একইসঙ্গে সংবিধানের ৭(বি) অনুচ্ছেদকেও আঘাত করে।”

রায় ঘোষণা করে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রুল যথাযথ (অ্যবসলিউট) ঘোষণা করা হল। ষোড়শ সংশোধনী আইন ২০১৫ কালারেবল, এটি বাতিল এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হল।”

ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে একমত ছিলেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক।

অন্যদিকে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ভিন্নমত পোষণ করে রিট আবেদনটি খারিজের পক্ষে মত দেন বলে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা জানান।

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ। আদালত আমাদের আপিল করার জন্য সার্টিফিকেট দিয়েছে। এখন এটি আপিল হিসেবে গণ্য হবে। এই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে রোববারই আমরা চেম্বার আদালতে যাব।”

অন্যদিকে রিট আবেদনকারীপক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এই রায়ের ফলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণ পদ্ধতি বহাল হল।

“গত দেড় বছর ধরে আমরা যেখানে আটকে ছিলাম, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া যেত না; দুর্নীতি বলেন, অদক্ষতা বলেন, অযোগ্যতা বলেন- যাই হোক। সেই অচলাবস্থা দূর হয়ে গেল। এখন ইচ্ছা করলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।”

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক হাই কোর্টের এই রায়কেই ‘সংবিধান পরিপন্থি’ বলেছেন। রায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিচারপতিদের বেতন-ভাতার বিল সংসদে উত্থাপনের সময় ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা।

রিট থেকে রায়

উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

অসদাচরণের জন্য উচ্চ আদালতের কোনো বিচারককে কীভাবে অপসারণ করা যাবে, সে প্রক্রিয়া নির্ধারণে আরেকটি আইনের খসড়ায় সম্প্রতি সম্মতি দেয় মন্ত্রিসভা।

ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৫ নভেম্বর হাই কোর্টে এই রিট আবেদন হয়। প্রাথমিক শুনানির পর হাই কোর্ট ২০১৪ সালের ৯ নভম্বর রুল দেয়। রুলে ওই সংশোধনী কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, আইন সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

এই রুলের উপর গত বছর ২১ মে শুনানি শুরু হয়। ওইদিন আদালত মতামত দিতে অ্যামিচি কিউরি হিসেবে জ্যেষ্ঠ পাঁচ আইনজীবীর নাম ঘোষণা করেন। এর মধ্যে ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও আজমালুল হোসেন কিউসি নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

১৭ দিন শুনানির পর গত ১০ মার্চ আদালত রায়ের দিন ঠিক করে দেয়। এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করে আদালত।

রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু এবং রিট আবেদনকারী পক্ষে মনজিল মোরসেদ এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

ক্ষমতা বদল বার বার

>> ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়।

>> পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়।

>>  ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

>> ষোড়শ সংশোধনীর ৯৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ছাড়া কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না।’

>> ৯৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দফা (২) এর অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

> সেই তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি এবং অপসারণের প্রক্রিয়া ঠিক করে তৈরি একটি আইনের খসড়ায় গত ২৫ এপ্রিল নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

Constitution

যে কারণে ‘অবৈধ’

রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, যদি বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়া হয়, তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ‘ক্ষুণ্ন হবে’ বলেছে আদালত।

“সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো সদস্য ভোট দিতে পারেন না। সুতরাং এই বিচারের ক্ষেত্রে বিষয়টি রাজনৈতিক হয়ে যাবে। কমনওয়েলথভুক্ত দেশের কথা আদালত বলেছে, সেখানে ট্রাইব্যুানালে বিচারকদের বিচার হয়।”

মনজিল মোরসেদ বলেন, “আদালত বলেছেন, সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হবে। জনগণের ধারণা- বিচার বিভাগের ওপর একটি খড়্গ স্থাপন করা হয়েছে। এই পাবলিক পারসেপশনের কারণে স্বাধীনভাবে বিচার করলেও তা জনমনে কতটুকু আস্থা সৃষ্টি করবে, সে সন্দেহ আছে।

“সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে সংসদের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। কিন্তু তা সঠিক নয়। দেখা যাচ্ছে শতকরা ৬৩ ভাগ কমনওয়েলথভুক্ত দেশে সংসদের বাইরে বিচারকদের অপসারণ প্রক্রিয়া রয়েছে। তা হয় ট্রাইব্যুনাল, নইলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল।

“সরকারপক্ষ বলেছে, বিভিন্ন দেশে সংসদের মাধ্যমে অপসারণের আইন আছে। এ বিষয়ে আদালত বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ওইসব দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের দলের বিরুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে দল ও ক্ষমতাসীনরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে- বিচারক কে থাকবে, কে থাকবে না। যদি সেটি হয়, তাহলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ সৃষ্টি হতে পারে।”

শুনানির যুক্তি, পাল্টা যুক্তি

রুলের ওপর শুনানিতে আদালতের পরামর্শদাতা (অ্যামিকাস কিউরি) হিসেবে দেওয়া মতামতে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম অংশ। জাতীয় সংসদের হাতে বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে। তাই এই সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি গণ্য করা যেতে পারে।

রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম  শুনানিতে বলেছিলেন, বিচারপতিদের অপসারণের প্রক্রিয়া আগে ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। ষোড়শ  সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সংসদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি এই অপসারণ করবেন। আর সংসদ তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ দেবে।

ওই তদন্ত কমিটি কীভাবে গঠিত হবে সে বিষয়ে একটি বিল এখন পর্যন্ত বিবেচনাধীন জানিয়ে তিনি শুনানিতে বলেন, “এটি আইনে পরিণত হলেই কিন্তু এ বিষয়ে কারণ (কজ অব অ্যাকশন) উদ্ভব হবে। কাজেই আমার বক্তব্য হল, জনস্বার্থ মামলা হিসেবে যারা মামলাটি করেছেন- তাদের মামলা করার সময় আসেনি।

“আইন হওয়ার পরে আইনে যদি কোনো রকম ব্যত্যয় হয়, দেখা যায় সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক- তখনই কারণ উদ্ভব ঘটবে এটা চ্যালেঞ্জ করার।”

এ কারণে রিট আবেদনটি ‘মেনটেইনেবল না’ (গ্রহণযোগ্য নয়) বলে যুক্তি দেখান তিনি।

অন্যদিকে রিট আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ শুনানিতে বলেছিলেন, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারকের অপসারণের বিধানটি ছিল। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে আপিল বিভাগও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওই বিধানটি সুরক্ষা দিয়েছিল। এই সুরক্ষার পর পঞ্চদশ সংশোধনী যখন পাস হয়, তখন সংসদ ওই ৯৬ অনুচ্ছদকে সংরক্ষিত করেছিল।

“হঠাৎ করে কিছুদিন পরে ৯৬ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে এই ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই পরিবর্তন হয়েছে সংবিধানের মৌল কাঠামোকে পরিবর্তন করে। কারণ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে থাকা ৭(বি) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে মৌল কাঠামো পরিবর্তন করা যাবে না।”

আনোয়ার হোসেন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মূল কাঠামো। যেহেতু ‘মূল কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে’, সেহেতু ষোড়শ সংশোধনী সংবিধান পরিপন্থি।

“এই ক্ষমতাটা যদি সংসদের হাতে দেওয়া হয়, তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ হতে পারে। তাই এই ক্ষমতাটা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াটা যৌক্তিক হবে না।

[বিডিনিউজ]