খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট পরিচালিত গবেষণাঃচাকমা জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে

গত কয়েক দশকে খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী চাকমা জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। বেড়েছে শিক্ষার হার। এ ছাড়া এই জনগোষ্ঠীর মানুষজন এখন জুমচাষ ছাড়াও নানা পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। বিনিয়োগ করছেন ব্যবসা-বাণিজ্যেও। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় বসবাসরত চাকমা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে এই গবেষণা কাজ পরিচালনা করেন গবেষক সুগত চাকমা।

গত ২৮ এপ্রিল দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজ মিলনায়তনে খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট আয়োজিত এক সেমিনারে সুগত চাকমা ২৪ পৃষ্ঠার গবেষণা প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, গবেষক সুগত চাকমা রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক। সেমিনারে বিভিন্ন মৌজার প্রধান (হেডম্যান), গ্রামপ্রধান (কারবারি) ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

গবেষণায় বলা হয়, খাগড়াছড়ি জেলায় ১ লাখ ৬১ হাজার ৯৬০ জন চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাকমা সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস দীঘিনালা উপজেলায়। সেখানে বসবাস করছেন ৫৭ হাজার ৫৯৮ জন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা। যেখানে বসবাস করছেন ৩১ হাজার ৪৩১ জন।

গবেষক সুগত চাকমা জানান, জেলার বিভিন্ন পেশাজীবী ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের সাক্ষাৎকার, বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদ থেকে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার দপ্তরে রক্ষিত তথ্য ও এ–বিষয়ক নানা বইপত্র বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি গত আট মাসে সম্পাদন করেছেন তিনি।

সুগত চাকমার গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত কয়েক দশকে চাকমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। এ জনগোষ্ঠীর লোকজন মূলত কৃষিজীবী হলেও সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে এখন অনেকেই আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন। বাড়ছে কলের লাঙলের ব্যবহার। প্রান্তিক এলাকাগুলোতে সীমিত পরিমাণে জুমচাষ হলেও এখন এর ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে। পাহাড়ি এলাকায় ফলের বাগান করে আয় বাড়িয়েছেন অনেক কৃষক।

জেলায় চাকমাদের মধ্যে শিক্ষার হারও বেড়েছে। দেখা গেছে, কোনো কোনো চাকমা গ্রামের শতকরা ৪০ ভাগ লোক শিক্ষিত। আবার কোথাও এই হার এর দ্বিগুণ। শিক্ষিত চাকমাদের বিরাট অংশ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থায়, ব্যাংকে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা পদে চাকরি করছেন। খাগড়াছড়ি জেলার নয়টি কলেজে চাকমা জনগোষ্ঠীর ৭০ জন এখন শিক্ষকতা করছেন। জেলায় সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে ৩০ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। নয়টি ব্যাংকে ৬৮ জন চাকমা কর্মরত আছেন, যা মধ্যে ৪৬ জন পুরুষ ও ২২ জন নারী। এ ছাড়া ফল, কাঠ, মসলা ও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসাও করছেন অনেকে। তবে শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত চাকমাদের মধ্যে আয় বৈষম্য বাড়ছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে রাজনৈতিক ভেদাভেদ ও সংঘাতের কারণে চাকমা জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে চাকমা জনগোষ্ঠীর ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এখন এগিয়ে।

খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের গবেষণা কর্মকর্তা জিতেন চাকমার সভাপতিত্বে গবেষণার ওপর আলোচনা করেন দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নব কমল চাকমা, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জওহরলাল চাকমা, দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ তরুণ কান্তি চাকমা, কাচালং ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক লাল বিহারী চাকমা, দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক দীলিপ চৌধুরী প্রমুখ।

খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের গবেষণা কর্মকর্তা জিতেন চাকমা বলেন, খাগড়াছড়ি জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ওপর এ ধরনের গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে খাগড়াছড়ির চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আরও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যাবে। পাশাপাশি মারমাদের লোকজ চিকিৎসাব্যবস্থা ও মুক্তিযুদ্ধে খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়েও গবেষণা হচ্ছে। এর মধ্যে দীঘিনালায় চাকমা, মহালছড়িতে মারমা, মাটিরাঙ্গায় ত্রিপুরা ও পানছড়িতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

[প্রথম আলো]