আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবসঃ ১১ লাখ রোহিঙ্গার চাপ বাংলাদেশের কাঁধে

অনলাইন ডেস্কঃ
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থান করছে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা চার দফায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তারা দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করায় এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে প্রায় ১৩ বছর। নতুন করে রোহিঙ্গা সংকটেরও দশ মাস পার হয়েছে। নতুন আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা চুক্তি হয় সাত মাস আগে। কিন্তু এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু নিয়ে দিন দিন অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাই দিন যতই গড়াচ্ছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে অস্থিরতা। একই সঙ্গে বাড়ছে খুনসহ নানা অপরাধ।

আজ ২০ জুন- বিশ্ব শরণার্থী দিবস। অসংখ্য রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ দিবসটি পালিত হবে। এদিকে, বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা একটি শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু সোমবার রাতে ক্যাম্পের জনপ্রিয় এক রোহিঙ্গা নেতা খুনের ঘটনায় ওই কর্মসূচির আয়োজন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

দেশে বর্তমানে রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রকৃত সংখ্যা কত- এ বিষয়ে জানতে চাইলে বহিরাগমন বিভাগ ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (উখিয়া-টেকনাফের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা) আবু নোমান মোহাম্মদ জাকির হোসেন সমকালকে বলেন, বর্তমানে নতুন ও পুরাতন মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফ দুটি উপজেলায় সর্বশেষ ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়েছে। তবে বর্তমানে সে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের মধ্যে সর্বশেষ ২০০৫ সালের ৫ মে এক পরিবারের দু’জনসহ ৯২ জন নিজ দেশে ফেরেন। ওই সময় দুই লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ রোহিঙ্গা টেকনাফের নয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর ১৯৯২ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে দুই লাখেরও বেশি শরণার্থী মিয়ানমারে ফেরেন। ওই সময় তালিকাভুক্ত আরও নয় হাজার রোহিঙ্গা আটকা পড়ে। এরপর প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়। ২০১২ সালের ৩ জুন মিয়ানমারে তাবলিগ জামাতের ওপর হামলা চালায় রাখাইনরা। সে সময় সংর্ঘষ শুরু হয়। সংঘর্ষ মংডু থেকে আকিয়াব পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। ওই পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে পালানো শুরু করে রোহিঙ্গারা। তাদের অনেকে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যের সীমান্তে পুলিশের ছাউনিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য হতাহত হয়। তখন মিয়ানমার সরকার দাবি করে, এ হামলার সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা জড়িত। পরদিন রাতে হঠাৎ মিয়ানমারের সেনারা সন্ত্রাসী দমনের নামে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ঘিরে ধরপাকড়, হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করে। ওই সময় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ২৪টি সীমান্ত চৌকিতে একযোগে হামলা হয়। আবারও শুরু হয় অপরাধী দমনের নামে অভিযান। পরের দিন ২৫ আগস্ট থেকে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফে।

১৯৯০ সালে চার সদস্যের পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন রোহিঙ্গা নারী দিল বাহার। তিনি মিয়ানমারের হাসসুরাতা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি বলেন, চার সদস্য নিয়ে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এখন আমার ঘরে ১০ জন সদস্য রয়েছে। কিন্তু কক্ষের সংখ্যা বাড়েনি। সাড়ে ২৭ বছর ধরে ওই কক্ষেই বসবাস করতে হচ্ছে। আমার মতো হাজারো শরণার্থী পলিথিনের কক্ষে জীবন কাটাচ্ছে। দিল বাহার জানান, তিনি দেশে ফিরে যেতে চান।

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আবদুল মতলব বলেন, আমরা নিজ দেশে ফিরতে চাই; তবে নাগরিক অধিকার, ধন-সম্পদসহ সবকিছু দিতে হবে। এভাবে আর বাস্তুহারা হিসেবে থাকতে চাই না।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, ২০০৫ সালের জুলাই থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই এ কর্মসূচি স্থগিত করেছে মিয়ানমার। তিনি জানান, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তিনি বলেন, নতুন সমঝোতা চুক্তির পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের কাছ থেকে অনুকূল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম দফায় দেওয়া তালিকার মাত্র আট শতাংশ তারা অনুমোদন দিয়েছে। মাত্র আট হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা যাচাই-বাছাই করতে তাদের এত সময় প্রয়োজন হলে ১১ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনে কত সময় লাগতে পারে ভাবতে গেলে আতঙ্কিত হই। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখালেও তাদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো করতে পারি না। এ মুহূর্তে তাদের নিরাপদে স্বদেশে ফেরত পাঠানো জরুরি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

বাড়ছে অপরাধ :

কক্সবাজার জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাঁচ মাসে রোহিঙ্গাদের দ্বারা ১৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অর্ধশত রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। ক্যাম্প থেকে ১১টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক। ৬৭টি মাদক মামলায় ১০২ রোহিঙ্গাকে আসামি করা হয়েছে। সূত্র জানায়, ৫ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২১৪টি বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য থানায় মামলা হয়েছে।

উখিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আন্দোলনের নেতা মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা নানা অপরাধ করলেও তাদের পুলিশে দেওয়া যায় না। নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো ব্যবস্থাও নেই বিশাল ক্যাম্পে। এই অবস্থায় আতঙ্কে বসবাস করছে পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষ। তাদের বসতভিটা, ফসলের ক্ষেত, সামাজিক বনায়ন, এমনকি শ্রম বাজারও রোহিঙ্গাদের দখলে চলে যাচ্ছে।

উখিয়া থানার ওসি মো. আবুল খায়ের জানান, বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এখানে অপরাধ প্রতিদিনই বাড়ছে। তিনি বলেন, এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়েই রাত-দিন ব্যস্ত রয়েছি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন বলেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও উদ্বিগ্ন। বিশাল ক্যাম্পে কাজ করা পুলিশের পক্ষেও কঠিন। তারপরও পুলিশ সদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। পুলিশ সুপার আরও বলেন, যতই দিন যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের আচার-আচরণে পরিবর্তন আসছে। তারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে সাতটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নয়টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। রয়েছে পুলিশের ১২টি বিশেষ মোবাইল টিম।

সূত্রঃ সমকাল