আর কত চুপ থাকবেন, সোচ্চার হোন সাংবাদিকতাকে বাঁচান

এস এম হানিফ:
সাংবাদিকতা মহান পেশা, সাংবাদিকেরা জাতির বিবেক, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র। একটি পেশার মর্যাদার জন্য এর চেয়ে আর বড় বিশেষণের দরকার পড়ে না।

আমি মনে করি, উপরের বিশেষনগুলো সাংবাদিকদের জন্য একটা সময়ে(?) ছিল। যখন সাংবাদিকতার গায়ে দালাল বা চাঁদাবাজ ট্যাগ লাগেনি। আর এখন আপনি কোনো কাজই করতে পারছেন না, নেমে পড়ুন সাংবাদিকতায়। আপনি এসএসসিতে ব্যর্থ, চাকরিতে ব্যর্থ, বিদেশে ব্যর্থ, গাড়ি চালাতে ব্যর্থ, ইয়াবা ব্যবসায় ব্যর্থ, মাদক ব্যবসায় ব্যর্থ, মাস্তানিতে ব্যর্থ, দোকানদারিতে ব্যর্থ ইত্যাদি সবজায়গাতে ব্যর্থ হয়ে নাম লেখালেন সাংবাদিকতায়। আপনি কিন্তু এখানে মহা সফল! কারন এখানে লাগছে না পড়ালেখা, লাগছে না কোনো পুঁজি! এরচেয়ে ভালো বিজনেস আর কি হতে পারে?

আমি মনে করি, এ পেশাটাকে বরবাদ করতে স্বাধীনতা পরবর্তী যেসব সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারাই মুখ্য ভুমিকা পালন করেছে। আমাদের নেতৃত্বও (প্রেসক্লাব বা ইউনিয়ন) কম দায়ী নয়। এসব সরকার যতক্ষন সাংবাদিকদের কাজে লেগেছে, ব্যবহার করেছে। এরপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। সাংবাদিকদের মানোন্নয়ন বা এ পেশার মর্যাদা রক্ষায় কোনো কাজই করেনি। আজ গ্রামেগঞ্জে সাংবাদিক পরিচয় দিলে থুথু ছিঁটছে। ভিক্ষুক ডাকছে। চাঁদাবাজ ডাকছে। সাংবাদিক দেখলে মানুষ মুখ লুকিয়ে রাখছে।

সরকার নির্দিষ্টভাবে সাংবাদিকদের জন্য শিক্ষার মান ঠিক করেনি। এটি সরকারের দোষ বা ভুল। এর ফলে যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক পেশায় জড়িয়ে ফেলছে। যার যখন ইচ্ছে পত্রিকা বের করছে। ইদানিং দেখা যাচ্ছে, নিজের অবৈধ ব্যবসা ঠিকিয়ে রাখতে বা নিজের অপরাধ কর্ম ঢাকতে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন সাংবাদিকতাকে। কত নিচে নেমে গেছে সাংবাদিকতা!

সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালক থেকে শুরু করে ফটোস্ট্যাট বা লাইব্রেরীতে পিয়নের চাকরি করা ছেলেটি পর্যন্ত যার যখন ইচ্ছে সাংবাদিক হয়ে যেতে পারছে। এতে সাংবাদিকদের বদনাম হচ্ছে, মর্যাদার হানি হচ্ছে। দলবেঁধে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে। যা ভিক্ষুকেরা করে থাকেন। ইতিমধ্যে দুষ্টু লোকেরা বলতে শুরু করেছেন, সাংবাদিকতা ভিক্ষুকের পেশায় পরিণত হয়েছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণ দরকার। উত্তরনের জন্য সর্বপ্রথম দরকার সরকারের হস্তক্ষেপ। সরকারই পারে সাংবাদিকদের মানমর্যাদা ফিরিয়ে দিতে। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায়। মাননীয় সরকার প্রধান শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের জন্য অনেক করেছেন। গ্রামেগঞ্জের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষন দিয়ে মানোন্নয়নের চেষ্টা করছেন। ওয়েজ বোর্ড দিচ্ছেন। সব ঠিক আছে। কিন্তু…..সমাজের কি কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে! কখনও যাবে না, যতক্ষন পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা ঠিক করে দেওয়া হবে না।

একটা জেলা বা উপজেলায় একজন সাংবাদিক প্রতিনিয়ত ডিসি, এসপি, ইউএনও বা ওসির মুখোমুখি হচ্ছেন। ওই সাংবাদিক যদি এসএসসিও পাস না করে থাকেন, তাহলে ডিসি সাহেব বা অন্যান্য কর্মকর্তাকে কোন্ সাহসে তিনি একটি প্রশ্ন করবেন। নিজেরও তো সংকোচবোধ হয়! একারনে সম্মানিত কর্মকর্তারাও সাংবাদিকদের নিয়ে দু’কথা বলতে ছাড়েন না অথবা সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা জানার পর কর্মকর্তারা মুখ ফিরিয়ে নেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ঘাটিয়ে-ঘুটিয়ে প্রশ্ন করতে না পারার কারনে নিউজের মানও নিশ্চিত খারাপ হবে।

তাই বলছি আর কত চুপ থাকবেন, এবার সোচ্চার হোন। সাংবাদিকতাকে বাঁচান।

সরকারের কাছে আমার প্রস্তাব- সাংবাদিকদের জন্য নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাস নির্ধারন করা হোক। তারপর একটি নিবন্ধন পরীক্ষা চালু করা হোক। যে পরীক্ষাটির নাম দেওয়া হোক ‘সাংবাদিক নিবন্ধন পরীক্ষা’, যেমনটি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে হচ্ছে (সম্প্রতি ‘শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা’ চালু করা হয়)। সাংবাদিক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তি যে কোনো পত্রিকায় বা টিভি চ্যানেলে আবেদন করতে পারবেন। সে আবেদনের প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়োগ দিলে তিনি সাংবাদিক হতে পারবেন বা ওই পত্রিকা-চ্যানেলের প্রতিনিধি হতে পারবেন। তবে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করে বের হওয়া ছেলেদের এ নিবন্ধন পরীক্ষার আওতামুক্ত রাখা যেতে পারে।

আমার মতে, সাংবাদিকতাকে সমুন্নত রাখতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। ধন্যবাদ সবাইকে। কেউ মনে কষ্ট পেলে ক্ষমা করবেন।

লেখক: সাংবাদিক, প্রথম আলো।