রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশকে হারাল শ্রীলঙ্কা

ক্রীড়া ডেস্ক:

সৌম্য সরকারের প্রথম ফিফটি। মুশফিকুর রহিমের ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ রান। নেতৃত্বের অভিষেকে ব্যাটে উজ্জ্বল মাহমুদউল্লাহ। তিনে মিলে বাংলাদেশ গড়েছিল টি-টোয়েন্টিতে নিজেদের সর্বোচ্চ স্কোর। দল দেখছিল আশার আলো। কিন্তু সেই আলো নিভে গেছে লঙ্কানদের ব্যাটিং তাণ্ডবে। বাংলাদেশের রেকর্ড ছাপিয়ে শ্রীলঙ্কা জিতেছে রেকর্ড গড়ে।

দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশকে ৬ উইকেটে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের ১৯৩ রানের চ্যালেঞ্জ লঙ্কানরা জিতে নিয়েছে ২০ বল বাকি রেখেই।

টি-টোয়েন্টিতে এটিই শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়। গত বছর অস্ট্রেলিয়ার ১৭৩ রান তাড়ায় জয় ছিল আগের সর্বোচ্চ।

রেকর্ড গড়া জয় দিয়ে পরাজয়ের একটি বৃত্ত ছিঁড়ে বের হলো শ্রীলঙ্কা। গত এপ্রিলে দেশের মাটিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে হার দিয়ে শুরু করে টানা ৮ টি-টোয়েন্টি হেরে অবশেষে তারা পেল জয়ের দেখা। চার অভিষিক্তকে নিয়ে দলের চেহারা পাল্টালেও বাংলাদেশ পারল না হতাশাময় সময়কে দূরে ঠেলতে।

অথচ ম্যাচের মাঝ বিরতিতে বাংলাদেশকেই মনে হচ্ছিলো ফেভারিট। উইকেট যদিও ব্যাটিংয়ের জন্য ছিল দারুণ। লক্ষ্য তো তবু দুইশ ছুঁইছুঁই! কিন্তু লঙ্কানদের ব্যাটিংয়ে এই রান তাড়াও মনে হলো কতই না সহজ!

শ্রীলঙ্কার রান তাড়ার শুরুই বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনের ওভারে আসে চারটি চার। দানুশকা গুনাথিলাকা ও কুসল মেন্ডিস মিলে ৫০ তুলে ফেলেন ৪.৩ ওভারেই।

বেশি আগ্রাসী ছিলেন যিনি, সেই গুনাথিলাকাকে (১৫ বলে ৩০) ফিরিয়ে প্রথম উইকেটের দেখা পান অভিষিক্ত বাঁহাতি স্পিনার নাজমুল ইসলাম অপু।

সঙ্গীকে হারিয়ে আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন মেন্ডিস। কুশল পেরেরা চোট না পেলে এই সিরিজে তার খেলাই হতো না। সুযোগ পেয়ে নিজের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের বাঁক বদলে দিলেন তরুণ ব্যাটসম্যান। আগের ৮ ম্যাচে সর্বোচ্চ ছিল ২২। এবার ২৭ বলে ৫৩!

পরপর দুই ওভারে মেন্ডিস ও উপুল থারাঙ্গার বিদায়ে বাংলাদেশের সুযোগ ছিল ম্যাচে ফেরার। কিন্তু দাসুন শানাকা ও থিসারা পেরেরার দুর্দান্ত ব্যাটিং আর বাংলাদেশের বাজে বোলিং মিলিয়ে সেটি আর হয়ে ওঠেনি। জমেনি এমনক লড়াইও।

তিনটি করে চার ও ছক্কায় ২৪ বলে ৪২ রানে অপরাজিত ছিলেন শানাকা। আগেও অনেকবার বাংলাদেশের ভোগান্তির কারণ থিসারা ৩৯ রানে অপরাজিত ১৮ বলে।

১৭ ওভারের কম ব্যাট করে লঙ্কানরা চার-ছক্কা মেরেছে ৩১টি! নাজমুল অপু ছাড়া বাকি সব বোলার রান গুণেছেন ওভারপ্রতি দশের বেশি।

শেষটা যতটা হতাশার, ম্যাচের শুরুটা বাংলাদেশের জন্য ছিল ততটাই আশা জাগানিয়া। তামিম ইকবাল না থাকায় নতুন উদ্বোধনী জুটিতে সৌম্যর সঙ্গী হন জাকির হাসান। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা দলকে দুজন এনে দেন ভালো শুরু।

সৌম্যর ব্যাট এতটা উত্তাল ছিল যে জাকিরকে খুব বেশি কিছু করতে হয়নি। এমনিতেই গড়ে ওঠে বিধ্বংসী জুটি।

অভিষিক্ত শেহান মাদুশাঙ্কার করা প্রথম ওভার থেকেই আসে ১৭ রান। প্রথম চার বলের মধ্যে সৌম্যর চার ও ছক্কার পর শেষ বলে জাকির মারেন চার। তৃতীয় ওভারে ইসুরু উদানাকে টানা তিন চার মারেন সৌম্য। ৪ ওভারেই রান আসে ৪৯।

সৌম্যকে মারতে দেখেই হয়ত নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি জাকির। গুনাথিলাকাকে স্লগ করতে গিয়ে বোল্ড ৯ বলে ১০ রানে।

সৌম্যর ঝড় তাতে থামেনি। আকিলা দনঞ্জয়াকে মারেন চার-ছক্কা। বাড়তে থাকে রান। মুশফিক শুরুতে এগিয়েছেন এক-দুই রান নিয়ে। হাত খোলেন আক্রমণে ফেরা মাদুশাঙ্কার এক ওভারে দুটি চার মেরে।

ষষ্ঠবারের চেষ্টায় অবশেষে চল্লিশের ফাঁড়া কাটান সৌম্য। আগের ২৬ ম্যাচে ৫ বার ৪০ ছুঁয়ে আউট হয়েছেন পঞ্চাশের আগে। তিরিশ পেরিয়েছেন আরও তিনবার। সেই জাল ছিঁড়ে এবার পেয়েছেন প্রথম টি-টোয়েন্টি ফিফটি।

তার ইনিংসটি শেষ হয়েছে জোড়া ভুলে। লেগ স্টাম্পের বেশ বাইরে পিচ করা বলে এলবিডব্লিউ দেন আম্পায়ার। সুইচ হিট খেলতে গিয়ে পায়ে টান লাগায় ব্যথায় ভুলে গিয়েই কিনা, সৌম্য রিভিউ নেননি। থামেন ৬ চার ও ২ ছক্কায় ৩২ বলে ৫১ রানে। মুশফিকের সঙ্গে তার জুটির রানও ছিল ৫১।

সাড়ে চার বছর পর টি-টোয়েন্টি খেলতে নেমে প্রথম বলেই উইকেট নেন জিবন মেন্ডিস। এক বল পর উইকেট নেন আরেকটি। অভিষিক্ত আফিফ হোসেন আউট শূন্য রানের। বল তার পায়ে লাগার পর ব্যাটের পেছনে লেগে জমা পড়ে কিপারের গ্লাভসে।

বাংলাদেশ সেরা জুটি পায় এরপরই। উইকেটে গিয়েই চোখধাঁধানো সব শট খেলতে থাকেন মাহমুদউল্লাহ। এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে মাদুশাঙ্কাকে মারা ছক্কাটি সম্ভবত ম্যাচেরই সেরা শট। মুশফিকের ব্যাটও ছুটতে থাকে। ৪৭ বলে দুজনে গড়েন ৭৩ রানের জুটি।

দুটি করে চার ও ছক্কায় মাহমুদউল্লাহ করেছেন ৩১ বলে ৪৩।টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে প্রথমবার তিনে ব্যাট করে ৭ চার ও ১ ছক্কায় ৪৪ বলে অপরাজিত ৬৬ মুশফিক।

২০১৩ সালের নভেম্বরে টি-টোয়েন্টিতে প্রথমবার ফিফটি করেছিলেন মুশফিক। দ্বিতীয়টি করলেন ২৫ ইনিংস পর। বাংলাদেশও তাতে ছুঁয়ে ফেলে নতুন উচ্চতা।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সব প্রাপ্তি পিষ্ট হলো লঙ্কানদের অসাধারণ রান তাড়ায়।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১৯৩/৫ (জাকির ১০, সৌম্য ৫১, মুশফিক ৬৬*, আফিফ ০, মাহমুদউল্লাহ ৪৩, সাব্বির ১, আরিফুল ১*; মাদুশাঙ্কা ০/৩৯, গুনাথিলাকা ১/১৬, উদানা ১/৪৫, থিসারা ১/৩৬, দনঞ্জয়া ০/৩২, জিবন ২/২১)।

শ্রীলঙ্কা: ১৬.৪ ওভারে ১৯৪/৬ (কুসল ৫৩, গুনাথিলাকা ৩০, থারাঙ্গা ৪, শানাকা ৪২*, ডিকভেলা ১১, থিসারা ৩*; নাজমুল ২/২৫, সাইফ ০/৩৩, মাহমুদউল্লাহ ০/২৩, রুবেল ১/৫২, মুস্তাফিজ ০/৩২, আফিফ ১/২৬)

ফল: শ্রীলঙ্কা ৬ উইকেটে জয়ী

সিরিজ: ২ ম্যাচ সিরিজে শ্রীলঙ্কা ১-০তে এগিয়ে

ম্যান অব দা ম্যাচ: কুসল মেন্ডিস

সূত্র: বিডিনিউজ।