২০১৭: নিস্তরঙ্গ কাটল রাজনীতির মাঠ

নিউজ ডেস্ক:

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগের বছরটি নিরুত্তাপ গেলেও সামনে অস্থিরতার ইঙ্গিত রয়েছে।

রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যাওয়া খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা কিংবা পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে যাওয়া মির্জা ফখরুল ইসলামকে বাধা দেওয়ার মতো দুয়েকটি ঘটনা খানিক উত্তাপ ছড়ালেও সারা বছর নিরুত্তাপই ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন।

ভোটের আগের বছরের পুরোটা সময়ই দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা পরস্পরের প্রতি বাক আক্রমণ চালিয়ে গেছেন। দুই প্রধান নেত্রীও পরস্পরকে ধরে কথা বলেছেন, যার একটি ঘটনা উকিল নোটিস পর্যন্ত গড়িয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চেষ্টা ছিল নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ঘর গোছানোর; কিন্তু তাদের সেই প্রয়াসের দৃশ্যমান সফলতা দেখা যায়নি, বরং স্থানীয় পর্যায়ে নেতা ও আইনপ্রণেতাদের কোন্দল আরও প্রকাশ্য হয়েছে।

অন্যদিকে কর্মসূচি পালনে ক্ষমতাসীনদের বাধা পাওয়ার অভিযোগ আগের মতোই করে এসেছে বিএনপি; আর দল গোছানোর ক্ষেত্রে এটাও অন্তরায় হিসেবেও দেখিয়ে আসছেন দায়িত্বশীল নেতারা।

জাতীয় পার্টির ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ অবস্থান আগের মতোই ছিল। তবে বছর শেষে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীর জয়ে অনেকটাই ফুরফুরে হয়ে ওঠেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ।

এর বাইরে বাম দলগুলো মোর্চা বেঁধে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামলেও দেশের সার্বিক রাজনীতিতে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। নিবন্ধনহীন জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামী দলগুলোর সক্রিয়তাও আগের বছরগুলোর তুলনায় কম দেখা গেছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগের বছরটি নিরুত্তাপ গেলেও সামনে অস্থিরতার ইঙ্গিত যথেষ্ট রয়েছে, কেননা নির্বাচনের প্রশ্নে এখনও দুই প্রধান দলের মধ্যে কোনো মতৈক্য তো হয়ইনি, বরং ব্যবধান আরও বেড়েছে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেই দিয়েছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না।

গত নির্বাচনের আগে ফোন করলেও এবার তাকে মানানোর কোনো দায়িত্ব যে নেবেন না, সেটা আবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাসীন দলের অন্যরা বলে আসছেন, খালেদা জিয়ার জন্য ভোট আটকে থাকবে না।

এদিকে সারা বছর দুই –একটি সমাবেশ কিংবা শোভাযাত্রার মধ্যে কর্মসূচি সীমিত রাখা বিএনপি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদার মামলায় শাস্তি হলে তার কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর হুমকিও দিয়ে রেখেছে।

আওয়ামী লীগ

সরকারের বাইরে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের তেমন তৎপরতা ছিল না। শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সরকারের উন্নয়নের প্রচার চালাতেই দলীয় নেতাদের নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।

গত বছরের শেষ দিন গাইবান্ধায় দলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন খুন হলে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি। বরং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানো এবং কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির দাবি মেনে হেফাজতের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করেছে বলে মনে করেন অনেকে।

বছরের প্রথম দিনে দল গোছাতে ১০০ দিনের কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন কাদের। কিন্তু তা ঘোষণাতেই থেকে গেছে।

বিদেশ ফেরত প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেওয়া এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ হাসিনার সমাবেশ ধরেই কেবল দলটির তৎপরতা দেখা গেছে।

বিভিন্ন স্থানে কোন্দলে জড়িয়ে পড়া নেতাদের হুঁশিয়ারই করে গেছেন কাদের। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর হারের জন্যও এই কোন্দলকেই দায়ী করা হয়।

এর মধ্যেই দলে অনুপ্রবেশ ঘটেছে দাবি তুলে তাদের ‘কাউয়া-ফার্মের মুরগি’ বলার পর নেতাদের সমালোচনায় পড়তে হয়েছিল ওবায়দুল কাদেরকে।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক জোট ১৪ দলের তৎপরতা সংবাদ সম্মেলন এবং দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ; শরিক দলের নেতাদের অসন্তোষও রয়েছে আওয়ামী লীগের আচরণে।

সহযোগী চারটি সংগঠনের সম্মেলন করতে পারলেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংগঠন ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়নি। এই সংগঠনটির নেতাদের কোন্দল-সংঘাতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে আওয়ামী লীগকেও। এজন্য ছাত্রলীগকে ‘তাফালিং’ না করার পরামর্শও দিতে দেখা যায় কাদেরকে।

বছর শেষে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থীর হারের পর ‘রাজনৈতিক বিজয়’ বলে সান্ত্বনা খুঁজতে হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের।

বিএনপি

দশম সংসদ নির্বাচনের পরের বছর সরকার হঠাতে আন্দোলন চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর যে বিএনপি গুটিয়ে যায়, তা থেকে এখনও বের হতে পারেনি দলটি।

রাজপথে নামতে না পারার পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে অনেকটাই ঠেসে ধরেছে ক্ষমতাসীনরা। আর তা নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে দলটিকে ‘নালিশ পার্টি’ নামে আখ্যায়িত করে আসছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

বিএনপি নেতারা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার ৩২৩ মামলায় আসামির সংখ্যা ৭ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৮। এতে বিপর্যস্ত নেতা-কর্মীরা। তার সঙ্গে রয়েছে ‘গুম-খুন’।

এই অবস্থায় বিভিন্ন কমিটিগুলোকে সক্রিয় করতে পারেনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। ৭৫টি জেলা কমিটির মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটির সংখ্যা মাত্র ৪৫টি। বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের কমিটিগুলোও তামাদি।

তৃণমূল নেতারা বলছেন, সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের যে ক্ষোভ রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে হলে দরকার শক্তিশালী সংগঠন, সেটাই এখন নেই।

রংপুর শহরের সিও বাজারের স্থানীয় বিএনপি কর্মী তমিজউদ্দিনের কথায়, “দলকে ঢেলে সাজানো জরুরি। এই দেখুন না রংপুরে সংগঠনের কী অবস্থা। জনগণের সমর্থন আছে, কিন্তু সংগঠন নেই।”

কক্সবাজারের স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী আবদুল মতিন বলেন, “আমাদের সংগঠনের দুবর্লতাগুলো চিহ্নিত করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। তৃণমূলকে গুরুত্ব দিতে হবে।”

যশোরের মহিলা দলের কর্মী তাবাসুম মুন্নী মনে করেন, দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার অবসান না করা গেলে নির্বাচনের সময় সঙ্কট আরও প্রকট হবে।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের যুবদলকর্মী হাফিজ আহমেদও মনে করেন, আগামী বছর ভোটে অংশ নিতে হলে এথনই দল গোছাতে হবে।

তবে ভোটে বিএনপি অংশ নিলে কীভাবে নেবে, সেটাই এখনও স্পষ্ট নয়। নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখাও এখনও দিতে পারেননি খালেদা জিয়া।

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন এবং নির্বাচন দুটো নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার শাস্তি হলে কী করণীয় হবে, সেটা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে বিএনপি নেতাদের।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সরকার দেশের জনপ্রিয় নেত্রীকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করছে। এটা করে তারা পার পাবে না। এর সমুচিৎ জবাব জনগণই দেবে।”

তবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আশাবাদী, ২০১৮ সাল তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হবে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকার যত কৌশলই করুন না কেন, একাদশ নির্বাচন কোনোভাবে দশম সংসদ নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি মতো হতে দেওয়া হবে না।”

জাতীয় পার্টি

বছর শেষে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাই জাতীয় পার্টির বড় বিজ্ঞাপন হয়ে থাকবে।

এরশাদের জেলা রংপুরে এমনিতেই জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান; ফলে ভোটে এই জয় অপ্রত্যাশিত না হলেও কর্মীদের চাঙা করতে একেই সামনে আনছেন দলের নেতারা।

জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ টি ইউ তাজ রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জাতীয় পার্টি উজ্জীবিত হয়েছে, এগিয়ে চলছে। দুই দলের বিকল্প হিসেবে জাতীয় পার্টিকে জনগণ গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে।”

রংপুরের ভোটের ফলকে ‘বড় চমক’ অভিহিত করে জাতীয় নির্বাচনেও চমক দেখানোর কথা বলেন এরশাদের দলের এই নেতা।

বিএনপিবিহীন সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে আবার সরকারেও অংশ নেওয়া জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে কীভাবে অংশ নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয় দলের নেতাদের কাছে।

এরশাদ গত কয়েক বছর ধরে এককভাবে লড়ার কথা বললেও সম্প্রতি বলেছেন, বিএনপি কী করে, তা দেখেই নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি।

এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বিএনপি ভোটে এলে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধবে, আর বিএনপি না এলে তারা আলাদাভাবে নির্বাচন করবে।

এরশাদের এই দোদুল্যমান অবস্থানের বিষয়ে তার ভাই দলের কো চেয়ারম্যান জি এম কাদের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার মতো অবস্থা আমাদের রয়েছে।

“তবে রাজনীতির বিষয়টা এমন….সবকিছুই পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আমরা প্রস্তুত- আমাদের চেয়ারম্যান সেটাই বলতে চেয়েছেন। একে সুবিধাবাদী দৃষ্টিকোণ হিসেবে দেখার কিছু নেই।”

অন্যান্য দল

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর বিএনপি থেকে যখন আগের মতো কোনো কর্মসূচি আসেনি, তখন হরতাল ডেকে নেমেছিল বাম দলগুলো। কিন্তু তাদের কর্মসূচিতে তেমন সাড়া দেখা যায়নি।

বিভিন্ন নামে বিভিন্ন জোটে থাকা কমিউনিস্ট দলগুলো কোনো মোর্চা গঠন না করলেও কিছু দিন ধরে একসঙ্গে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে থাকা বাম দলগুলোর তৎপরতাও দুই-একটি কর্মসূচির মধ্যে সীমিত ছিল।

তাদের নিয়ে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক জোট গড়ার লক্ষ্যে এগিয়েছিলেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। কিন্তু সাড়া না পাননি। শেষে মান্না, আ স ম রব, বি চৌধুরী ও আব্দুল কাদের সিদ্দিকী ‘যুক্তফ্রন্ট’ একটি জোট গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এখনও কর্মসূচি নিয়ে নামেনি এই জোটটি।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা চালালেও ইসলামী দলগুলোর তেমন সক্রিয়তা দেখা যায়নি। কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির দাবি আদায় হওয়ার পর হেফাজতও অনেকটাই নীরব।

যুদ্ধাপরাধী নেতাদের হারানোর পর নতুন নেতৃত্ব আনা জামায়াতের তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। তিন মাস আগে শীর্ষনেতাদের গ্রেপ্তারের পর হরতাল ডাকলেও রাজপথে দেখা যায়নি নেতা-কর্মীদের।

নিবন্ধন হারানোয় এখন জামায়াত সরাসরি ভোটে অংশ নিতে পারছে না; ফলে তাদের নেতারা কীভাবে অংশ নেয়, তার দেখতে হলে আগামী বছরের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

সূত্র: বিডিনিউজ।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here