প্রয়াত রেবতপ্রিয় মহাথের’র জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে- ওবায়দুল কাদের: বৌদ্ধরা মাথা উচুঁ করে বাচুঁন

আমাদের রামু প্রতিবেদক:
নানান আনুষ্ঠানিকতায় সম্পন্ন হলো আবাল্য ব্রহ্মচারী প্রয়াত রেবতপ্রিয় মহাথের’র জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান। ২৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া জাতীয় পর্যায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান শেষ হয় ২৯ ডিসেম্বর।

কক্সবাজার বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদের সভাপতি প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, ব্যাপক নিরাপত্তা বলয়ের মধ্য দিয়ে ২৭, ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর তিন দিনব্যাপী প্রয়াত ভদন্ত রেবতপ্রিয় মহাথের’র জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে। কোথাও কোন ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং আইন শৃংখলার অবনতি হয়নি।

অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সড়ক. পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, গৌতম বুদ্ধের নীতি আদর্শ আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। বুদ্ধের অহিংস নীতি বিশ্বময় আজ বড়ই প্রয়োজন। বৌদ্ধ সম্রাট অশোকের জীবন চরিত আমি পড়েছি। এটা আমাকে খুব বেশি প্রভাবিত করেছে। আমি মনে করি, তাঁর মত মহান শাসক পৃথিবীর দেশে দেশে থাকা উচিত।

বৌদ্ধরা অত্যন্ত শান্তিপ্রিয় এবং সভ্য একটি জাতি। আপনারা নিজেকে ছোট ভাববেন না। এদেশে সবার অধিকার সমান। মুসলিমরা যেমন ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তেমনি বৌদ্ধরাও এদেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। সবার ভোট সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নাগরিক হিসেবেও সবাই সমান মর্যাদাপূর্ণ। মন ছোট করবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। মাথা উচুঁ করে বাঁচুন। মেরুদন্ড খাঁড়া করে দাঁড়ান। আমি প্রশাসন এবং নেতাকর্মী সবাইকে বলে যাচ্ছি তারা অত্যন্ত নিরিহ এবং শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাদের যেন কোন ক্ষতি না হয়। তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য।

অনুষ্ঠানের শেষ দিন ২৯ ডিসেম্বর প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সভাপতি সংঘবন্ধু ভদন্ত অজিতানন্দ মহাথের’র সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন মৈতলা সদ্ধর্মজ্যোতি বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত শাসনপ্রিয় মহাথের। বিশেষ অতিথি ছিলেন অষ্ট্রেলিয়া থেকে আগত রাজ পন্ডিত ড. বিমলানন্দ মহাথের, ব্যাংকক থেকে আগত ভদন্ত আচান চপ পাশা কমইয়াং, ভারত থেকে আগত ভদন্ত বিনয়শ্রী মহাথের, ভদন্ত ধর্মদর্শী মহাথের, ভদন্ত জিনানন্দ মহাথের, ভদন্ত শীলরক্ষিত মহাথের, ভদন্ত বুদ্ধানন্দ মহাথের, ভদন্ত সুমঙ্গল মহাথের, ভদন্ত শীলানন্দ মহাথের, ভদন্ত শ্রদ্ধানন্দ মহাথের, ভদন্ত ধর্মতিলক ভিক্ষু। ।

প্রধান সদ্ধর্মদেশক ছিলেন ঢাকা মেরুল বাড্ডার আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ধর্মমিত্র মহাথের। বিশেষ সদ্ধর্মদেশক ছিলেন ভদন্ত ধর্মপাল মহাথের, ভদন্ত রাহুলপ্রিয় মহাথের, ভদন্ত দেবমিত্র মহাথের, ভদন্ত প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথের, ভদন্ত বোধিরতন মহাথের, ভদন্ত জিনরতন স্থবির।

উদ্বোধক ছিলেন বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার মহাসচিব ধর্মদূত এস. লোকজিৎ স্থবির। পঞ্চশীল প্রার্থনা করেন প্রাক্তন অব: শিক্ষক অমিয় কুমার বড়ুয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ভদন্ত জ্যোতি প্রিয় স্থবির ও ভদন্ত জ্যোতি কল্যাণ ভিক্ষু।

বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার উপ-সংঘরাজ পন্ডিত ভদন্ত সত্যপ্রিয় মহাথের’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় পর্বের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন ওয়াট থাই জ্ঞানবিরিয় ’র প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ভদন্ত জ্ঞানলংকার মহাথের।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী কমরেড দিলীপ বড়ুয়া, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিষ্টার বিপ্লব বড়ুয়া, সাংসদ আবদুর রহমান বদি, সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল, আশেক উল্লাহ এমপি, পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নিকারুজ্জামান চৌধুরী রবিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার চাইলাউ মারমা, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এড. সিরাজুল মোস্তফা, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতির সভাপতি অজিত রঞ্জন বড়ুয়া, মহাসচিব সুদীপ বড়ুয়া, উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী প্রমূখ।

সদ্ধর্মদেশনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিনবোধি মহাথের, ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহারের উপাধ্যক্ষ, সৌগত সম্পাদক ভদন্ত সুনন্দপ্রিয় থের।

অনুষ্ঠানে মঙ্গলচারণ করেন ভদন্ত জ্যোতি কুশল ভিক্ষু, ভদন্ত জ্যোতি মঙ্গল ভিক্ষু। সঞ্চালনা করেন শিক্ষক মেধু কুমার বড়ুয়া ও রূপন বড়ুয়া।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিলো ঐতিহ্যবাহী অালংনৃত্য। জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ৮টি আলং নৃত্য দল অংশ গ্রহণ করেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় আতশবাজি প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে প্রয়াত ভদন্ত রেবতপ্রিয় মহাথের’র শবদেহে ভিক্ষুসংঘ অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্টান সম্পন্ন করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ১৩ মার্চ ২০১৭ বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৮ বৎসর বয়সে ভদন্ত রেবতপ্রিয় মহাথের পরলোকগমণ করেন। ১৬ মার্চ নানান আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তাঁর মৃতদেহ পেটিকাবদ্ধ করে সংরক্ষণ করা হয়।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি উখিয়া ভিক্ষু সমিতির সভাপতি এবং পাতাবাড়ী আনন্দ ভবন বিহারের অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন।

জানা যায়, ভদন্ত রেবতপ্রিয় মহাথের ১৯৪৯ সালের ১০ জুলাই কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রত্নাপালং ইউনিয়নের এক সম্ভ্রান্ত বৌদ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মাষ্টার ক্ষিরোদ চন্দ্র বড়ুয়া ও মাতা সুভদ্রা বালা বড়ুয়া। দশ ছেলে-মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন ৪র্থ সন্তান।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে তিনি ভিক্ষুধর্ম গ্রহণ করে দীর্ঘ ৪৬ বৎসর পর্যন্ত ধর্মপ্রচার করেন।