কিশোর অপরাধ ও আমাদের লোহাগাড়া

ডাঃ মুহাম্মদ ওমর ফারুকঃ
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করিঃ- গত ২৬ নভেম্বর লোহাগাড়া বটতলী স্টেশনে ক্ষমতাশীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে দোকানে দোকানে গিয়ে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে মুহাম্মদ ইসমাইল ও রেজাউল করিম নামে দুই কিশোর চাঁদাবাজ।পরে এই কিশোরদের অভিভাবকের কাছ থেকে এই ধরনের অপরাধ পুনঃরায় না করার শর্তে মুচলেখা নিয়ে লোহাগাড়া শহর পরিচালনা কমিটি’র সদস্য মিছবাহ উদ্দিন রাজিব সহ উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের একাত্ত্বতায় দুই কিশোরকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

উক্ত ঘটনার ঠিক পরের দিন উক্ত দুই কিশোর লোহাগাড়া বটতলী স্টেশনে মোবাইল মার্কেটের সামনে ছিনতায় করতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়ে এবং পরে তাদেরকে প্রশাসনের কাছে তুলা দেওয়া হয়। যদিও বা উক্ত বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দুই কিশোরের মুলহুতা বা ইন্ধনদাতা কে তা চিন্থিত করার জোরালো দাবী উঠেছিল,তবে জানিনা আদৌ চিন্থিত হয়েছিল কিনা!

উপরোক্ত দুই ঘটনাটি এখন শুধু লোহাগাড়া স্টেশনের চিত্র নয়,পুরা লোহাগাড়া তথা পুরা সমাজের চিত্রটি এখন এমনি।কেউ ধরা পড়ছে আবার কাউকে চক্ষুলজ্জায় ধরা হচ্ছে না আবার কেউ কেউ ধরা না বিধায় আমাদের অজানা থেকে যাচ্ছে।

কৈশোরের ধরন
কিশোর জীবনটা হচ্ছে মৃৎ শিল্পে ব্যবহৃত কাদা মাটির মত।তাকে কিভাবে রূপ দেওয়া হবে তা নিদ্ধারন হয় শিল্পীর মনোইচ্ছার উপর।শিল্পী ইচ্ছা করলে কাদামাটি গুলো পবিত্র কোন পথিকৃতির রূপও দিতে পারে আবার চাইলে নগ্ন, নিকৃষ্ট,অপবিত্র বস্তুরও রূপ দিতে পারে। আর এই কিশোর জীবনের শিল্পী হচ্ছি-আমরা,সমাজ,পরিবেশ ও রাষ্ট্র।

বর্তমান সমাজে কিশোর অপরাধের ধরন
সমাজ,যুগ পরিবর্তনের সাথে অপরাধের ধরনও পরিবর্তন হচ্ছে,সাথে কিশোর অপরাধের ধরনও।অনেক সময় স্থান ও এলাকা ভেদে অপরাধের ধরনও ভিন্নতর হয়ে থাকে।আপনাদের নিশ্চয় কিশোর অপরাধী ঐশী’র কথা আছে। বর্তমানে আমাদের দেখা মতে কিশোর অপরাধীরা যে সমস্থ অপরাধরে সাথে জড়িয়ে পড়ছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

(১)মাদক সেবন ও মাদক বিক্রী।আমাদের তথ্য মতে আমাদের লোহাগাড়ায় এখন আনুমানিক ৩০/৪০জন কিশোর মাদক বিক্রীতা আছে,যারা কেউ নিজে থেকে এই কাজ করতেছে আবার কেউ কেউ ব্যবহৃত হচ্ছে।

(২) চাঁদাবাজি,চুরি ও ছিনতাই।যার মধ্যে মোবাইল চুরি অন্যতম।

(৩)ইভটিজিং ইত্যাদি।

তবে অতিশয় দূঃখের বিষয় লোহাগাড়ায় এখন কিছু কিশোর অপরাধী পুলিশের সোর্স হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।যা আমাদের মোটেও কাম্য নয়।

কেন এই কিশোর অপরাধের বৃদ্ধি?
যুগ ও চাহিদা যেমন পরিবতনশীল,ঠিক তেমনি অপরাধের কারনও পরিবর্তনশীল।তবে আমরা বর্তমানের কথাটাই বলব।

(১) অভিভাবকের অদক্ষতা বা অজ্ঞতা

কিশোর মন কৌতহল।সেই সময়টিতে কিশোরগন সব কিছুতে অ-বাধা মনে করে,ভাল-মন্দের বাজবিচার করতে পারেনা।সেই সময়টাতে তারা একটু রাগীও হয়ে থাকে এবং বিভিন্ন ছোটখাট অপরাধও করে থাকে,সেক্ষেত্রে অভিভাবকগন যদি তা কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ হয় সেক্ষেত্রে উক্ত কিশোরটি ক্রমান্নয়ে বিপদগামী হয়ে উঠে।তাছাড়া অনেক অভিভাবক সন্তানের প্রতি ভালবাসা দেখাতে গিয়ে অনেক অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে।যা পরবর্তীতে সন্তানের জন্য কাল হয়ে দাড়ায়।

(২) দারিদ্র্যতা

দারিদ্র্য যে অপরাধের জন্য দায়ী, তা বলাই বাহুল্য। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত পরিবারে কিশোর-কিশোরী তার নিত্যদিনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়। ফলে তার মধ্যে কিশোর অপরাধমূলক আচরণ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে এরা ছোটখাটো চুরি বা ছিনতাইয়ে অংশগ্রহণ করে। দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা বা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করতেও বাধ্য হয় অনেক কিশোর-কিশোরী।

(৩) পরিবার,সমাজ ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব

পরিবার,সমাজ ও পারিপার্শিক অবস্থা যদি অপরাধ প্রবন হয়ে থাকে সেক্ষেত্রেও কিশোরগন ধীরে ধীরে অপরাধী বা অপরাধ প্রবন হয়ে উঠে।

(৪) ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব

শৃংখলার অপর নাম ধর্শীয় অনুশাসন। একটা সময় ছিল মানুষ বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল,জুমার নামাজের আগে খুতবা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারত।এখনো খুতবা নিয়ে আলোচনা হয়,তবে কেন জানি আগে মতই নয়।

(৫) প্রযুক্তির অপব্যবহার
একটা কথা আমি সব সময় বলি-প্রযুক্তি কোন দিনই খারাপ হতে পারেনা।প্রযুক্তি ভুল হাতে পড়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার হতে পারে।যেমন-এখই জিনিষ চোখে লাগালে কাজল ও কাপড়ে লাগালে কালি বা ময়লা। সরকারের নির্ধারন নিয়ম অনুসারে ১৮বছরের পূর্বে কেউ মোবাইল নম্বরের মালিক হতে পারবেনা। কিন্তু আমরা এখন সন্তানের প্রতি ভালবাসা দেখাতে গিয়ে নিজের আইডি কার্ড ব্যবহার করে অপ্রয়োজনে সন্তানকে মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছি। আমি চ্যালেন্স দিয়ে বলতে পারব-এখন ৯০শতাংশ কিশোর মোবাইলে পর্ণাসক্ত।আমি একজন চিকিৎসক হিসাবে মনে করি এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০/১২ বছর পর বর্তমান কিশোর বা আগামীর তরুণগুলো যৌন সমস্যা বা হরমোনজনিত সমস্যাই আক্রান্ত হবে।

(৬) প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা

আমাদের লোহাগাড়া প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়াতে কিশোরদের হাতে সহজে টাকা ও উন্নতমানের মোবাইল চলে আসে,কিশোর ধ্বংস ও বিপদগামী হওয়ার জন্য এটিও উল্লেখযোগ্য একটি কারন।

(৭) খেলাধুলার অভাব

আগের মত কিশোর-কিশোরীদের জন্য খেলার মাঠ বা খেলার উপযুক্ত সুযোগ না থাকাও কিশোর অপরাধের অন্যতম একটি কারন।তবে আমি খেলাধুলার নামে রাত জেগে লেখার সময়ে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগে খেলাধুলা করা সমর্থন করিনা। এই ধরনের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের শিক্ষা আগামীতে দেশ প্রেমের ক্ষেত্রে দূর্বলতাও সৃষ্টি করতে পারে।

কিশোর অপরাধ দমনে করণীয়
(১) প্রতিটি প্রাণী তার সন্তানকে খুবই ভালবাসে এটি সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত রহমত।তবে খেয়াল করতে হবে আপনার অতিরিক্ত ভালবাসা বা সন্তানকে অন্যায় কাজে প্রশ্রয় আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য কাল হচ্ছে কিনা? আপনার সন্তান কোথায় যাচ্ছে,কার সাথে মিশতেছে, সে অস্বাভাবিক কোন আয় ব্যয় করতেছেনা কিনা তা খেয়াল করতে হবে।

(২) আবারো বলছি শৃংখলার অপর নাম ধর্মীয় অনুশাসন।তাই আমাদের সন্তানদেরকে ধর্মীয় অনুশাসক শিক্ষায় উৎসাহী করে তুলতে হবে।

(৩)কোন ব্যক্তি, প্রশাসক বা অন্য কোন সংস্থার মাধ্যমে কোন কিশোর অপরাধ প্রবন কাজে ব্যবহার না হয় বা পুলিশের সোর্স হিসাবে ব্যবহার হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।

(৪) কিশোর অপরাধীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনার লক্ষ্যে তাদের কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।

পরিশেষে আমার একটি পুরাতন ফেসবুক স্ট্যাটাস প্রকাশ করে আমার লিখা ইতি টানলাম।“বর্তমান অবস্থা এমন হয়েছে আমরা নিজের গৃহপালিত হাস-মুরগী সন্ধ্যার পর ঘরে না আসলে কোথায় গিয়েছে বা কারো বাড়িতে ঢুকেছে কিনা খোজ করি,কিন্তু নিজের সন্তান রাতে বাড়ি না আসলেও সে কোথায় যায়,কি করে তার খোজ করিনা। অর্থ্যাৎ আমাদের কাছে এখন সন্তানের অবস্থা গৃহপালিত হাস-মুরগীর চেয়েও নিকৃষ্ট”।

হা,এটাই বর্তমান চিত্র। যা পরিবর্তন হওয়া অতীব জরুরী।

লেখকঃ ডাঃ মুহাম্মদ ওমর ফারুক (হোমিওপ্যাথ)
লোহাগাড়া,চট্টগ্রাম।