রিপোর্টারের ডায়েরিঃরামুতে সেনাবাহিনীর অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

তোফায়েল আহমদঃ
দুই যুগেরও বেশি দিন আগের কথা। তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ কক্সবাজার এসেছিলেন। আমি তখন সরকারি ট্রাষ্টের পত্রিকা দৈনিক বাংলায় কাজ করি। দৈনিক বাংলা যেহেতু সরকারেরই একটি মূখপত্র তাই সরকার প্রধানের খবরা-খবর অত্যধিক গুরুত্ব পেয়ে থাকে-এটাই স্বাভাবিক। আগে থেকেই জানা ছিল বিচারপতি একজন সৎ মানুষ। তবুও পত্রিকার খবরের লোভ যেন সামাল দেয়ার নয়। তাই খোঁজ-খবর নিতে থাকলাম। বিচারপতি কক্সবাজারে এসে কি কর্মসুচিতে অংশ নিবেন এবং তাঁর খাবার-দাবারের মেন্যু জানার চেষ্টা করলাম।

দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়েও বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতের শহর কক্সবাজারে সরকারের লোকজনও ঘন ঘন সফরে আসেন। অনেকেই আসেন নানা সরকারি কাজের ছুঁতো নিয়ে। উদ্দেশ্য কেবল বিনা পয়সায় যাতে পিঠ আর পেটটা চালিয়ে দেয়া যায়। সরকারি সার্কিট হাউজে থাকা আর খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটি চাট্টিখানি কথা নয়। এমন খবরও জানি-কোন এক সরকারের আমলে একজন মন্ত্রী তাঁর বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবারের ৬৬ জন সদস্য নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন। কিন্তু বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের বেলায় সম্পূর্ণ উল্টো খবর পেলাম। খবরের সোর্স অত্যধিক নির্ভরযোগ্য ছিল আমার। তিনি জেলা প্রশাসনের কর্মরত এনডিসি (নেজারত ডেপুটি কালেক্টর)।

তিনি জানালেন, বিচারপতি পরিবার নিয়ে খাবারের জন্য বাজারের যাবতীয় খরচ নিজের পকেট থেকেই দিলেন। তাও ডাল, সামান্য সামুদ্রিক মাছ আর সবজি। একজন সরকার প্রধান যেখানেই যান সেখানেই সরকারি মানুষ তিনি। তাঁর যাবতীয় খরচ সরকারই বহন করার কথা। কিন্তু ব্যতিক্রম এখানেই। বিচারপতি জানিয়ে দিলেন-‘কক্সবাজার বেড়ানোর স্থান তাই এখানে সরকারি খরচে পেট ভরানোর কাজটি ভাল কাজ নয়।’ জেলা প্রশাসনের এনডিসি একজন ম্যাজিষ্ট্রেট। তাই একজন ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট থেকে পাওয়া খবরের নির্ভরযোগ্যতা অনেক বেশি। রাতেই টেলিফোনে খবরটি পাঠালাম। পরের দিন দৈনিক বাংলায় ‘অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত’ শিরোনামেই সংবাদটি ছাপা হয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে।

গতকাল বৃহষ্পতিবারের দৈনিক কক্সবাজারের তৃতীয় পৃষ্টায় সিঙ্গেল কলামের একটি ছোট্ট খবর চোখে পড়ার পরই বিচারপতি শাহাবুদ্দিন সাহেবকে নিয়ে সংবাদ অনুসন্ধানের বিষয়টি মনে পড়ে। দৈনিক কক্সবাজারের খবরের শিরোনাম হচ্ছে-‘রামুর ব্যবসায়ি ও সাবেক ফুটবলার মমতাজুল আলমের ইন্তেকাল-জানাযা সম্পন্ন।’ একজন মানুষের মৃত্যু সংবাদ- তাও একদম সাদামাটা ভাবেই ছাপা হয়েছে। কিন্তু সংবাদটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে গিয়েই দেখলাম এখানে উল্লেখ রয়েছে এক অসাধারণ বিষয় । আবার তাও হয়তোবা ক্ষেত্র বিশেষে। আমার কাছে যেটা অসাধারণ সেটা অন্য কারও কাছে একদম তুচ্ছ ব্যাপারও হতে পারে।

কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা বললেন-রামুর পশ্চিম মেরুংলোয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন মরহুম মমতাজুল আলম। বাবুল শর্মার প্রতিবেশী এই লোকটির অকাল প্রয়াণে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত। একজন ব্যবসায়ী এবং সাবেক ফুটবলার ছিলেন মমতাজ। কোন রাজনৈতিক দলের সাথে ছিলনা তার সম্পৃত্ততা। সংবাদে পড়েছি মরহুম মমতাজুল আলমের নামাজে জানাযায় শরিক হয়েছেন রামু সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান এনডিসি, এএফডাব্লিউসি, পিএসসি, পিএইচডি সহ সেনানিবাসের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা।

মরহুম মমতাজুল আলমের কনিষ্ট কন্যা আসিফা রামু ক্যান্টনমেন্ট স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। চলতি বছরের প্রথমার্ধে সেনানিবাসের এই স্কুলটি খোলা হয়। এ অঞ্চলে মান সন্মত শিক্ষা প্রতিষ্টানের চরম অভাবের সময়ই প্রতিষ্টানটির যাত্রা-এমনিতে এলাকায় আশার আলো ছড়িয়ে দেয়। প্রতিষ্টানটির একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবকের নামাজে জানাযায় পুরো সেনানিবাসের কমকর্তারা কেবল শরিক হয়েই ক্ষান্ত হননি। খোদ সেনানিবাসের জিওসি মরহুমের ঘরেও ছুটে যান। তিনি শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের সান্তনা জানান।

index-60-620x330
মমতাজুল আলমের নামাজে জানাযায় বক্তব্য রাখছেন রামু সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান

রামুর একজন সাধা সিধে মানুষের শোকার্ত পরিবারের পার্শ্বে আকস্মিক এরকম ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এলাকার মানুষকে হতবাক করে দিয়েছে। এলাকাবাসী চোখের সামনেই দেখলেন- শোকার্ত মানুষের কাতারে এসে দাঁড়ালেন সেনাবাহিনীও।

সেই ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের বৌদ্ধ মন্দিরের ভয়াল হামলার পর একুশে পদক প্রাপ্ত প্রবীণ বৌদ্ধ ভিক্ষু সত্যপ্রিয় মহাথের রামুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন-সেনা প্রহরা সহ মন্দির পূণ নির্মাণকাজে সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর জন্য। প্রধানমন্ত্রীর তাৎক্ষনিক নির্দ্দেশে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন সেনা সদস্যরা। রামুবাসী প্রত্যক্ষ করলেন-সেই ক্ষত-বিক্ষত রামুর ঐতিহ্যে নান্দনিক ছোঁয়া লাগিয়েছে সেনাবাহিনী।

দৈনিক কক্সবাজারের রামু উপজেলা সংবাদদাতা সোয়েব সাঈদ গতকাল সন্ধ্যায় আমাকে এ প্রসঙ্গে জানান-মমতাজুল আলমের বিধবা স্ত্রী নাকি হাউমাউ করে কেঁদে বলেন-‘ ক্যান্টমেন্ট স্কুলে আমার কন্যা আসিফার আর পড়া লেখা হবে না।’ বিধবা মায়ের এমন কথায় উপস্থিত জিওসি রীতিমত বিচলিত হয়েই তৎক্ষণাৎ ঘোষণা দেন-‘শিশু শিক্ষার্থী আসিফার লেখাপড়া ক্যান্টনমেন্ট স্কুলেই অব্যাহত থাকবে। পিতার মৃত্যুর কারণে এ মেয়ের পড়াশুনার দায়িত্ব এখন থেকে সেনাবাহিনীর।’

সেনাবাহিনীর এমন কথায় সত্যিই গর্ভে বুক ভরে যায়। সেনাবাহিনীর কাজ কেবল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কথা কে বলে।
আজ দেখি ইথিওপিয়া থেকে সোমালিয়ার দারিদ্রপীড়িত, খরা এবং সন্ত্রাস কবলিত দেশগুলো থেকে শুরু করে যেখানেই দুর্যোগ সেখানেই সেনা। অনুরুপ রামুর একজন পিতৃহারা শিশু কন্যা আসিফার পিতার দায়িত্বও কাঁধে নিয়েছে সেনাবাহিনী।

আজকাল কেইবা রাখে কার খবর। কার মৃত্যুতে কেইবা ছুটেন এমনভাবে। সর্বত্রই যেন মানবতাহীন আর বিবেকহীনতা। সমাজের এমন ভয়াবহ সামাজিকতার সংকটকালে সেনাবাহিনী সত্যিই দেখিয়ে গেলেন আরেক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

লেখকঃ তোফায়েল আহমদ : কক্সবাজারে কর্মরত দৈনিক কালের কন্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসি ও এপি’র ষ্ট্রিঙ্গার।