বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে নিখোঁজ ফরাসী স্থপতির সন্ধান পেতে সীমান্তে সীমান্তে ঘুরছেন বৃদ্ধ মা

সুনীল বড়ুয়া:
স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশুনা শেষ করে প্রায় চার বছর আগে ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে বিশ্বভ্রমণের আশায় ঘর থেকে বের হন ফ্রান্সের মঁপোলিয়ে অঞ্চলের বাসিন্দা স্থপতি আর্থার অঞ্জে। প্রথমেই আর্থার যান পোল্যান্ড। এর পরে একে একে ঘুরে বেড়ান রাশিয়া, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্থান, চিনসহ ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কমপক্ষে ৩০টি দেশ।

চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন আর্থার। তিনি ঢাকা ও আশপাশে সপ্তাহ খানেক সময় কাটিয়ে চলে আসেন দক্ষিণ চট্টগ্রামে। বান্দরবান ও কক্সবাজারের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ঘুরে বেড়ান তিনি। সর্বশেষ গত ২৮ জানুয়ারি বান্দরবানের থানছি ভ্রমণের ছবি ইমেইলে মায়ের কাছে পাঠান আর্থার। এরপর থেকে আর্থারের সঙ্গে পরিবারের আর যোগাযোগ হয়নি। এভাবে দীর্ঘ সাড়ে ছয় মাস কেটে গেলেও আর্থারের কোনো ধরনের খোঁজ পাচ্ছে না তার পরিবার।

গত ৬ আগস্ট নিখোঁজ আর্থারের খোঁজে মেয়ে ক্যামিল অঞ্জে (২৮) ও ভাই দেলিগো জঁ-মিশেলকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন তার মা মিহেইল দেলিগো (৫৫)। কদিন পরেই এ দলে যোগ দেন পারিবারিক বন্ধু দেলপেশ নিন (৫০)। আর্থারকে ফিরে পাওয়ার আশায় গত শুক্রবার (১১ আগস্ট) তারা ঘুরে বেড়িয়েছেন কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং, জাদীমুরা, বন্দর এলাকা, নাইটং পাড়াসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা। এ সময় তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন কক্সবাজার জেলা পুলিশ।

কয়েক দিনের অনুসন্ধানে আর্থারকে ফিরে না পেলেও তার ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছেন বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। তাদের ধারণা, সর্বশেষ আর্থার টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারে।

নিখোঁজ আর্থারের বোন ক্যামিল অঞ্জে বলেন, আর্থার বলেছিল বাংলাদেশ থেকে মায়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড যেতে চায়। আমাদের ধারণা, সে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মায়ানমার যাওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারে। তাই আমরা টেকনাফে তার খোঁজখবর করতে এসেছি। আমরা টেকনাফের পুলিশের সাথে কথা বলেছি। টেকনাফের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছি। তারা সকলেই আর্থারকে খুঁজে পেতে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন।


আর্থারের মা মিহেইল দেলিগো বলেন, তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিল আর্থার। ওর বয়স এখন ৩০ বছর। খুব স্বাস্থ্যসচেতন ছিল সে। শরীরের ক্ষতি হয় বলে সে কখনো মদ্যপান এমনকি ধূমপানও করত না। একই কারণে কখনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করেনি সে।

তিনি বলেন, ‘প্রায় চার বছর আগে আর্থার বিশ্বভ্রমণে বের হয়। সারা দুনিয়া ঘোরার পর বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু ছয় মাস ধরে আমরা ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।’

আর্থারের পরিবারের সূত্রে জানা যায়, বিশ্বভ্রমণকালে অচেনা মানুষের খুব কাছাকাছি আসা এবং কম খরচে ভ্রমণের বিষয়টিকে সবসময় প্রাধান্য দিত আর্থার। একেবারেই বাধ্য না হলে কখনো বিমানে চড়ত না, কোন হোটেলে থাকত না। সারাদিন হেঁটে, সাইকেল চালিয়ে কিংবা একেবারে কম খরচের যানবাহনে ঘুরে বেড়াত। রাত হলে তাঁবু টানিয়ে শুয়ে পড়ত আপাত নিরাপদ কোনো স্থানে। নিজের কোনো মোবাইল বা ল্যাপটপ না থাকলেও দোকানপাট থেকে আর্থার নিয়মিতভাবে পরিবারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করত।

আর্থারের মামা দেলিগো জঁ-মিশেল বলেন, ‘আমাদের সাথে আর্থারের শেষ যোগাযোগ হয়েছিল জানুয়ারির ২৮ তারিখে। ইমেইলের মাধ্যমে সে বান্দরবানের থানছি এলাকায় তোলা একটি ছবি পাঠিয়েছিল। পরে বেশ কিছু দিন যখন যোগাযোগ হচ্ছিল না, আমরা ভেবেছি সে হয়তো বাংলাদেশ থেকে নৌপথে পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন কোনো খবরাখবর না পেয়ে প্রায় তিন মাস পর আমরা তাকে খুঁজতে শুরু করি।’

তিনি বলেন, পরিবারের অনুসন্ধানকাজে কিছু দিনের মধ্যে বন্ধু দেলপেশ নিন তাদের সাথে যোগ দেন।

জঁ-মিশেল জানান, এরকম ঘটনা অনুসন্ধানে দেলপেশ নিন বেশ অভিজ্ঞ। ইতিমধ্যে তিনি এ ধরনের সমস্যা সমাধানে ফরাসি পুলিশ এবং জনগণকে নানারকম সহযোগিতা দিয়েছেন। টেকনাফ সীমান্ত এলাকা এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেলপেশ ধারণা করছেন, স্থানীয় কিছু লোকের সহযোগিতায় আর্থার মিয়ানমারের উদ্দেশে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে থাকতে পারেন।

আর্থারের মা মিহেইল দেলিগো বাংলাদেশে চলমান অনুসন্ধান বিষয়ে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি। তারা সকলে আমাদের পর্যাপ্ত সহায়তা করেছেন। কক্সবাজার ও টেকনাফের পুলিশও আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। আমরা তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা চাই বাংলাদেশের পুলিশ আর্থারকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।’

তিনি জানান, তারা টেকনাফের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলেছেন। এলাকাবাসীও তাদের যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। ‘আমার অনুরোধ, আমার ছেলেকে খুঁজে পেতে বাংলাদেশের সবাই আমাদের সহযোগিতা করে যাবেন।’

কক্সবাজারের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. কাজী হুমায়ুন রশীদ বলেন, বান্দরবান ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় আমরা অনুসন্ধান চালিয়েছি। আর্থার অঞ্জের ইচ্ছে ছিল পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ করবেন। সবকিছু বিবেচনার পর আমাদের ধারণা, তিনি হয়তো বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাড়ি দিয়েছেন। তারপরও, আমরা তার সন্ধানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here