বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বুদ্ধনাথে

শান্তা মারিয়া:
এক নারী। তার চার স্বামী। চার স্বামীর কাছ থেকে চারটি পুত্রলাভ হয় তার। এই নারী চারপুত্রকে নিয়ে আসেন রাজার কাছে। তিনি একটি স্তূপ নির্মাণের অনুমতি চান। রাজা অনুমতি দিলে তিনি চার ছেলেকে নিয়ে স্তূপ নির্মাণ শুরু করেন। ধীরে ধীরে বিশাল আকার ধারণ করতে থাকে সেই স্তূপ। একসময় রাজার পারিষদেরা বলেন, এমন একটি স্তূপ কিনা নির্মাণ করছে এক বৃদ্ধা ও তার সন্তানেরা। এতো বড় স্তূপ নির্মাণের সব কৃতিত্ব হওয়া উচিৎ রাজার। আপনি ওদের নিষেধ করুন। এমন স্তূপ আপনার লোকেরাই নির্মাণ করুক।

রাজা বললেন, আমি ওই বৃদ্ধাকে অনুমতি দিয়েছি। তাই আমার কথা রক্ষা করার দায়িত্বও আমার। সেই বৃদ্ধা এবং তার চার সন্তান যে স্তূপ নির্মাণ করেন সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে বিশালাকৃতির বৌদ্ধ স্তূপ। উপকথা অনুসারে সেই বৃদ্ধার নাম ছিল জয়জিমা। তিনি পূর্বজন্মে ছিলেন অপ্সরা। স্তূপটির নাম হয় বুদ্ধনাথ। কাঠমান্ডুর আকাশ থেকেই দেখা যায় এই স্তূপ।

বুদ্ধনাথ স্তূপ সম্পর্কে আরেকটি মিথ আছে। সেখানে বলা হয় এক ব্যক্তির কথা। এই ব্যক্তি বাস করতো কাঠমান্ডুতে। সে ছিল খুবই রূঢ়ভাষী। সে কারও উপকার করতো না। মানুষ হিসেবেও ছিল নিকৃষ্ট। কাঠমান্ডুর বাজারে তার দোকান ছিল। কিন্তু সেই দোকানে খুব একটা বেচাকেনা হতো না। কারণ সে ছিল কটুভাষী। তাই তার দোকানে ক্রেতা সহজে যেত না। লোকটির মৃত্যু হলে তাকে নরকে নিয়ে যাওয়া হতে থাকে। সে সময় সেখানে আবির্ভূত হন স্বয়ং বুদ্ধ। তিনি তার শাস্তি বাতিল করে তাকে স্বর্গে পাঠান। সেসময় নরকের দানবরা প্রশ্ন করে- কেন ভগবান বুদ্ধ এমনটি করলেন? তিনি উত্তর দেন, এই লোক একবার বুদ্ধনাথ স্তূপ পরিক্রমণ করে। সে একটি কুকুরকে তাড়া করতে গিয়ে পুরো স্তূপ ঘুরে আসে। যে কারণেই হোক সে তো পুরো স্তূপ চক্রাকারে পরিক্রমণ করেছে। এই পূণ্যে তার পাপমোচন হয়ে গেছে।

এই পৌরাণিক কাহিনি শুনে বেশ ভালো লাগলো। কারণ আমিও তো একবার এই স্তূপ পুরো ঘুরে এসেছি। এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম বুদ্ধনাথে।

২০১৬ সালে নেপালে গিয়েছিলাম নেটজ বাংলাদেশের একটি কর্মশালায় অংশ নিতে। আমাদের টিমলিডার হাবীব মুনির ভাই বললেন বুদ্ধনাথে যাবার কথা। সেদিন আমরা কর্মশালা থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও সকাল থেকে বৃষ্টি থাকায় বের হতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। ললিতপুর, ভক্তপুর ঘুরে ফেরার পথে বুদ্ধনাথে যাবার আগেই সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছিল। দিনটি ছিল বৃষ্টিভেজা। আর সন্ধ্যাটি তো রীতিমতো ‘ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে’।

তারপরও গেলাম বুদ্ধনাথ দেখতে। কাঠমান্ডু এসে বুদ্ধনাথ দর্শন না করা অপরাধ।

চরম মেঘলা আকাশ। ভারি বর্ষণের পর একটু বিরতি নিয়েছে। কিন্তু তার মুখ থেকে আঁধার ঘোঁচেনি। টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যেই আমরা নামলাম মাইক্রো থেকে। প্রথমে একটি কফিশপে দশমিনিটের বিরতি। চমৎকার কফিশপ। বুদ্ধনাথের একেবারে ধার ঘেঁষে। শুনলাম দুই বন্ধু এই শপ চালায়। বন্ধুদের একজন নারী, অন্যজন পুরুষ। তারা মিলেমিশে দোকানটি চালাচ্ছেন। মনে হলো বাংলাদেশে নারী ও পুরুষ বন্ধু এবং ব্যবসা পার্টনার অথচ তারা প্রেমিক-প্রেমিকা নন, এমন হলে আশপাশের মানুষজনই তাদের নামে রসালো কিচ্ছা ছড়াতো।


এখানে কফির উপরে চাইলে যে কোনো নকশা এঁকে দেওয়া হয়। দোতলা দোকান। দোতলায় উঠে আমরা বেশ হাত-পা ছড়িয়ে বসলাম। কফি, বিশ্রাম, আড্ডা চললো। টিপ টিপ করে বৃষ্টি কিন্তু পড়ছেই। সেই মেঘলা সন্ধ্যায় গরম কফির পেয়ালা কি যে অপূর্ব স্বাদ এনে দিয়েছিল তা বলা যাবে না, এ শুধু অনুভবের বিষয়।

কফির স্পর্শে তাজা হয়ে আমরা এবার গেলাম বুদ্ধনাথ দর্শনে। দূর থেকেই চোখে পড়ে বুদ্ধনাথ স্তূপের চূড়া। এই স্তূপ মূলত তিব্বতী বৌদ্ধদের তীর্থস্থান। অবশ্য সব পন্থী বৌদ্ধরাই এই স্তূপ দর্শনে পূণ্যলাভ করেন। তিব্বতী রীতিতে এখানে ছোট ছোট নিশান টাঙানো রয়েছে। স্তূপটি বৃত্তাকার। বৃত্ত ঘুরে আসতে হয়। পুরো বৃত্ত সীমানা প্রাচীরের ভিতরে। সীমানা প্রাচীরজুড়ে রয়েছে বিশাল বিশাল জপযন্ত্র বা প্রেয়ার হুইল। সেগুলোতে লেখা রয়েছে তিব্বতী মহামন্ত্র ‘ওম মণি পদ্মে হুম’। পিতল বা তামার তৈরি এসব প্রেয়ার হুইল যখন ঘুরতে থাকে তখন একটা অদ্ভুত গুঞ্জন ধ্বনি শোনা যায়। সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় আমি প্রেয়ার হুইল ঘুরাতে ঘুরাতে পুরো স্তূপটি বৃত্তাকারে ঘুরে এসেছিলাম। আমার সঙ্গে দলের আরও অনেকে ছিলেন। রুহি, সুবর্ণা, শামসুন নাহার আপা। বলতে গেলে পুণ্য হয়েছে সকলেরই। বলা যায় না ধর্মে আস্থাহীন এবং বিপ্লবী চিন্তাধারার অনীক আসাদ ভাইও হয়তো এই পুণ্যবলে নির্বাণ লাভ করতে পারেন।

বুদ্ধনাথের ইতিহাস একটু বলি। নেপালের লিচ্ছবি রাজা শিবদেবের (৫৯০-৬০৪ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্বকালে এই স্তূপ নির্মাণ করা হয়। অবশ্য কোন কোন ইতিহাসবিদের মতে রাজা মা-বের (৪৬৪-৫০৫ খ্রিস্টাব্দ) রাজত্বকালে এই স্তূপ নির্মিত হয়। আবার তিব্বতী সূত্র মতে রাজা আশুভার্মার (৬০৫-৬২১ খ্রিস্টাব্দ) দেহাবশেষ এই স্তূপে পাওয়া গেছে। এই স্তূপ তিব্বতী পরিব্রাজক, তীর্থভ্রমণকারী ও তিব্বতী ব্যবসায়ীরা নির্মাণ করেন বলেও দাবি করা হয়। কারণ যে স্থানে এই স্তূপটি অবস্থিত সেখানে একসময় তিব্বতী ব্যবসায়ী ও তীর্থযাত্রীরা বাজার বসিয়ে ছিলেন। এখানে তিব্বতী পণ্যসামগ্রী বিক্রি হতো। তিব্বত থেকে নেপাল আসার যে বাণিজ্যপথ সেটি এই স্থানসংলগ্ন।

দুই জনের মাঝে লেখিকা

আমার কাছে অবশ্য মনে হয় এটা তিব্বতীদের তৈরি এই দাবি সঠিক। কারণ কিংবদন্তিতে যে নারীর কথা বলা হচ্ছে তার স্বামী চারজন বলে উল্লেখ করা হয়। আর তিব্বতে প্রাচীনকাল থেকে নারীর বহুবিবাহ এখনও কিছু কিছু অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে। আমি ইতিহাসবিদ নই, তাই এসব মতামত দেওয়ার অধিকার নেই সেকথাও ঠিক।

আমি শুধু বলতে পারি সেদিন সন্ধ্যায় কি দারুণ এক অনুভূতি হয়েছিল এই স্তূপে গিয়ে। বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে স্তূপটি যেন দাঁড়িয়ে ছিল মহাকালের রহস্য বুকে নিয়ে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here