প্রবাসের চিঠি: মনে পড়ে ক্ষুদে সন্ন্যাসীর কথা

জাহাঙ্গীর কবীর বাপপি, আবুধাবি থেকে:
ছবির ক্ষুদে সন্ন্যাসী আমার ফ্যামিলি-ট্রি’র কনিষ্ঠতম সদস্য ওহী। জুবায়ের ওহী। ছোট ভাইয়ের ছেলে।

হাসি-খুশি প্রাণস্পন্দনে ভরপুর একটা দেবশিশু ওহী। তার সাথে আমার যে একটা বিশেষ রসায়ন কাজ করে তা ও কাছে থাকলে বিলক্ষণ টের পাই। আর সেও দেশে গেলে সারাক্ষণ পায়ে পায়ে থাকবে, একটু চোখের আড়াল হলেই খোঁজাখুঁজি শুরু করবে।

খাওয়া দাওয়া, খেলাধুলা, ছাদে যাওয়া সব কিছুতে ওর সাথে থাকা চাই। প্রতিবার আমাকে সে যখন প্রথম দেখে ওর চোখে মুখে হাজারটা বাতি ফ্লাডলাইটের মতো জ্বলে ওঠে। ফেরার সময় হয়ে এলে স্ত্রী-সন্তানদের বাইরে বাবা আর এই ক্ষুদে মানুষটাকে সে কথা কীভাবে বলি তা ভেবে ব্যাকুল হয়ে ওঠে মন। আমাকে পাওয়ার পর যতটা আনন্দে ওরা ঝলসে ওঠে, ফেরার সংবাদে ঠিক ততোটাই যেন বেদনায় আর্তনাদ করে ওঠে। তাতে আমার হৃদয়েও কম রক্তক্ষরণ হয় না।

সম্পর্কে আমি ওর জ্যাঠা। কিন্তু গোড়ার দিকে এই ‘জ্যাঠা’ সম্বোধনটায় আমার ছিলো যত অনীহা। কেন, জ্যাঠা ডাকতে হবে কেন, চাচা ডাকলে হয় না! না হয় না। ওরা হতে দেবে না তা। বোনদের দল, বৌ, মুন্না কেউ তা হতে দেবে না। ওহীকে শিখিয়ে দেবে যেন আমায় জ্যাঠা ডাকে- জ্যাঠা, জ্যাঠা, জ্যাঠা…হাহ্! যেটা বাস্তব সেটা মেনে নিতে আমার আপত্তি কেন? স্রোতের তোড়ে বালির বাঁধের মতো ভেঙ্গে একাকার হয়ে গেল আমার অনীহা দেখানোর অধিকার।

কিন্তু যখন সময় এলো, দেখুন কি নিয়তি, ওহীর প্রথম দিককার ‘জিতু’ পরে ‘জেঠু’ ডাকটাকেই মধুরতমো সম্বোধন মনে হতে লাগলো। তো আমার জেঠুটি ভিক্ষু বা বৌদ্ধ শ্রমণের বেশ নিলো কেন? ছোট মানুষ কৌতূহল ভরে নিতেই পারে। কিন্তু না, বিষয় এটা নয়। স্কুলে ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি হল নিরঞ্জন চাকমা। আমাদের রাঙামাটিতে সবচেয়ে বড় নৃ-গোষ্ঠী হচ্ছে চাকমা। আমাদের পাড়া প্রতিবেশীদের বেশিরভাগই চাকমা।

রাঙ্গামাটির ধুলো-মাটি-কাদায় আমাদের বেড়ে ওঠা। জানালার ধারে বৃষ্টির ছাট খেতে খেতে, ফুরোমন পাহাড় ঘেঁষে মেঘবলাকার ধেয়ে চলা দেখতে দেখতে কবিতার খাতা টেনে নেয়া, আনাজ ভর্তি থুরুং বা ঝুড়ি মাথায় করে কিংবা শনের আঁটি বয়ে উঁচু নিচু পাহাড়ি পথ বেয়ে হেঁটে চলা জুম্ম-মিলা বা পাহাড়ি মেয়ের নিরন্তর জীবন সংগ্রামের দৃশ্যে প্রাণিত হওয়া, সাঁঝবেলায় মসজিদের আজান শেষ হতেই হিন্দু বাড়ি থেকে আসা শঙ্খ ধ্বনি কিংবা মোনঘরের বৌদ্ধ মন্দির হতে ভেসে আসা ‘বুদ্ধং শরনং গচ্চামি’কে মনের অজান্তে ভালোবেসে ফেলার সেই আমিই তো এই আমি।

সহিষ্ণুতা ও অসাম্প্রদায়িকতাকে নিজের পরিচয় ভাবতে পেরেছি আমি। অথচ সেই পাহাড়ে আজো কেন সন্দেহ অবিশ্বাসের বিষবাষ্প? বিষয়টা এতো দূর থেকেও আমাকে ভাবায়, আহত করে। কিছু কুৎসিত রাজনীতির কূটচালের বলি সবখানে, সবদেশে আমজনতা। পাহাড়ে শান্তি এলে কারো কারো রুটি হালুয়ার ভাগাভাগিতে টান পড়বে, তাই ছলে-বলে-কৌশলে সংকটকে জিইয়ে রাখতে হবেই! সেলুকাস, কি বিচিত্র এ ধরার মানুষ!

যা বলছিলাম, আমার জেঠু বৌদ্ধভিক্ষুর বেশ নিলো যে কারণে তা হল ওর প্রিয়বন্ধু নিরঞ্জন চাকমা সেই একই বেশ নিয়েছে তাই। রোগ, জরা, বিপদাপদ থেকে মুক্তি পেলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমা বন্ধুদের অনেককেই দেখতাম বিভিন্ন সময়ের জন্য গেরুয়া বসন ধারণ করে সন্ন্যাসব্রত পালন করতে। তাই শিশু নিরঞ্জনের এই বেশ ধারণ আর আত্মার বান্ধব বলে ওহীরও তাকে অনুসরণ করা।

আমরা যেন কখনোই, নিরঞ্জন আর ওহীদের নিষ্পাপ কোমল পবিত্র মনের মধ্যে কোন গরল ঢেলে না দিই। গেল সোমবার ছিল আমার জেঠুর জন্মদিন। ওর জন্য বন্ধুরা সবাই দোয়া করবেন।

 

লেখক: প্রবাসী বাংলাদেশি

সৌজন্যে: বিডিনিউজ।