অটিস্টিকদের বিকাশের সুযোগ দিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

শনিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে  নবম ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, “এদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা আছে। সেটাই বিকশিত করে দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে, যেন মেধা বিকাশের মাধ্যমে তারাও সমাজকে কিছু উপহার দিতে পারে।”

অটিজমে আক্রান্ত হিসেবে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন, চার্লস ডারউইন, আইজ্যাক নিউটনের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, অটিস্টিক শিশুরা যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

“তারাও মানুষ।তারাও আমাদের সমাজের অংশ, তাদের জন্যও আমাদের কাজ করতে হবে। একটা দেশকে উন্নত করতে হলে সকলকে নিয়ে করতে হবে, কাউকে অবহেলা করে না।”

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কারণে দেশে অটিজম সচেতনতা বেড়েছে।

“আমাদের দেশে আগে অটিজম নিয়ে কোনো সচেতনতাই ছিল না। কোনো সন্তান অটিস্টিক থাকলে বাবা-মা সেটা লুকাতেন। সমাজের কাছে বলতে পারতেন না। মাত্র কিছু দিন থেকে এ সচেতনতার ব্যাপারটা সামনে চলে এসেছে।”

প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারায় আনতে সরকার ‘কাজ করে যাচ্ছে’ মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধুকন্যা তাদের জন্য ‘সুন্দর পরিবেশ’ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন।

অটিজম আক্রান্তদের স্বার্থ ও অধিকার সুরক্ষায় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টি বোর্ড গঠন ও সেখানে তিন হাজার একশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

প্রতিবন্ধীদের প্রতিপালনে রাষ্ট্রের কর্তব্যের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, “সেটা আমরা করব।”

সরকার পরিবর্তন হলেও সেবামূলক এই কার্যক্রম যেন অব্যাহত থাকে সেজন্য ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

“আমার সব সময় মনে হয়, আজকে বাবা-মা যতদিন আছে ততদিন হয়ত ওদের দেখবে। কিন্তু তারপরে কে দেখবে? এমন কিছু করে দিয়ে যেতে চাই, যেন এরা সমাজে আর অবহেলিত না থাকে।”

বেসরকারি খাতের উন্নয়নে সরকার সহযোগিতা দিচ্ছে উল্লেখ করে ‘প্রতিবন্ধীদের সহায়তা’য় এ খাতসংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ঢাকার মিরপুরে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ক্যাম্পাসে অটিজম রিসোর্স সেন্টার ও একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান।

প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারায় আনতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাডেমি ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার স্থাপনের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান শেখ হাসিনা।

“এখানে অটিস্টিকসহ প্রতিবন্ধী মানুষদের এক সাথে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।”

প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের আমলে প্রতিবন্ধীদের জন্য নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।

“ঢাকা সেনানিবাসে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘প্রয়াস’ নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় এর শাখা করার কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রতিটি সেনানিবাসে শাখা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

“দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল বই দেওয়া হয়েছে, এছাড়া পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ৩০ মিনিট দেয়া হয়েছে”, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলা একাডেমি ব্রেইল প্রকাশনার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

অটিজমে আক্রান্তদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনামূল্যে থেরাপিউটিক, কাউন্সেলিং ও অন্যান্য সেবা এবং সহায়ক উপকরণ দেয়া হয়েছে বলেও জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি।

“দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩৯টি উপজেলায় মোট ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করা হয়েছে। এই সকল কেন্দ্রে অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে যা থেকে প্রায় ২৪ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সেবা গ্রহণ করেছেন।

“ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ ১৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাপন করে অটিজম ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল সমস্যাজনিত শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।”

পর্যায়ক্রমে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে অটিজম আক্রান্তদের শনাক্ত করে তাদের কাউন্সিলিং ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।

অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর পেডিয়াট্রিক নিউরো-ডিজঅর্ডার এন্ড অটিজম’ এর  মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তারদের  প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইসিডিডিআরবি’র মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের প্রাথমিক পরিচর্যাকারী হিসেবে মায়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

“এছাড়া অটিজম ও স্নায়ু-বিকাশজনিত সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার জন্য বিশেষজ্ঞ গ্রুপের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের উপযোগী করে স্ক্রিনিং টুলস প্রণয়ন কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”

প্রধানমন্ত্রী ‘বিশেষ সফটওয়্যার’ তৈরি করে অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার উপরও গুরুত্বারোপ করেন।

অটিজমের বিরুদ্ধে নিজের মেয়ের জোরাল ভূমিকার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিসিয়েটিভ ইন বাংলাদেশ এর জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা হোসেনের প্রচেষ্টায় দেশ ও বিদেশে অটিজমের গুরুত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

“তার উদ্যোগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অটিজম আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারের জন্য আর্থ-সামাজিক সহায়তা শীর্ষক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। আমেরিকায় যখন সে কাজ করত, তখন আমি তার কর্মক্ষেত্রে গিয়েছি। কীভাবে তারা কাজ করে তা দেখতে,” বলেন প্রধানমন্ত্রী।

অটিস্টিক শিশুদের আঁকা ছবি দিয়ে ২০০৯ সাল থেকে ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দিবসের কার্ড’ তৈরি হয় বলেও জানান তিনি।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব চৌধুরী মো. বাবুল হাসানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহম্মদ নাসিম, সমাজকল্যাণ মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হোসেন।

স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসরীন আরা সুরাত আমিন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সঙ্গে কিছু সময় কাটান। এরপর তিনি প্রতিবন্ধীদের পরিবেশিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখেন।

বিডিনিউজ