সর্বশেষ সংবাদঃ

চকরিয়া-মহেশখালীতে লবণের বাম্পার উৎপাদন তবুও ভাগ্য ফেরে না চাষিদের

আমাদের রামু প্রতিবেদক:
কক্সবাজারের উপকূলীয় লবণ মাঠেসহ মহেশখালী-চকরিয়া লবণের দাম বাড়ছে। বাড়ছে উৎপাদন। কিন্তু বাড়ছে না চাষিদের ঘামের দাম। জমিদার থেকে দালাল, দালাল থেকে মিল মালিক। এভাবে ঘাটে ঘাটে কমিশনের পর শেষ পর্যন্ত লবণ চাষিদের হাতে গিয়ে যে দাম জমা পড়ে তা দিয়ে উৎপাদন খরচ কোনো মতে তোলা যায়। লাভের আশা যেন দুরাশা গতর খাটা চাষিদের। অথচ দেশের চাহিদার সব লবণ উৎপাদন করেন কক্সবাজার উপকূলের ভাগ্যবঞ্চিত অর্ধ লক্ষাধিক চাষি।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, চকরিয়ায় যে স্টাইলে লবণ উৎপাদন হচ্ছে টিক একইভাবে মহেশখালীতে স্থল পথে প্রবেশদ্ধার কালারমারছড়া নতুন চালিয়াতলী ও চাফকাটা ঘোনার লবণ মাঠে চাষিরা মাথার ঘাম পায়ে পেলে উৎপাদন করছেন সাদাসোনা খ্যাত লবণ। মাঠ পর্যায়ে লবণের ন্যায মূল্য দাবি চাষীদের। অপরদিকে উপকূলীয় এলাকার সমগ্র উপজেলাতে লবণ উৎপাদনে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করতে দেখা গেছে চাষিদের।

লবণ চাষিদের দাবি- সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে লবণ কিনে নায্যমূল্য নিশ্চিত করা হোক। তবে তা যেন লবণ বোর্ড গঠন করে করা হয়। চাষিদের অভিযোগ- লবণের দর নিয়ন্ত্রণ মিল মালিকদের হাতে থাকার কারণে চাষিরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। দেশের চাহিদার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন করেও চাষিরা তাদের নায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

লবণ ব্যবসায়ীরা জানান, দেশীয় লবণশিল্পকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিক চিহ্নিত সিন্ডিকেটের কবলমুক্ত করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন প্রান্তিক লবণ চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, সরকারকে বারবার ভুল বুঝিয়ে লবণ আমদানির চক্রান্ত করে। তাদের কারণে দেশের উৎপাদিত লবণ মাঠে মার খায়। অবমূল্যায়ন হয় লবণচাষিদের মাথার ঘাম। লবণশিল্প যাতে সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে না যায় সে বিষয়ে বিসিক ও সরকারকে আরো সতর্ক হতে হবে।

লবণ মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের দাবি- দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হয়। এরপরও বেশি মুনাফার আশায় আমদানির চক্রান্ত করে চিহ্নিত সিন্ডিকেট। তাদের সুযোগ দিলে চলবে না। ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন- একটি পরিবারে কী পরিমাণ লবণ প্রয়োজন? চাহিদার সাথে উৎপাদনের সমতা থাকলে কোন যুক্তিতে লবণ আমদানি করবে? তারা বলেন, সিন্ডিকেটকে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করা হোক। উৎপাদন মওসুমে লবণ আমদানি চাই না। দেশীয় লবণশিল্প বাঁচাতে সরকারের একটি সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। এ বিষয়ে বিসিককে আন্তরিক হতে হবে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কক্সবাজারের উপ মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন আমাদের রামু ডটকমকে জানান, দেশের চাহিদার সব লবণ উৎপাদন হয় কক্সবাজারের সাত উপজেলা এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ লাখ মেট্রিক টন।

বিসিক জানায়, চলতি মওসুমে উপকূলের ৬৪ হাজার ১২৫ একর জমি লবণ উৎপাদনের আওতায় এসেছে। ইতোমধ্যে নভেম্বর থেকে গত ৩ মার্চ পর্যন্ত মাঠে লবণ উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৮২ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। আবহাওয়া লবণচাষ উপযোগী হওয়ায় এবং শীত ও কুয়াশা কম থাকার কারণে এ বছর লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

দেশে এ বছর লবণের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ লাখ মে. টন। এ বছর দেশে ৪৩ হাজার ১০২ জন চাষি ৬৪ হাজার ১৪৭ একর জমিতে লবণ চাষের জন্য মাঠে নেমেছেন। গেল দুই বছরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও এ বছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছেন বিসিকের কর্মকর্তারা। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে দেশের চাহিদা ১৬ লাখ ৫৮ হাজার মে.টন হলেও উৎপাদন হয় ১৫ লাখ ৫৫ হাজার মে.টন। পাশাপাশি ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে চাহিদা ছিল ১৬ লাখ ৫৮ হাজার মে. টন। কিন্তু উৎপাদন হয় ১২ লাখ ৮২ হাজার মে.টন। ফলে গেল দুই বছরে চাহিদা পূরণ না হওয়ার পেছনে খারাপ আবহাওয়া, লবণের দাম কম হওয়াকে দায়ী করছেন লবণসংশ্লিষ্টরা।

এদিকে লবণের বাম্পার উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলে এবং বর্তমান দাম স্থির থাকা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন চাষিরা। মওসুমের শুরুতে লবণের দাম মণপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ছিল। বর্তমানে লবণ উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে মওসুমের মাঝামাঝি এসে দাম খানিকটা কমে ২৫০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে। তবে খুচরা মণপ্রতি ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মহেশখালীর কালারমারছড়ার প্রান্তিক চাষি সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, দাম ভালো হলেও জমির দাম, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে কোনোমতে পোষাতে হচ্ছে। তবে দাম না কমলে শেষ পর্যন্ত চাষিরাই লাভবান হবেন।

এদিকে সভায় লবণশিল্প সংশ্লিষ্টরা দাবি তোলেন, লবণ উপদেষ্টা পরিষদ দরকার নাই। লবণশিল্প বাঁচাতে সর্বশ্রেণীর লোকজন নিয়ে ‘লবণ বোর্ড’ গঠন করা হোক। আর লবণ বোর্ডের হেডকোয়ার্টার করতে হবে কক্সবাজারে। না হলে লবণের উৎপাদন বাড়লেও চাষিদের দুঃখ থামবে না। বেশির ভাগ চাষিরা পরের জমি চাষ করার কারণে তারা জিম্মি জমিদার, দালাল, দাদন,সুদিমহাজনের কাছে। লবণের দাম থাকার সুফল পাচ্ছে অভিজাত শ্রেণী। বিশেষ করে লবণের বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করেন মিল মালিকেরা।

ফলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দরিদ্র চাষিরা লবণের বাম্পার উৎপাদন করলে ও লাভের টাকা চলে যায় জমিদার, দাদন ব্যবসায়ী, দালাল ও মিল মালিকদের হাতে। দাম কমার কারণে মিল মালিকেরা মওজুদ করার কারণে অনেক সময় দেশে লবণের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয় বলে চাষিদের অভিযোগ।

মহেশখালী-কুতুবদিয়ার এমপি আশেক উল্লাহ রফিক আমাদের রামু ডটকমকে বলেন, অতিরিক্ত মুনাফা বন্ধে সরকারকে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি তুলে বলেন, প্রান্তিক চাষি থেকে কম দামে লবণ কিনে অধিক দামে বিক্রি করার মানসিকতা থেকে লবণের সমস্যা। সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। ভাতের বিকল্প আলু খাওয়া যায়। কিন্তু লবণের বিকল্প নেই। লবণ নিয়ে ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে। প্রান্তিক চাষিদের পরিশ্রমের মূল্য দিতে হবে।

কক্সবাজারের ও বাঁশখালীর ৪৩ হাজার চাষির দাবি- লবণ শিল্পকে স্থায়ী রূপ দিতে যেন লবণ বোর্ড গঠন করা হয়। লবণের দর নিয়ন্ত্রণের জন্য মিল মালিকদের বাদ দিয়ে সরকার যেন নির্ধারণ করে দেয়। পাশাপাশি প্রান্তিক চাষিদের যেন সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হয়।

মন্তব্য করুন

(বিঃ দ্রঃ আপনার ইমেইল গোপন রাখা হবে) Required fields are marked *

*

Shares