সর্বশেষ সংবাদঃ

পার্বত্য এলাকায় স্কুল শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক হাতিয়ার!

সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে তিন পার্বত্য জেলায় আঞ্চলিক ছাত্র সংগঠনগুলোর বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব জেলায় স্কুল চলাকালীন সময়েই ইউনিফর্মসহ শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া এখন যেন রীতি হয়ে গেছে। রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।

কখনও বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনের ওপরে চাপ সৃষ্টি করে, আবার কখনও পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের ভয় ভীতি বা চোখ রাঙানি দেখিয়ে ইউনিফর্মসহ নিজেদের কর্মসূচিতে টেনে নিয়ে যাচ্ছে আঞ্চলিক ছাত্র সংগঠনগুলো। তাদের চাপের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানরা নিরূপায় হয়েই বেশিরভাগ সময় বিষয়টি না দেখার ভান করেন, বা এড়িয়ে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাঙামাটিতে জনসংহতি সমিতি সমর্থিত সহযোগী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, ইউপিডিএফ সমর্থিত সহযোগী ছাত্র সংগঠন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, বাঙালি ছাত্র পরিষদ, সমঅধিকার আন্দোলনের ছাত্র সংগঠন সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কিছু সংগঠন যেকোনও সময় শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি পালন করছে। বিদ্যালয়ে ক্লাস বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদেরও এসব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অনেকটা চাপের কারণে যেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগী কিছু শিক্ষার্থী।

ভোকেশনাল স্কুলের নবম শ্রেণির ডাইং ও ড্রেস মেকিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানায়, ‘কোনও সভা-সমাবেশ থাকলে এলাকার জনসংহতি সমিতির ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) বড় ভাইয়া আমাদের যেতে বলে এবং সকল পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীদের যেতে হয়। না গেলে পরে সমস্যা হয়।’

ভোকেশনাল বিদ্যালয়ের সুপারিন্টেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. রেজাউল করিম জানান, যেদিন সংগঠনগুলোর কোনও অনুষ্ঠান থাকে তখন শিক্ষার্থীরা আর বিদ্যালয়ে আসে না। কিন্তু বাসা থেকে তারা বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম পরে বের হয়। বিষয়টি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।

একই অবস্থা রাঙামাটির কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র- টিটিসি’র। টিটিসির এসএসসির ভোকেশনালের ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ফেব্রিক্স ও অটো মোবাইল বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পিসিপির কমিটির আছে এবং প্রায়ই বড় ভাইয়েরা এখানে আসেন। যদি কোনও সভা-সমাবেশ থাকে তাহলে তার আগের দিন কমিটির মাধ্যমে সবাইকে জানিয়ে দেন। তখন আমরা যাই। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিষয়টি জানেন না।’

তারা আরও বলেন,‘আমরা অনেক সময় অনুমতি নিয়ে যাই। অনুমতি বড় ভাইয়েরা নেন।’

রাঙামাটির কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) অধ্যক্ষ মো. সালাউদ্দিন শেখ বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ অনুমতি নেয় না। আর আমাদের মূল ফটক সকাল ৮টায় বন্ধ করে দেওয়া হয় যা দুপুর ২টায় খোলা হয়। এর মধ্যে মূল ফটক দিয়ে কেউ বের হতে পারবে না কারণ সিসিটিভি ফুটেজে তা দেখা যাবে। তাদের যদি কোনও অনুষ্ঠান থাকে সেদিন তারা প্রতিষ্ঠানেই আসে না।’

তিনি বলেন, বিষয়টি আগের জেলা প্রশাসক জানতেন। এখন যেহেতু নতুন জেলা প্রশাসক এসেছেন বিষয়টি তাকে গুরুত্ব সহকারে জানানো হবে।

কেন্দ্রীয় জনসংহতি সমিতির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ‘বিষয়টি আমিও খেয়াল করেছি। তবে সব সময় না মাঝে মধ্যে আনা হয়। আমিও ব্যক্তিগতভাবে চাই না, স্কুল চলাকালীন কোনও শিক্ষার্থী সমাবেশে আসুক। এরপর থেকে বিষয়টি মাথায় থাকবে।’

75e3c15eda2fc97958d2c267595d65e8-5811a37aac1dd-copy

পিসিপির রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রিন্টু চাকমা বলেন, ‘যেহেতু আমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ে ও কলেজে একটি করে কমিটি আছে আর আমরা ছাত্র রাজনীতি করি তাই সব গণতান্ত্রিক সমাবেশে ছাত্ররা আসবে এটাই স্বাভাবিক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কাউকে জোর করে নিয়ে আসি না। সবাই যদি সক্রিয়ভাবে আসে সে ক্ষেত্রেতো আমাদের কিছু বলার নেই।’

বাঙালি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ছাত্র সংগঠন ছাত্রদের নিয়ে রাজনীতি করবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোনও অনুষ্ঠান করলে, সাধারণত তা বিদ্যালয়ের সময়সূচির পরে করি।’

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)র রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি অনিল চাকমা বলেন, ‘বিষয়টি নির্ভর করে দাবির ওপর। ছাত্র সমাজের দাবি নিয়েইতো ছাত্রদের আন্দোলন করতে হবে। আর ইউনিফর্ম না থাকলে কীভাবে বোঝা যাবে এরা কোন স্কুলের ছাত্র আর কাদের অনুষ্ঠান? ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে যেসব আন্দোলন হয়েছিল সবক্ষেত্রেই ছাত্রদের তো ভূমিকা দেখতে পাই।’

রাঙামাটি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ চাকমা বলেন, ‘স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না করতে সরকারের নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যেভাবে শিক্ষার্থীদের ক্লাস চলাকালীন সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়ে আসছে তা সমীচীন নয়। স্কুল কর্তৃপক্ষকে ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের এসব মিছিল মিটিং আসতে বাধ্য করা হয়।’

এ বিষয়ে প্রশাসনকে এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম তালুকদার বলেন, ‘এই বিষয়টি আসলে দৃষ্টিকটু। ক্লাস বাদ দিয়ে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে আনা রাজনৈতিক সভ্যতার মধ্যে পড়ে না। দলীয়ভাবে তাদের বিষয়টি চিন্তা করা দরকার।’

রাঙামাটি জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিশু দে বলেন, ‘ছাত্রদের অধিকার আন্দোলনে ছাত্রদের উপস্থিতি ও ভূমিকা অবশ্যই থাকবে কিন্তু সেটা অবশ্যই ক্লাস চলাকালীন সময়ে না।’

রাঙামাটির মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হারুন-অর রশীদ সরকার বলেন, ‘আমরা বিষয়টি দেখবো। আর জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে বিষয়টি অবহিত করা হবে।’

রাঙামাটি জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী এম জাকির হোসেন বলেন, ‘ছেলেরা রাজনীতি করবে এতে আমাদের বাধা দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু আমরা চাইবো স্কুল চলাকালীন সময়ে যেন শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে নেওয়া না হয়।’

মন্তব্য করুন

(বিঃ দ্রঃ আপনার ইমেইল গোপন রাখা হবে) Required fields are marked *

*

Shares