সর্বশেষ সংবাদঃ

দিন দিন বাড়ছে দর্শনার্থীদের ভীড়: রামুতে সম্রাট অশোকের ঐতিহাসিক রাংকূট বৌদ্ধ বিহার

সুনীল বড়ুয়া:
ছায়া সুনিবিড় সবুজ অরণ্যে ঘেরা পাহাড়। নীচে বিশালাকৃতির শতবর্ষী বটবৃক্ষের পা ঘেষে থরে থরে সাজানো সিঁড়িগুলো উঠে গেছে পাহাড় চূড়ায়। উপরে ওঠেই দেখা যায়, ছোট বড় পাশাপাশি চারটি বৌদ্ধ মন্দির। যার একটি হচ্ছে মহাকারুণিক গৌতম বুদ্ধের (বুড়া গোঁয়াই) মূর্তি। এ মূর্তি দর্শনেই ধর্মপ্রান মানুষের মন ভরে ওঠে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর পবিত্রতায়। এ চিত্র কক্সবাজারের রামু উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নের রাংকূট (রামকোট) বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুর বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার হামলার শিকার হলেও বিহারটি সেই সাম্প্রদায়িক হামলা থেকে রক্ষা পায়। তাই প্রাচীন ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ বিহারটি এখনো স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে এ বিহারটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে মহা পবিত্র তীর্থস্থান । পাশাপাশি দর্শনীয় স্থান হিসাবে পর্যটকদের কাছেও পরিচিতি বাড়ছে।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে সম্রাট অশোক দি গ্রেট এ বিহারট নির্মাণ করেন। এ প্রসঙ্গে ‘ধন্যবতী রাজবংশ’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে গৌতম বুদ্ধ ধন্যবতীর রাজা চাঁদসুরিয়ার সময়ে সেবক আনন্দকে নিয়ে আরাকানের রাজধানী ধন্যবতী আসেন। সেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গৌতম বুদ্ধ, সেবক আনন্দকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘হে আনন্দ, ভবিষ্যতে পশ্চিম সমুদ্রের পূর্বপাশে পাহাড়ের উপর আমার বক্ষাস্থি স্থাপিত হবে। তখন এর নাম হবে রাংউ’। ‘রাং’ অর্থ বক্ষ, আর ‘উ’ অর্থ অস্থি অর্থাৎ ‘রাংউ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘বক্ষাস্থি’ ধারণা করা হচ্ছে ভাষাতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় রাংউ থেকে রামু শব্দটি এসেছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস বর্তমানে রামুর রামকোট বৌদ্ধ বিহারেই মহাকারণিক গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি স্থাপিত হয়েছে। সে কারণে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অতি পবিত্র তীর্থস্থান ।

ashoka-copy‘রামকোটের ইতিহাস’ শিরোনামের একটি বাঁধাই করা লিফলেট থেকে জানা গেছে, খৃষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দে সংঘটিত ইতিহাসের বিভীষিকায় কলিঙ্গ যুদ্ধের সময় মানবতার ধবংস এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে সম্রাট অশোকের মনে দারুণ রেখাপাত করে। মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করার জন্য এই সময় তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করেন। পরবর্তীতে বৌদ্ধধর্মের প্রচার এবং শ্রীবৃদ্ধিকল্পে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে চুরাশি হাজার ধর্ম স্কন্ধ (মন্দির) নির্মাণ করেন। ধারণা করা হয়, রামুর রামকোট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার এর মধ্যে একটি। এ বিহারের প্রতিষ্ঠাকাল ২৬৮ খৃষ্টপূর্ব। বিহারের প্রধান ফটকের উপরেও এ সাল লিখা আছে।

এ লিফলেটে আরও উল্লেখ আছে, ‘বিহারটি নির্মানের পরবর্তী সময়ে সেখানে সাতশত বৌদ্ধ ভিক্ষু বসবাস করতেন। প্রাচীন চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর ভ্রমন কাহিনীতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৬৬৬ সালে মোঘলদের আক্রমনের শিকার হয়ে সম্পূর্ন ভাবে ধংস হয়ে যায় ঐতিহাসিক রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার। ওই সময় বিহারটি ধংস স্তুপ ও বন জংগলে পরিণত হয়। মোঘল আক্রমনের প্রায় ২৬৩ বছর পর ১৯২৯ সালে আবার নতুন করে বিহারটি আবিস্কৃত হয়’।

দক্ষিণ চট্টলার বৌদ্ধদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু, একুশে পদকপ্রাপ্ত, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের জানান, ১৯২৯ সালের দিকে বিহারের ধবংসাবশেষ দেখে তৎকালীন জগৎ চন্দ্র মহাস্থবির নামের এক বৌদ্ধ ধর্ম সংস্কারক এটি পূণঃ প্রতিষ্টায় এগিয়ে আসেন। ওই সময় রাংকূটের পাহাড়ের পাদদেশে মন্দিরের ধবংসাবশেষ এবং প্রাচীন বুদ্ধমূর্তির অসংখ্য খন্ড খন্ড টুকরো পাওয়া যায় । স্থানীয় জমিদার মতিসিং মহাজনের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে জগৎচন্দ্র মন্দিরটি পূণঃ নির্মাণ করেন। সেই থেকে আবার রাংকূট বৌদ্ধ বিহারে ব্যুহচক্র মেলা (প্যাঁচঘর), চুরাশি হাজার ধর্ম স্কন্ধ পূজাসহ নানান উৎসব উদযাপন করা হচ্ছে।

তিনি আরো জানান ,জগৎ চন্দ্র মহাস্থবিরের অনুপ্রেরণায় বাংলা নববর্ষের বৈশাখ মাসের প্রথম দিকে সাতদিন ব্যাপী ব্যুহচক্র মেলার (প্যাচঘর) আয়োজন করা হত। যা পরবর্তীতে রামকোটের মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে।

রাংকূট (রামকোট) বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির পরিচালক জ্যোতিসেন থের জানান , ১৯৬৬ সালে প্রজ্ঞাজ্যেতি মহাথের নামের ধর্মসংস্কারক এই মন্দিরের সংস্কারের কাজ করেন। সুদীর্ঘ বিশ বছরের বেশি সময় তিনি এখানে অবস্থান করেন। ১৯৮৮ সালে বিহারে অবস্থান কালে গভীর রাতে তিনি ডাকাত দলের আক্রমণের শিকার হন। এ সময় ডাকাতেরা বিহারের বহু প্রাচীন বুদ্ধমূর্তি ভাংচুর করে। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হলে প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথের রামকোট থেকে চলে যান। বর্তমানে প্রতি বছর বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্টিত ‘চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধ পূজা’ প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথের প্রবর্তন করেন।

rankut-3-copy
তিনি আরো বলেন, ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ায় এ বিহারটির গুরুত্ব খুবই বেশি। শুধূ তীর্থস্থান নয়,ঐতিহাসিক তীর্থস্থান বলা হয় এ বিহারকে। পূরাকীর্তি ও প্রতœতাত্তিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ প এবিহারের মাটি খুঁড়লেই পুরনো ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন পাওয়া যায়। প্রাচীন বুদ্ধ মূর্তির ধ্বংসাবশেষ, সেকালের ইটের টুকরোসহ এ রকম অনেক স্মৃতি চিহ্ন কাঁচের বক্সে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তিনি জানান, ব্যাপক ভাবে খনন কাজ চালালে এখান থেকে আরো অনেক প্রত্মতাত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার করা যাবে।

‘গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সামনে চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধ পূজাকে ঘিরে প্রতি বছর বৈশাখী পূর্ণিমার আগের রাত থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ নর-নারীরা এ বিহারে ছুটে আসেন। দেশী-বিদেশী পর্যটক ও পূন্যার্থীর পদচারনায় সারা বছর এ বিহার মূখরিত থাকলেও বৈশাখী পূর্ণিমার দিন এ বিহার পূর্ন ঐতিহ্য ফিরে পায়। রাত ভর চলে বুদ্ধ কীর্তণ আর ভোর বেলায় হাজার হাজার মানুষ মহাসমারোহে উদযাপন করেন চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধ পূজা। জানালেন গ্রামবাসী সঞ্জয় বড়ুয়া।

রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ প্রজ্ঞাবংশ মহাথের বলেন, ঐতিহাসিক গুরত্ব এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এ মন্দিরের গুরত্ব খুব বেশি। আর এখানে সংরক্ষিত বুঁড়ো গোঁয়াই মূর্তি বৌদ্ধদের কাছে অতি পূজনীয়। সংসার জীবনে শান্তি ও কল্যানের জন্য প্রতিদিন দুর-দুরান্ত থেকে এ মূর্তি দর্শন এবং পূজা দিতে অসংখ্য পূজারী এখানে আসেন। এছাড়াও নবজাতককে অন্নপ্রাশন, প্রব্রজ্যা দান, সংঘদান অষ্টপরিস্কার দানসহ নানা রকম ধর্মীয় আচারাধি রামকোট এসে সম্পন্ন করেন।

তিনি বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে নানা কারণে এ বিহারটি বাংলাদেশী বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র এবং সবচেয়ে বেশী ধর্মীয় মর্যাদাপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু যথাযথ পৃষ্টপোষকতার অভাবে বিহারটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা যাচ্ছে না। বিহারটিকে দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো হলে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পুরার্কীতি হিসাবে রূপলাভ করবে।

মন্তব্য করুন

(বিঃ দ্রঃ আপনার ইমেইল গোপন রাখা হবে) Required fields are marked *

*

Shares