সর্বশেষ সংবাদঃ

জোছনার নিঃসঙ্গতা

গাজী সাইফুল:
বেশ গোলগাল চেহারার, ড্যাব ড্যাবে টানা টানা চোখ, পরনে নীল শাড়ি, ফুল হাতা ব্লাউজ আর কপালের মাঝ সিঁথি জুড়ে লাল গাঢ় সিঁদুর, মেয়েলি একটি অবয়ব বেশ কিছুক্ষণ হল বেডরুমের বিশাল আয়নাটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।কৌতুহল নিয়ে আয়নার সেই স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবিতে নিজেকে ইনিয়ে বিনিয়ে দেখছে। আয়নায় নিজেকে তার দেখার ধরণ দেখে মনে হচ্ছে এর আগে এ নারী কোনদিন নিজেকে দেখেনি। সেই স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবিতে তাকিয়ে মাঝে মাঝে আনমনে মুচকি হেসে উঠছে। আবার, মুহুর্তেই ভ্রু-কুঁচকে মুখটা কেমন মলিন করে ফেলছে। বোধ হয় এ নারী নিজেকে কাক্সিক্ষত রূপে খুঁজে পাচ্ছে না। যেন নারী অবয়বে রৌদ্র ছায়ার এক প্রকার ভানুমতির খেলা চলছে। যে খেলার রহস্য সে শুধু নিজেই!
-‘নীলাম্বরী কোথায় তুমি, হলোনা এখনো?’ নীলাম্বরীর স্বামী নিনিদ ডাকছে।
-‘এইতো আসছি।’ বেশ স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিল নীলাম্বরী। অদ্ভুত একটা মিষ্টতা আছে এ নারীর ভোকালে। আর এ মিষ্টতা এক অতিন্দ্রীয় রহস্যময়তা! দিন শেষে যখন খুব ক্লান্ত হয়ে নিনিদ অফিস হতে ফিরে আসে, সে ক্লান্তিকে ভুলিয়ে দিয়ে এ ব্যাপারটুকু নারীকে নিজের একান্ত কাছে টেনে নেয়ার আকুতিকে বাড়িয়ে দেয়।

আজ সকালে বাসা হতে বেরিয়েই মিনিট বিশেকের মধ্যে অফিসে পৌঁছায় নিনিদ। ঢুকেই দেখে টেবিলের ফোনটি অনবরত বাজছে। কি ব্যাপার! এত সকালে তো ফোন বাজার কথা নয়। অপারেটরকেও তো বলা আছে সকালের সময়টাতে যেই ফোন করুক না কেন, তাকে যাতে দেয়া না হয়। তবুও কেন ফোন বাজছে!
এই সকালে ফোন তুলতে একদম ইচ্ছে করে না। গতকালের ফাইলগুলো এখনও চেক করা হয়েনি। সাধ সকালেই মেজাজটা কেমন বিগড়ে গেল। ধুত্তুরি কা! অনিচ্ছা সত্বেও ফোন তুলল নিনিদ-
-‘হ্যালো কে?’ ভেতরে কেমন চাপা একটা রাগ কাজ করছিল।
-‘আমি নীলাম্বরী।’ সাথে সাথেই নিনিদের রাগটা কেমন পড়ে গেল। কারণ সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে একটু প্রশান্তির খোঁজে নিনিদকে তার কাছেই ছুটে যেতে হয়। নিলাম্বরী তার একমাএ বউ। অর্ধাঙ্গিনী। ভালোবাসার জন্য তাকে এ নারীর কাছেই ফিরে আসতে হয়।
-‘হ্যাঁ’ বল’ বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
-‘কি ব্যাপার এতবার ফোন দিচ্ছি অপারেটরটা তো তোমাকে ফোনই দিতে চাইছে না। পরে…’
-‘হুমমম-বুঝেছি। সকালে আমিই মানা করেছি যেই ফোন করুক যাতে আমাকে দেয়া না হয়। তুমি আমার ফোনে কল করতে, অফিসের নাম্বারে কল করার কি প্রয়োজন ছিল?’
-‘আমার ফোনে ব্যালেন্স নেই, গতকাল দুপুরে আম্মাকে ফোন করেছিলাম, তখনই ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায়। পরে আর ব্যালেন্স ঢুকানো হয়েনি। তা কি করছিলে?’
-‘না, তেমন কিছু না। মাএ অফিসে এলাম। তুমি ব্রেকফাস্ট করেছ?’
-‘না, করিনি। করতে একদম ইচ্ছে করছে না।’
-‘কেন? এত বেলা হয়ে গেল এখনো ব্রেকফাস্ট করোনি কেন, শরীর খারাপ?’ কিছুটা উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইল নিনিদ।
-‘তা কিছুটা মাথা ধরেছে। সকালে তুমি চলে আসার পরেই বমি হয়েছে বেশ কয়েকবার।’
-‘এখন কি অবস্থা?’ কেমন একটা অস্থিরতা কাজ করতে লাগল নিনিদের মাঝে।
-‘এখন ভাল আছি।’
-‘ আমি কি বাসায় আসব?’
-‘না,তার প্রয়োজন নেই। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। গতকাল রাতে স্লিপিং পিল খেয়েছিলাম, তবে স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুম না আসাতে একটু শরীর খারাপ করেছে। ঘুমোলে এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।’
-‘তুমি এক কাজ কর, কেবিনেটে পাউরুটি রাখা আছে সেগুলো টোস্টারে দিয়ে গরম করে নাও।’ বলতে বলতে কাঁধের ব্যাগটা টেবিলে রেখে রিভলবিং চেয়াটাতে গিয়ে গা এলিয়ে বসল। ‘কিচেনের রেখটাতে জেলি রাখা আছে, গরম পাউরুটি দিয়ে খেলে ভাল লাগবে। দেখি আমি দুপুরে যত দ্রুত সম্ভব কাজ সেরে বাসায় ফিরব।’
-‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ বেশ আনমনা ভঙ্গিতে উওর দিল নিলাম্বরী। তাপরেই রাখি বলে খুট করে ফোনটি রেখে দিল সে।
তারপরেই ঠিক দুপুরে বাসায় ফিরল নিনিদ। ‘ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকার এই এক সমস্যা, কোনো প্রব্লেম হলে এগিয়ে আসার কেউ নেই। এখানে যারা থাকেন সবাই একদম একা। নিজের পরিবার পরিজনদের ছেড়ে একা একা ফ্ল্যাট বাসায় থাকার মাঝে কি কোনো সুখ আছে?
কি জানি! তবে এতে যে মনের অসুখের পরিমাণটা বেড়ে যায়, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।’
নীলাম্বরীর বাবা মা থাকেন সেই কুমিল্লা জেলার কাশিপুর গ্রামে, আর নিনিদের বাবা-মা থাকেন নবীনগরে। পাশাপাশি গ্রাম। দুজনেই ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিল। নিনিদ ছিল তার দু’ব্যাচ সিনিয়র। নিলাম্বরীকে হালকা পাতলা চিনত নিনিদ তবে, কোনো দিন তেমন কথা হয়েনি। কে জানত তাদের এভাবে বিয়ে হবে!
দু’জনের মধ্যে খুব একটা পরিচয় কিংবা কেমিস্ট্রিও ছিল না। একদিন মা ফোন দিলেন কি জরুরি কাজ যেন, বাড়ি যেতে হবে। বাড়ি গিয়ে দেখে তার মা বিয়ের সব ঠিকঠাক করে রেখেছেন। তাই বাধ্য হয়ে সে বেলায় বিয়েটা করেই ফেলতে হল। সে যাই হোক, নিনিদ বাসায় ফিরেই ডক্টর ডাকল, বেশ কিছুক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বেশ হাসিহাসি মুখ করে তিনি জানালেন-নীলাম্বরী মা হতে চলেছে।
নীলাম্বরীর গর্ভে নিনিদের অনাগত সন্তান। খুশিতে সে সবাইকে ফোন করল। বাবা হবার আনন্দ নিনিদের দু’চোখে অশ্রু এনে দিল। নিনিদ এই প্রথম বাবা হতে চলেছে। আস্তে আস্তে গিয়ে নীলাম্বরীর পাশে বসল। তারপর কাঁথাটা দিয়ে তার পা হতে বুক পর্যন্ত ঢেকে দিল। তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে চেপে ধরল।
-‘তুমি খুশি হয়েছ নীলাম্বরী? তুমি মা হতে চলেছ। তোমার গর্ভে আমাদের সন্তানের ভ্রুণ। ওকে যত্ন করে আগলে রেখ।’
-নীলাম্বরী কাঁদছে। হু হু করে ডুকরে কেঁদে উঠল। সাদা ধবধবে গাল বেয়ে গড়িয়ে পরছে সে জল।
-‘কাঁদছ যে? তোমার কি ভয় লাগছে? ভয় নেই আমি আছি তোমার পাশে। দেখো কিছুই হবে না। অকারণে ভয় পাচ্ছ।’ বলেই তার মাথায় হাত বুলাতে লাগল নিনিদ। বোধ হয় মা হবার আনন্দে। প্রতিটি মেয়ের কাছেই মা হবার আনন্দের কাছে পৃথিবীর বাকি সব আনন্দ ফিকে হয়ে হারিয়ে যায়। এ অশ্রু আনন্দের।
সে কেমন যেন বড় বড় করে দুটো নিশ্বাস ফেলল। তারপর আস্তে আস্তে উঠে বসল। নিনিদ তাকে ধরে খুব সাবধানে বসিয়ে দিল।
তারপর বুক ঠেলে উঠা কান্নাটা কেমন আস্তে করে থামিয়ে শান্ত স্বরে- ‘আচ্ছা এ সন্তান দেখতে ঠিক কার মত হবে?’ বলতে গিয়ে কেমন লজ্জা পেয়ে গেল নীলাম্বরী। এ কেমন প্রশ্ন! এ প্রশ্ন করাটা বোধ হয় উচিৎ হয়েনি। তারপরেও করে ফেলল। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল কেমন করে যেন। জানতে খুব ইচ্ছে করছে তাই হয়ত।
-‘তোমার মত।’ বলেই হিহিহি করে হেসে উঠে নিনিদ। নিনিদের হাসিতে তার লজ্জাটা আরো কেমন যেন অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়। নিলাম্বরীর কান দুটো কেমন লাল হয়ে উঠে। কপালের নীল রগগুলোও কেমন ফুলে ভেসে উঠেছে। লজ্জা কেমন প্রবাহিত হয়!
-‘আচ্ছা নাম কি রাখবে?’
-‘জানিনা।’ বলেই, এক ঝটকায় নিনিদের হাত থেকে নিজের হাতটি ছুটিয়ে কেমন গুটিয়ে নিল সে। নিনিদ লক্ষ্য করল মেয়েটা কেমন কাঁচুমাচু করছে। তবুও নিনিদের ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে সে আরো অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করুক! মেয়েটা আরো লজ্জা পাক। লজ্জায় আরো লাল হয়ে উঠুক। লজ্জায় কাঁথায় চেপে মুখ লুকোক।
-‘আচ্ছা যদি ছেলে হয় তাহলে নাম রাখব রক্তিম।’
-‘আর যদি মেয়ে হয় তাহলে?’
-‘তাহলে কি?’ জানতে চায় নীলাম্বরী।
-‘তাহলে মেয়ের নাম রাখবে তুমি।’ তারপর কি একটা চট করে ভেবে নিয়ে বলল নিনিদ-
-‘চা খাবে? আমি আজ তোমাকে নিজের হাতে চা করে খাওয়াব।’
-‘না। আমি এখনও কিছু খাইনি। খালি পেটে চা খেলে এসিডিটির প্রব্লেম হবে।’
-‘কি বল!’ কিছুটা অবাক হল নিনিদ। এখনো কিছু খাওনি! ছুটে যায় রান্না ঘরের দিকে। যত্ন করে নাস্তা খাওয়ায় তাকে, নিজেও খায়। যত্ন করে পাউরুটিতে জেলি মাখিয়ে দেয় নিনিদ। নীলাম্বরী তাতে কামড় বসিয়ে মুখ চেপে আস্তে আস্তে খাচ্ছে। সেদিকে চেয়ে আছে সে। প্রিয় মানুষের তৃপ্তি নিয়ে খাওয়ার ভঙ্গি দেখার মাঝেও এক ধরণের আনন্দ আছে।
খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এল।
-‘গোছল করেছ?’
-‘না করিনি।’ তারপর নিনিদ বাথরুমের বাথটাবে গিয়ে পানি ভর্তি করে। তাতে ফ্রিজ হতে বরফের কিছু টুকরো এনে ছেড়ে দেয়। বাসার সামনের ফুলের দোকান থেকেই কিছু গোলাপফুল গেটের দারোয়ান হারুনকে দিয়ে কিনিয়ে আনে। সেগুলো অতি যত্নে বাথটাবে ছড়িয়ে দেয়। নিলাম্বরী তখন বেড রুমে ঠান্ডা ভলিয়মে মেহের আফরোজ শাওনের কণ্ঠে গাওয়াএকটা গান শুনছিল আর তার সাথে ঠোঁট মিলিয়ে যাচ্ছে আনমনে।
যদি মন কাঁদে তুমি চলে এস,
তুমি চলে এস -এক বর্ষায়।

-নিনিদ ঘরে ঢুকেই নিলাম্বরীকে পাজা কোলে তুলে নেয়। ‘ওহ! কি করছ তুমি। ছেলে মানুষ হয়ে গেলে নাকি!’ সে বার বার নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে। তবে তা শুধু বৃথা আস্ফালন। তারপর তাকে সোজা বাথটাবে নিয়ে শুইয়ে দেয়। এত আয়োজন দেখে হকচকিয়ে যায় নিলাম্বরী।
-‘এসবের মানে কি?’
-‘মানে কিছুই না।’
-‘বুঝলাম নাহ্।
-‘তোমাকে আমি নিজের হাতে আজ স্নান করাব।’ বলেই বেশ উচ্চ শব্দে বিচ্ছিরি একটা হাসি দিল নিনিদ। নীলাম্বরী মনের কিছুটা আনন্দে কি লজ্জা লুকাতে বলে উঠল-‘পাগল কোথাকার। কখন যে কি কর বুঝিনা।’
-তারপর নিনিদ অতি যত্নে নীলাম্বরীর সারা শরীরে সুগন্ধি সাবান মাখিয়ে দিল। পুরো শরীরে এখন শুধু একটি কটকটে হলুদ রঙের টাওয়েল জড়ানো আর কিচ্ছু নেই! নিলাম্বরী শুয়ে আছে বাথটাবে। গোছল শেষে নিনিদ নিজেই পুরো শরীর মুছিয়ে দিল তার।
-বিয়ে হয়েছে কত দিন আর হবে, মাএ ন’মাস হল। নিনিদের কাছে মাঝে মাঝে মনে হয় নীলাম্বরী এখনো তার কাছে অপরিচীত এক নারী। তার স্পর্শগুলো এখনো কেমন যেন অস্বাভাবিক ভাবে নেয় সে, মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত ভাবে শিহরিত হয়ে কেঁপে কেঁপে উঠে। বিয়ের প্রথম রাতে নিনিদ যখন তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু করেছিল গোলাপী উষ্ণ ঠোঁটে, কেমন হেঁচটা একটা ঝাপটায় সে সরিয়ে দিয়েছিল তাকে। সারা রাত কেঁদেছিল, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। চোখদুটো কেমন সন্ধ্যের পশ্চিম আকাশের লালচে গাঢ় আভাটায় ছেয়ে গিয়েছিল। প্রথমে বেশ ভড়কে যায় নিনিদ-
-‘কি হল কাঁদছ যে?’ কোন প্রতিউত্তর নেই নীলাম্বরীর মুখে। মেয়েটি তখনো কেঁদে চলেছে। নিনিদ আবার জানতে চাইল,‘কি হল, বলবেনা কিছু? আজ আমাদের বিয়ের প্রথম রাত, ফুলশয্যার রাত। কত কত প্রতীক্ষিত এ রাত, প্রতিটি মেয়ে কত কত স্বপ্নে জড়ায় এ রাতকে নিয়ে। আর তুমি কিনা!’
-কান্না থামাল অবশেষে, বাঁ-হাতের আলতো স্পর্শে চোখের কটু নোনা জল মুছল। চোখের জলে মুখের ভারি মেকআপগুলো কেমন ভোসকা হয়ে ফুলে উঠল। হয়ত পানি শুকিয়ে গেলেই খসে পরে যাবে। তারপর, তারপর কি?! পরম মমতায় কাছে টেনে নিয়েছিল নিনিদ তাকে।
এখন রাত প্রায় পৌনে এগারোটা, কিছুক্ষণ পরেই নীলাম্বরী শুতে এল প্রতিদিনের মত বিছানায়, নিনিদ কিছুটা সরে গিয়ে জায়গা করে দিল। শুয়েই হু হু করে জোরে দুটো নিশ্বাস ছাড়ল। তারপর হাতের কাছের ছোট ফ্যাকাসে আধপুরনো টেবিল ল্যাম্পটাকে জ্বালিয়ে দিল। নিনিদ তার হাতটি আস্তে আস্তে করে নীলাম্বরীর চিবুকে রাখে। ঘরটা কেমন আবছা অন্ধকার, তারপর আলতো করে একটা লম্বা চুমু খায়। লজ্জায় কি সুখের তৃপ্ততায় চোখ বুঝে ফেলে সে। নিনিদ অপলক চোখে দেখছে তাকে। কখন যে চোখে তন্দ্রা এসে যায় বুঝে উঠতে পারেনি নিনিদ। রাত একটা। এ অনেক রাত। কেউ জেগে নেই এখন, সবাই ঘুমিয়ে পরেছে। তন্দ্রা আচ্ছন্ন করে রেখেছে চারপাশের লোকালয়কে। তবে নীলাম্বরী জেগে থাকে সারা রাত নিলাদ্রির প্রতিক্ষায়। নিলাদ্রি তার কাক্সিক্ষত নারী বাসনার পুরুষ। তার নারীত্ব শুধুই নিলাদ্রিকে চায়! এর মাঝে অন্য পুরুষের প্রবেশকে সায় দিতে পারে না সে। তবুও আজকাল দিতে হয়।

নীলাম্বরীর সিক্ততা শুধুই নিলাদ্রি নামক কাক্সিক্ষত পুরুষের স্পর্শে জেগে উঠে। সে নিনিদের হাতটা আলতো করে ধরে সরিয়ে পাশে রাখে। নিস্তব্ধে উঠে বসে, এগিয়ে যায় সন্তর্পণে খোলা বৃষ্টিভেজা বারান্দায়। আজ সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে, সকাল থেকে তির তির একটা বৃষ্টি ছিল, ভর সন্ধ্যেয় তা আকাশ ফুটো করে ঝুম ঝুম করে নামে। চারদিকের বাতাসটা কেমন শীতল। ঠান্ডা একটা আভা জরিয়ে আছে। ভার্সিটিতে সেদিন শেষ বারের মত দেখা হয়েছিল নিলাদ্রির সাথে, কেমন সুপুরুষ। এ পুরুষের প্রতি নারী আবেগ ঠিকরে পড়তে চায়।
নিলাদ্রি সবে মাএ ক্লাস করে বেরিয়েছে, অশ্রু সিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে আছে নীলাম্বরী ক্লাস রুমটার সামনেই। কান্নার নোনা পানি শুকিয়ে গিয়ে আবছা একটা রেখা টেনে দিয়েছে নীলাভ উপশিরা বেরিয়ে থাকা সে গালে। বেশ বিব্রত দেখাচ্ছে তাকে। এগিয়ে এসে নিলাদ্রি-
-কি হয়েছে?’ বেশ গম্ভীর ভাবে জানতে চাইল।
-‘আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে, এ সপ্তাহেই বুধবার।’ বলতে গিয়ে কণ্ঠটা কেমন অচেনা অচেনা মনে হয় নিজের কাছেই। নিশ্বাসটা কেমন আটকে এল। ভারি হয়ে আসছিল চারপাশের পরিবেশটা।
-‘ও আচ্ছা।’ অস্ফুট একটা শব্দ করল সে।
-‘বিয়ে কি সত্যিই ঠিক হয়ে গিয়েছে?’ নীলাম্বরী কখনো মিথ্যে কথা বলেনা জেনেও আবার কেমন অবিশ্বাসের ঘোর হতে অযাচিত ভাবে জানতে চাইল।
-হ্যাঁ।’ কেমন করুণ শোনায় তার গলাটা।
-‘আমার ভয় করছে!’
-‘কিসের ভয়?’
-‘আমি থাকতে পারব না তোমাকে ছাড়া।’
-‘নিলাদ্রি আধছাড়া হয়ে হাসে। ‘ধুর পাগলি এইসব বিয়েÑটিয়ে কিচ্ছু না। এইসব কিছুই হবে না, তুমি দেখে নিও।’ একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার। এ শব্দ কারো কানে পৌঁছায় না!
ডুকরে কেঁদে উঠে নীলাম্বরী। সত্যি সে অনেক ভালোবাসে তাকে। ভালোবেসে নিজের সব কিছু প্রেজেন্ট করেছে নিলাদ্রিকে। অপর পুরুষকে দেবার মত তার আর কিছুই নেই। সব কিছু এখন এ পুরুষের কাছেই। অন্য পুরুষকে বিয়ে করে সে ঠকাতে পারবে না। না, কখনোই না। তা কখনো সম্ভব নয়।
অবশেষে নীলাম্বরীর বিয়ে হল নিনিদের সাথে। নিনিদ খুব ভাল ছেলে। তাকে ঠকানো বোধ হয় ঠিক হয়েনি। তাই হয়ত সে কান্না ছিল অনুশোচনার! দিনশেষে তাই মাথার উপর শূন্য আকাশটা এক হাহাকারে নিক্ষেপ করে তাকে। এ হাহাকারের নাম অনল। ভালোবাসার অনল।
নীলাম্বরী দাঁড়িয়ে আছে খোলা বারান্দায়। পুরো বারান্দা কেমন বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। পিছল ফ্লোর আরো পিছল হয়ে আছে। শরীর দু-একবার সে পিছলে পড়তে গিয়েও পড়েনি। ‘আচ্ছা পড়ে গেলে কি হত?! নিশ্চই নিনিদ জেগে উঠত হঠাৎ ধুপ করে উঠা শব্দে। তারপর ছুটে আসত। আমাকে এই মাঝ রাএিতে বান্দায় সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বেশ অবাক হত। হাজারটা কৌতুহলী প্রশ্ন করত।’
আকাশে আজ বেশ জ্যোৎস্না করেছে। বৃষ্টি হওয়াতে আকাশ পরিষ্কার হয়ে মেঘ কেটে গেছে। আজকের জ্যোৎস্নাটা কেমন প্রবল। একটা মায়া আছে, কেমন সারা রাত জেগে থেকে জোছনা দেখার আকুতিকে বাড়িয়ে দেয়। শত বছর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। এ জোছনায় নিজের ছায়াও কথা বলে। নিজেকে চিনিয়ে দিয়ে যায় কাছ থেকে, খুব কাছ থেকে। জোনাকির আলোটাও কেমন যেন ফিকে হয়ে হারিয়ে যায়।
এমনই জোছনার প্রতি রাতে নিলাদ্রি ফিরে আছে নীলাম্বরীর হ্যালুসিনেশনে। সে প্রতীক্ষা করে সারা রাত জেগে তার কামনার পুরুষ আবার ফিরে আসুক এ বৃষ্টিভেজা রাতে। আচ্ছা নিনিদ তো ঘুমোচ্ছে, নিলাদ্রি এসেই যদি আমার সাথে আবার অতৃপ্ত সঙ্গমের তৃপ্ততার মাততে চায়!
কিন্তু তা কি এখন সম্ভব! না, তা কিছুতেই সম্ভব নয়। নিনিদের সন্তানের ভ্রুণ তার গর্ভে। আচ্ছা যদি সঙ্গম করেই ফেলে, যদি নিলাদ্রির আরেকটা সন্তান ও নিলাম্বরীর গর্ভে চলে আসে! দুটো সন্তান যদি একই সাথে বেড়ে উঠে?! নিনিদকি সে সন্তানকে দেখে বুঝতে পারবে এ সন্তান তার নয়! হয়ত বুঝতে পারবে না। তবুওÑ তা শুধু কল্পনাতেই সুন্দর!
শুভ্রদেবতাকে প্রবারণায় দেখা যায় কোনো এক নীল রঙের আবরণে জুড়ে থাকা শুদ্ধ নারীর সাথে অযাচিত আড্ডায় মধ্যরাতের শেষ প্রহর অবধি জেগে আছে। আকাশে উড়ে যায় একশ একটা রঙিন ফানুস। তবে নীলাম্বরীর নিলাদ্রি বার বার একটা গোগ্রাসে নিস্তব্ধতা নিয়ে জোছনার এই ফিনিক রাতে নীল পাঞ্জাবি, সমস্ত শরীরে নারী বাসনার আবেগ, একটা সঙ্গমের অতৃপ্ততা নিয়ে নীলাম্বরীর কাছে ফিরে আসে। সে প্রতিরাতে তাই দাঁড়িয়ে থাকে পশ্চিমের আম গাছ বরাবর খোলা বারান্দার রেলিংটায় খোলা চুলে।
একটা দক্ষিণা বাতাস ছুটে আসে দমকা হয়ে। শাড়িটা কেমন নীলাম্বরীর হাওয়ায় ফুলে উঠে। তবে এই যা, আজও তো এলোনা নিলাদ্রি। তবে কি তা শুধুই হ্যালুসিনেশন!
রাত বাড়তে থাকে, রাতের আকাশটা ফর্সা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। জোছনায় ছায়া পড়া একই অবয়বে জেগে উঠা বারান্দার পশ্চিমের গাছটাও মুছে যেতে শুরু করেছে। একটু পরেই ভোরের আলো ফুটে উঠবে। তারপর!

*************************************************************************************************

গাজী সাইফুল
কথাসাহিত্যিক
প্রথম উপন্যাস- শেষ বিকেলের প্রণয়

মন্তব্য করুন

(বিঃ দ্রঃ আপনার ইমেইল গোপন রাখা হবে) Required fields are marked *

*

Shares