দ্রোহ ও বেদনার কবি কাজী নজরুল

অজয় দাশগুপ্ত:
কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের বেদনার কবি। তাঁকে আমরা নানাভাবে ব্যাখ্যা করার নামে মূলত জালে আবদ্ধ করে ফেলি। সেই কবে থেকে শুরু হয়েছে এর যেন শেষ নাই। কাজী কবি ছিলেন সাধারণ ঘরের এক বাঙালি। তবে এসেছিলেন অসাধারণ প্রতিভা আর মেধা নিয়ে। হেন কোনো শাখা নেই তাঁর স্পর্শে জেগে ওঠেনি। তিনি ওপার বাংলার মানুষ হলেও অবিভক্ত বাংলার বলে আমাদেরও সমান অধিকার তাঁর ওপর। কবি বাংলাদেশের সাথেও ছিলেন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে।

এপার বাংলার মানুষ তাঁকে চিরকাল আপন ভেবেছিল এমন ভাবার যৌক্তিকতা দেখি না। যেহেতু তিনি খোলামেলা আর চিন্তা ভাবনার ব্যাপারে ছিলেন উদার, পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী তাঁকে নিতে পারেনি। ‘কাফের’ বলে দূরে রাখার কুচিন্তা ও কুভাবনা কাজ করেছে অনেকবার। অথচ তিনি বলতেন, তাঁর জন্মই হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য। ব্যক্তিজীবনেও তিনি তার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিবাহে হিন্দু স্ত্রীর জন্য তাঁর আত্মার আকুতি দেখি শেষ দিকের চিঠিপত্রে। প্রমীলাকে রোগ থেকে মুক্ত করার জন্য বহু মানুষের কাছে হাত পেতেছিলেন। প্রমথনাথ বিশীকে ‘শিব’ সম্বোধন করে লেখা চিঠিতে যে আকুতি তার নাম যদি ভালোবাসা না হয় তো কাকে বলি প্রেম? এই জীবনবোধ স্পষ্ট ও তীব্র ছিল বলেই তাঁকে লিখতে দেখি, মোরা একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান।

আজ যারা তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ে তাঁকে আপন বলে তড়পান তাদের হাতেই চূড়ান্ত নিগৃহীত হয়েছিলেন কবি। মহাশ্মশানকে গোরস্থান লেখা এই সাম্প্রদায়িকদের সাথে ছিলো এ দেশের জেনারেলদের তথাকথিত প্রেম। আমাদের যৌবনে বিএনপির যখন রমরমা তখন জেনারেল জিয়ার ছবি সংবলিত টি শার্টে তাঁর ছবি দিয়ে লেখা হয়েছিল: আমি আসি যুগে যুগে আসি মহাবিপ্লব হেতু।

যার যেমন ইচ্ছে তেমন করে ব্যবহারের কারণে কাজী নজরুলের আসল ইমেজ হারিয়ে ফেলেছি আমরা। একবার মনে হয়, তিনি ইসলামী গানের কবি। কখনো মনে হয় তিনি কালীভক্ত। কখনোবা অসাম্প্রদায়িক এক দুখী বাঙালি। আসলে কাজী কবি ছিলেন মানুষের কবি। সে কারণে তিনি যখন যেটা আপন মনে করেছেন তাই ধারণ করেছেন মনের কোণে। খেয়াল করবো রবীন্দ্রনাথ গগনে গগনে বিরাজ করলেও তিনি সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে বৈকি। আজকের মধ্যবি্ত্ত তাঁকে ধারণ করলেও তিনি এক দূরের তারা। এটা মানতেই হবে তিনি ছাড়া বাঙালির জগত অন্ধকার। তবে তাঁর জ্যোতি স্নিগ্ধ জোসনার মতো আলোময়। নজরুল সেখানে দীপ্র। যেখানে বাঙালি মুষড়ে পড়ে যেখানে তার নৈরাজ্য বা আঁধার সেখানেই তিনি জ্বলে ওঠেন। যার পরিচয় আছে মুক্তিযুদ্ধে। তারপরও আমার মতে তিনি আসলে বেদনার কবি।

নিজেই তিনি লিখেছিলেন তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ বলে বলে মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যতবার আমি তাঁকে ভাবি, তাঁর লেখা বা গানের কাছে যাই, ততবারই মনে হয় কী নির্মম আমরা। কোনো এক সময়ে তিনি সেনাবাহিনীতে গিয়েছিলেন বা যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে লিখেছেন বলে স্থায়ী তকমা এঁটে প্রেম ও বিরহের কবিকে এভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। আমাদের সুধি সমাজ ও সংস্কৃতির এক বিশাল অংশে কাজী নজরুল মূলত দামামা বাজানো এক মুসলমান কবি। অথচ যারা তাঁকে জানেন তারা মানবেন ব্যক্তিজীবনে বাঙালির উচিত রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও নজরুলের জীবন মেনে চলা। এ দুটো এক হলে আমাদের চিন্তা চেতনায় কোনো সংকীর্ণতা বা সাম্প্রদায়িকতা ঢুকতে পারতো না।

তা না করে আমরা তাঁকে করেছি রণসঙ্গীতের স্রষ্টা। জাতীয় কবির বিদ্রোহী ছাড়া আর কোনো কবিতাই সর্বজনীন করতে চাইনি। কারণ সব কিছুতেই তিনি ছিলেন উদার ও মুক্ত। সমসাময়িক কালে অমন জনপ্রিয় লেখক হাতে গোণা। কথিত আছে রানু সোম মানে বুদ্ধদেব বসুর পত্নী প্রতিভা বসুও গান শুনে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। একদিকে নার্গিসকে ফেলে আসা আরেকদিকে প্রমীলামুখর জীবন। এ যেন বেদনা ও ভালোবাসার যুগলবন্দী এক শ্যামের জীবন। এমনও জানা যায়, গোরা মানে সাহেবরাও তাঁকে খাতির করতে বাধ্য হতেন। কলকাতার ফুটবল মাঠে মোহনবাগান বনাম সাদাদের খেলায় অন্যরা যখন গ্যালারীতে কবি বসতেন মাঠের বিশেষ আসনে।

কাজী নজরুলের সামাজিক মর্যাদা যত বড় হোক না কেন জীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্যে। হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছো মহান লিখলেও মূলত দারিদ্র্যের অভিশাপে তাঁর প্রতিভা বিকশিত হতে পারেনি। সমসাময়িক কালের দায় মেটাতে গিয়ে তাঁকে বৃত্তবদ্ধ হতে হয়েছিল। যে জীবন নদীর ঢেউয়ের মতো চলমান যার পরতে পরতে শুধু ওঠানামা তাঁর সময় ছিলো না প্রেমময় দর্শনে ডুবে যাবার। তারপরও রোদন হয়ে আসার ইচ্ছে পোষণের এই কবি চোখের জলে ভাসিয়েছেন আমাদের। খুব দূরে যাবার দরকার নেই, যাহার গানের আমি বনমালা আমি যার কাঁকন লিখে মন ভেজানো গানের স্রষ্টা অনায়াসে ঢুকে পড়েন অন্দরমহলে। এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় তাঁর পর দু’একটা গানে ঝিলিক দিলেও আধুনিক গানের জগতে তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি কেউ। কি কাব্যে কি গানে কি জীবনে এমন ছন্দময় মানুষকে আমরা কেন যে বিপুল করে তুলতে পারলাম না!

বাঙালি এমন এক জাতি কাউকে তাঁর প্রাপ্য দিতে জানে না। দড়ি বেঁধে দরিরামপুরের উৎসব যেন তার প্রতিচ্ছবি। যখনই বেদনা ও সুর এক হয়, যখন ভালোবাসায় যুদ্ধ অনিবার্য, যখন সমাজ ও দেশে অনাচার অন্যায় ভালোবাসাহীনতা চাড়া দিয়ে ওঠে তখন কেবল লড়াই না, একহাতে মম বাঁশের বাঁশরী আরেক হাতে রণতূর্যের কবি হাজির হন।

কাজী নজরুল কবিতা ও কবির কাজীই বটে। তাঁর লেখা ও সৃষ্টির ভেতর যে সত্য তাকে আমরা আসলেই অনুধাবন করি না। আমাদের যাত্রা একমুখী। কামাল পাশার নামে লেখা কবিতা পড়ে আমরা পুলকিত হই বটে এর ভেতরের সত্য মানি না। কামাল পাশা কীভাবে আধুনিক দেশ ও সমাজ গড়েছিলেন সেটা জানতে চাই না আমরা। আমাদের চারপাশে যখন অন্ধত্ব ও সাম্প্রদায়িকতা তখন তাঁর মতো বাতিঘর থাকতেও সে আলো নিজের ঘরে ঢুকতে দেই না আমরা।

যত সময় যাক কবি তোমারে দেব না ভুলিতে, শুভ জন্মদিন হে নির্বাক কথার আঁধার।