অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাঙালি সংস্কৃতির উপস্থাপনে রামুতে বাংলা নববর্ষবরণ ও চৈত্রমেলা উদযাপন

খালেদ শহীদ:
হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বুকে নিয়ে রামুতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ বরণ ও চৈত্রমেলা। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দু’দিন ব্যাপী ‘বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদ’ ও ‘চৈত্রমেলা ও নববর্ষ উদযাপন পরিষদ ১৪২৪’ এ উৎসবের আয়োজন করে।

গ্রাম বাংলার সংস্কৃতির নানা উপস্থাপনে উৎসবে প্রাণ পায় রামুতে নববর্ষ বরণ উদযাপনে। বাঙ্গালিয়ানায় ঋদ্ধ রামুবাসীর এ আয়োজনে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীকী উপস্থাপন করা হয়। বিগত ২৫ বছর ধরে রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ‘বাংলা নববর্ষ বরণ’ ও ২১ বছর ধরে সীমা বিহার মাঠে ‘চৈত্রমেলা ও নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে রামুর সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো/তাপস নিঃশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’। নববর্ষের নতুন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল আর্বজনাকে দূর করে, আমাদের সমাজে ও জীবনচারণে নতুন সুর গাঁথায় অঙ্কুরিত হোক নতুনের জয়গান।

শুক্রবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৭টায় রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বৈশাখী গানের সুরে বাংলা নববর্ষকে এ আহ্বানে স্বাগত জানায় বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদ। শিল্পী প্রবীর বড়ুয়ার পরিচালনায় প্রভাতী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদের দিনব্যাপী নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়।

‘আমাদের সংস্কৃতি বিশ্বাস ষোলআনা বাঙ্গালিয়ানায় ঋদ্ধ’ এ প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী আয়োজনে সকালে প্রভাতী অনুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা ভাতের ‘চিত্রাংকন ও কবিতা আবৃত্তি’ প্রতিযোগিতা এবং দুপুরে ‘দেশের গান, বাঙ্গালি সাজে, লোক গান ও লোক নৃত্য’ প্রতিযোগীতা, সন্ধ্যায় আলোচনা সভা, রাতে পুরষ্কার বিতরণ ও সাস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন, অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া, মানসী বড়ুয়া।

বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক প্রবীর বড়ুয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন, সহকারি কমিশনার (ভূমি) মো. নিকারুজ্জামান, রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুফিজুল ইসলাম, প্রবীন শিক্ষক ফরিদ আহমদ, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রামু’র সভাপতি মাষ্টার মোহাম্মদ আলম, কাউয়ারখোপ হাকিম রকিমা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কিশোর বড়ুয়া, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইউনুচ রানা চৌধুরী, উপজেলা যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক নীতিশ বড়ুয়া, রামু প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি খালেদ শহীদ, শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমী রামু’র উপ-পরিচালক মানসী বড়ুয়া প্রমুখ।

সাংস্কৃতিক কর্মী অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়ার সঞ্চালনায় আলোচনা সভা ও পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন, উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব বশিরুল ইসলাম।

দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগীতায় ‘চিত্রাংকন’ ক বিভাগে অয়ন্তী সরকার প্রথম, রাফসান মান্নান দ্বিতীয়, সাবরিনা সেলিম শিমু ও তাজকিয়া নুঝুম বিনতে কাসেম তৃতীয় হয়েছে।

Ramu-2

খ বিভাগে অনিন্দিতা বড়ুয়া প্রথম, মো. সালাউদ্দিন দ্বিতীয়, মির্জা আসিফ শাহরিয়ার তৃতীয় হয়েছে।

গ বিভাগে তাসনীম সুলতানা তুর্ণী প্রথম, বোরহান উদ্দিন রব্বানী দ্বিতীয়, আহনাফ রহমান রামীম ও মো. রায়হান তৃতীয় হয়েছে।

‘কবিতা আবৃত্তি’ ক বিভাগে রাজর্ষি বড়ুয়া প্রথম, তাজকিয়া নুঝুম বিনতে কাসেম দ্বিতীয়, জয়রিয়া বড়ুয়া মোহনা তৃতীয় হয়েছে।

খ বিভাগে প্রবাহিকা বড়ুয়া মেধা প্রথম, আদিত্য সিকদার প্রিন্স দ্বিতীয়, মিফতাহুল জান্নাত মায়িশা তৃতীয় হয়েছে।

গ বিভাগে অভিস্পা বড়ুয়া মেঘলা প্রথম, স্বরজিত বড়ুয়া শক্তি দ্বিতীয়, সামায়লা জাহান সামিহা তৃতীয় হয়েছে।

‘বাঙ্গালি সাজো’ ক বিভাগে মো. সারওয়াত ওবাইদ ওয়াফী প্রথম, রিদওয়ান সেলিম সামি দ্বিতীয়, সাবরিনা সেলিম শিমু তৃতীয় হয়েছে।

খ বিভাগে ইশমাম কবির প্রথম, আদিত্য সিকদার প্রিন্স দ্বিতীয়, আবু ইউছুপ চৌধুরী নুর তৃতীয় হয়েছে।

গ বিভাগে ফাতেমাতুজ জোহরা রানী প্রথম, আয়েশা ছিদ্দিকা কলি দ্বিতীয়, জাহেদ হাসান তৃতীয় হয়েছে।

‘দেশের গান’ ক বিভাগে মেহেরিন রাহব্বাত ইপসিতা প্রথম, তানিশা সালসাবিল দ্বিতীয়, শাদমান মোহাম্মদ সামী তৃতীয় হয়েছে।

খ বিভাগে প্রেরণা বড়ুয়া স্বস্তি প্রথম, মির্জা আসিফ শাহরিয়ার দ্বিতীয়, ইশমাম কবির তৃতীয় হয়েছে।

গ বিভাগে তাসনোভা মেহজাবিন আনিকা প্রথম, লাবণ্য বড়ুয়া বর্ষা দ্বিতীয়, পূজা বিশ্বাস তৃতীয় হয়েছে। ‘লোক

গীতি’ ক বিভাগে মেহেরিন রাহব্বাত ইপসিতা প্রথম, তানিশা সালসাবিল দ্বিতীয়, রিদওয়ান সেলিম সামি তৃতীয় হয়েছে।

খ বিভাগে ইশমাম কবির প্রথম, প্রেরণা বড়ুয়া স্বস্তি দ্বিতীয়, তাসিফ রবিন হানিফ তৃতীয় হয়েছে।

গ বিভাগে তাসনোভা মেহজাবীন আনিকা প্রথম, তাসকিয়া ইসলাম রিশপা দ্বিতীয়, লাবণ্য বড়ুয়া বর্ষা তৃতীয় হয়েছে।

‘লোক নৃত্য’ ক বিভাগে জয়রিয়া বড়ুয়া মোহনা প্রথম হয়েছে।

খ বিভাগে অর্পিতা চৌধুরী অর্পা প্রথম, দৃষ্টি ধর দ্বিতীয়, মাইমুনা হক চৌধুরী মাইশা তৃতীয় হয়েছে।

গ বিভাগে ফারিয়াল জামান রাইছা প্রথম স্থান অধিকার করে। সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন, প্রবীর বড়ুয়া, ধর্মদর্শী বড়ুয়া, পরীক্ষিৎ বড়ুয়া টুটুন, পুলক বড়ুয়া, রেফাইতুল মান্নান, চম্পক বড়ুয়া, নিরুপমা বড়ুয়া, আবুল কাসেম, তাপস মল্লিক ও দিপক বড়ুয়া।

ব্যাপক আনন্দ-আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ বরণ উৎসব উদযাপন করেছে রামু উপজেলা প্রশাসন। সকালে রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদের প্রভাতী অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে রামু উপজেলা অফিসার্স ক্লাব শিল্পী গোষ্ঠি।

বর্ষবরণ মঞ্চে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহা. শাজাহান আলি’র নির্দেশনা ও সঞ্চালনায় গানে গানে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত অফিসার্স ক্লাব শিল্পী গোষ্ঠি।

প্রভাতী অনুষ্ঠান শেষে রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে বর্ষবরণের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রাটি রামু চৌমুহনীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাংলা নববর্ষ বরণ মঞ্চে এসে শেষ হয়।

বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক প্রবীর বড়ুয়া বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। বাংলা নববর্ষ বরণের এ উৎসবে অসম্প্রদায়িক চেতনায় রামুর সর্বস্তরের মানুষ মিলিত হন রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বাংলার হাজার বছরের বহমান লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারায় রামুতে এ বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন করে আসছি আমরা। ‘আমাদের সংস্কৃতি বিশ্বাস ষোলআনা বাঙ্গালিয়ানায় ঋদ্ধ’ এ প্রতিপাদ্য বাঙ্গালি সংস্কৃতির মানবিক মূল্যবোধ দেশকে ভালোবাসতে শেখায়। নববর্ষে আমাদের

সমাজ-সংস্কৃতিতে বাঙ্গালির জয়গান হোক, প্রত্যাশা করি সকল গ্লানি-জরা মুছে নতুন বছরটি হোক আমাদের জন্য কল্যাণকর’ এ প্রত্যাশার কথা বলেন বাংলা নববর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব বশিরুল ইসলাম।

Ramu-3

বৃহস্পতি রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার মাঠে ২১তম চৈত্রমেলা ও নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে বাঙ্গালীর মনে চির জাগরুক রাখার মানসে প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও উদযাপন করে ‘চৈত্রমেলা ও নববর্ষ উদযাপন পরিষদ ১৪২৪ বাংলা’।

দিনব্যাপী আয়োজনে লুডু গাছ আরোহন ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সন্ধ্যায় শিশু শিল্পীদের অনুুষ্ঠান ‘আনন্দ উৎসব’, রাতে বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা সভা ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘আনন্দ মেলা হাউজফুল’ অনুষ্ঠিত হয়। রাত ১২টা ১ মিনিটে ‘আতশ বাজি’ উৎসবের মাধ্যমে ১৪২৪ বাংলা নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান করা হয়।
চৈত্রমেলা ও নববর্ষ উদযাপন পরিষদের সভাপতি অরুপ বড়ুয়া কালু’র সভাপতিত্বে ও সাধারন সম্পাদক পলক বড়ুয়া আপ্পু’র সঞ্চালনায় রাতের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন, কক্সবাজার-৩ আসনের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল।

অনুষ্ঠানে উপজেলা চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, সহকারি কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ নিকারুজ্জামান, মহিলা সম্পাদিকা মুসরাত জাহান মুন্নী, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) সদস্য বিজন বড়ুয়া, কক্সবাজার জেলা পরিষদ সদস্য নুরুল হক কোম্পানী, কক্সবাজার পৌর যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক আসাদ উল্লাহ, প্রবীণ শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ ফরিদ আহমদ, রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি প্রবীর বড়ুয়া, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুবীর বড়ুয়া বুলু, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক গিয়স উদ্দীন কোম্পানী, সমাজসেবক নীলোৎপল বড়ুয়া নিলু, রঞ্জন বড়ুয়া, বাংলাদেশ বেতারের সংগীত প্রযোজক বশিরুল ইসলাম, প্রবাসী নিয়ামত উল্লাহ বিশেষ অতিথি উপস্থিত ছিলেন।

বৃস্পতিবার দুপুরে রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার মাঠে অনুষ্ঠিতব্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করবেন, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম।

রাতে চট্টগ্রামের কৌতুক শিল্পী মেরা মিয়া, হ্যাপী, এ্যানি ও প্রিয়াংকা সংগীত পরিবেশ করেন। ছড়াকার ও সাংবাদিক দর্পণ বড়ুয়ার স্বাগত বক্তৃতায় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার পরিচালনা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অলক বড়ুয়া, খিজারীয়ান ৮৬’র সভাপতি খালেদ শহীদ, ফতেখাঁরকুল ইউপি সদস্য লিটন বড়ুয়া লুতু প্রমুখ