সংখ্যালঘু নির্যাতন ‘পাকিস্তান আমলের মতোই’

পাকিস্তান আমলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে বৈষম্য, নিপীড়ন, নির্যাতন হয়েছিল, তা থেকে তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত।

অত্যাচার ও নির্যাতনের কারণে স্বাধীনতার পর ৪৫ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কমে অর্ধেক হওয়ার পরিসংখ্যানও দিয়েছেন তিনি।

রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে শুক্রবার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রানা দাশগুপ্ত বলেন, একাত্তরে হিন্দু-মুসলিম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

“স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে ইশতেহার, সেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা ছিল- দেশের ভূখণ্ডে আদিবাসী, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব নাগরিকের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, যে রাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, নাগরিকত্বের পরিচয়ে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে।

“কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে চাই, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও স্বাধীনতা ইশতেহারের সাম্য, সমতা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হয়নি। এই জন্য হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদকে নিয়মতান্ত্রিক সমতা ও মানবাধিকারের লড়াই করতে হচ্ছে।”

বর্তমান সংবিধান বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট তৈরি করেছে দাবি করে রানা দাশগুপ্ত বলেন, “কেউ মুসলিম, কেউ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। পাকিস্তান আমলে যে বৈষম্য এবং নিপীড়ন-নির্যাতন ছিল, আজও তা থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।”

নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা দেশ ছাড়েন দাবি করে তিনি বলেন, “দেশের আড়াই কোটি ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম করেনি।”

ওই অনুষ্ঠানে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের যে সংবিধান তৈরি হয়েছিল, তা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হত, তাহলে দেশে এমন একটি পরিষদের (হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ) প্রয়োজন থাকত না।

“সংবিধান অনুযায়ী আমাদের আশা ছিল, স্বাধীন দেশে সব নাগরিক সমান সুযোগ পাবে। তারা সবাই রাজনীতি করতে পারবে, অর্থনৈতিক সুযোগ পাবে, সবার জন্য নিরাপত্তা থাকবে। ধর্ম বা কোনো দলে বিভক্ত থাকার কথা ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।”

একটি বৈষম্যহীন দেশ গড়তে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের সংগঠনের কোনো দরকার ছিল না। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য- যেখানে সংবিধান, আইন ও সমতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবাই সমান হবে, সেই সমাজ আমরা নির্মাণ করতে পারিনি। রাষ্ট্র যাতে সবাইকে সমান চোখে দেখতে বাধ্য হয় সেজন্য ঐক্য পরিষদের মতো সংগঠন করতে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, এ দেশের মাটি অসাম্প্রদায়িক, এই মাটি সবার, এই মাটিতে জঙ্গি-দানবের কোনো জায়গা নেই।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘জঙ্গিবাদের সমর্থক’ দাবি করে জাসদ সভাপতি ইনু বলেন, “খালেদা জিয়া জঙ্গি, জামায়াত ও সাম্প্রদায়িকতার পক্ষ নিয়েছেন। জঙ্গির সঙ্গী ভয়ঙ্কর খুনিদের সিন্ডিকেট প্রধান খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে রাজনীতির অঙ্গন থেকে বর্জন করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের, মুক্তিযোদ্ধা সি আর দত্ত, অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, আওয়ামী লীগ নেতা অসীম কুমার উকিল এবং ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ বক্তব্য দেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান সকালে ঐক্য পরিষদের দুই দিনব্যাপী নবম জাতীয় ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে সম্মেলনে অংশ নেয়।

সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন শেষে বিকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। দ্বিতীয় দিন শনিবার কাউন্সিল অধিবেশন বসবে।

ওই দিন সমাপনী অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

সূত্র: বিডিনিউজ।