বাংলাদেশকে নতুন চোখে দেখছে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
গত এক দশকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তবে গত ৫-৬ দশকের হিসাব করলে চাহিদার তুলনায় এই বাণিজ্যের পরিমাণ খুব বেশি নয়। দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বাণিজ্যের পরিসর ও সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ানোর দাবি করলেও মূলত বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এখন যে সুসম্পর্ক বিরাজ করছে তার সুযোগ নিয়ে অতীত ভুলে আগামী দিনে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত করলে লাভবান হবে উভয় দেশ।

তারা বলছেন, গত দশক থেকেই স্পষ্ট দেখা গেছে, ভারতের উত্তর পূর্ব দিকের রাজ্যগুলোসহ পশ্চিমবঙ্গেও বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি নবমূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মানুষের ধারণা এখন আগের চেয়ে অনেকটাই ইতিবাচক। মূলত দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলগুলোর সম্পর্কোন্নয়নের কারণেই ভারতের মানুষের মানসিকতায় এমন পরিবর্তন এসেছে।

ভারতের আসাম ও উত্তরপূর্বের কয়েকটি রাজ্যগুলোসহ পশ্চিম বাংলাতেও বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশ’-এর বিষয়ে অভিযোগ থাকলেও পারস্পরিক সমঝোতার কারণে এখন এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বরং এখন আসাম বা পশ্চিম বাংলা তো বটেই, উত্তরপূর্বের বাকি ভারতীয় রাজ্যগুলোও ঢাকার সঙ্গে আরও বেশি ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর দাবি করছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এর মাধ্যমে দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে আদান-প্রদান, জিনিসপত্র কেনাবেচা ও আর্থিক লেনদেন এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ুক। এটি ইতিবাচক পরিবর্তন, সন্দেহ নেই।

ধারণা করা হচ্ছে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ, গত দশকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের বিশাল অর্থনৈতিক অগ্রগতি, যা গোটা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলকেই আগের চেয়ে উন্নত করতে সাহায্য করেছে।

ভারতের ব্যবসায় সংগঠনগুলো বলেছে, বাংলাদেশে তেল ও গ্যাসভিত্তিক নানা শিল্পের বিকাশ, বিদ্যুৎ ও আণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, জাহাজ নির্মাণ, বস্ত্রশিল্প, শিল্পের উন্নতি ও প্রসারের জন্য নতুন বন্দর, হাইওয়ে, সেতু ও বিমান চলাচলসহ বিশাল পরিকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা করা হয়েছে। অতীতের কয়েকশ’ বছরেও এশিয়ার এই অঞ্চলে এরকম সর্বাত্মক উন্নয়নের কোনও প্রচেষ্টা এত স্বল্প সময়ে আর হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নতুন বাংলাদেশ গড়ার বিশাল উপাদান। এই কারণেই বাংলাদেশ যে ২০২০-এর দশকে ‘স্বল্পোন্নত’ থেকে ‘মধ্যম আয়ের’ দেশের তালিকায় উঠে আসবে, তা পরিষ্কার। বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি ২৩০ বিলিয়ন ডলার (প্রাক্কলিত) হওয়ার অর্থ, এর অর্থনীতি আকারে ভারতের প্রথম চার-পাঁচটি উন্নত রাজ্যের পরেই। পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গের জিডিপি ১৫০ বিলিয়ন ডলারের সামান্য কম।

আর এ কারণে, ভারতের উত্তরপূর্ব দিকের রাজ্যগুলো এখন বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী। এতে সায় আছে কেন্দ্রীয় সরকারেরও। উদাহরণস্বরূপ, আসাম ২০১৭-তে গুয়াহাটিতে নতুন আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ১ হাজার কোটি রূপি দাবি করায় তাদের বলা হয়েছে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য ইত্যাদি বাড়িয়ে বাংলাদেশের মধ্য দিয়েই তারা দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যেতে পারবে, তাদের নিজেদের রফতানিযোগ্য নানা জিনিস পাঠাতে ও বিক্রি করতে পারবে। আর বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে ভারতের উত্তরপূর্বের সব রাজ্য নতুন করে আরও কিছু সীমান্ত হাট দাবি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে ভারতীয়রা বাংলাদেশিদের দেখতে চায় ট্যুরিস্ট হিসেবে, নানা জিনিসের ক্রেতা হিসেবে, অতিথি হিসেবে, ছাত্র হিসেবে, শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তারা নিজেরাও যেতে চায় বাংলাদেশে, ট্যুরিস্ট হিসেবে, ক্রেতা হিসেবে, সেখানকার সংস্কৃতি, শিল্প, কবিতা ও গান সম্পর্কে জানতে।

এছাড়াও মহিলাদের আর্থিক কর্মসংস্থান, শিশু শিক্ষা, শিশু স্বাস্থ্য, নারীদের লেখাপড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে। এসবই বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন মূল্যায়নের প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করেছে।

যদিও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়লেও ভারতের লাভের পাল্লা বেশি ভারি হবে কিন্তু, বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাণিজ্য সুবিধা অর্জন করতে পারাও একটি বিশাল সুবিধা। তথ্যসূত্র বলছে, ২০০৬ সালে দু’দেশের মোট বাণিজ্য ছিল ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০০৮-০৯ সালে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়নে। ধারণা করা হচ্ছে, এখন এই সংখ্যা ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন পেরিয়েছে, এর মধ্যে বাংলাদেশের বিক্রির ভাগ কম বেশি ৫৫০ বিলিয়ন।

ভারতের অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে বাণিজ্য ঘাটতি বড় ঠিকই, তবে বাংলাদেশও কিন্তু এখন ১২০ কোটি লোকের একটি বিশাল বাজার ধরতে পারছে। বাংলাদেশের জিনিস নিয়ে ট্রাক এখন শুধু কলকাতা নয়, দিল্লিতেও যায়। নেপাল বা ভুটানেও যাওয়া শুরু করেছে। সুতরাং অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই।

সূত্র: বাংলাট্রিবিউন।