চকরিয়া পৌরসভার ৪৭ কাউন্সিলর প্রার্থীদের ৪৪ জনই ব্যবসায়ী, মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোয়নি ৩৪ জন

নিজস্ব প্রতিনিধি, চকরিয়া।
কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভা নির্বাচনে নয় ওয়ার্ডের ৪৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৪৪ জনই নিজের পেশার কলামে উল্লেখ করেছেন ব্যবসায়ী।

এঁদের মধ্যে মাছ, সবজি, ঢেউটিন, গ্যারেজ ব্যবসায়ী ছাড়াও রয়েছেন চারজন ঠিকাদার। বাকি তিনজনের একজন সাংবাদিক, একজন আইনজীবী ও আরেকজন বেকার (গৃহস্তের কাজ করেন) রয়েছেন।

অন্যদিকে ৪৭ কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ৩৪ জনই মাধ্যমিকের গন্ডি পেরোতে পারেননি। এঁদের মধ্যে ২৩ জন স্বশিক্ষিত, দুইজন পঞ্চম শ্রেণি, ৮ জন অষ্টম শ্রেণি ও একজন চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনে চকরিয়া পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মেছবাহ উদ্দিনের কাছে কাউন্সিলর প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

হলফনামা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২৩ জন প্রার্থী নিজেদের স্বশিক্ষিত ঘোষনা করেছেন। তাঁরা হলেন নুর হোসেন, সাহাবউদ্দিন, মকছুদুল হক মধু, রেজাউল করিম, মো. সাইফুল ইসলাম, নুরুল আমিন, আবুল কালাম, মো. শফি, জসিম উদ্দিন আহমদ, জহিরুল ইসলাম, জাফর আলম, জিয়াবুল হক, গোলাম কাদের, নুরুল আমিন, জামাল উদ্দিন, মো. সালাহউদ্দিন, মো. আবুল হোছন, জয়নাল, মো. সেলিম, মো. হাসান উল্লাহ কাইছার, ফরিদুল আলম, নজরুল ইসলামও হুমায়ুন কবির।

চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন সাইফুল ইসলাম।

নিজেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস ঘোষনা করেছেন দুইজন। তাঁরা হলেন আক্কাস আহমদ ও ফোরকানুল ইসলাম।

অষ্টমশ্রেণি পাস করেছেন আটজন প্রার্থী। তাঁরা হলেন নুরুস শফি, মো. বশিরুল আইয়ুব, ফুরকানুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, জালাল উদ্দিন, বেলাল উদ্দিন, শিব্বির আহমদ ও আনোয়ার হোছাইন।

এসএসসি বা তার সমমান পরীক্ষায় পাস করেছেন এরকম আছেন তিনজন জালাল উদ্দিন, হেলাল উদ্দিন ও এনামুল হক।

এছাড়া এইচএসসি বা তার সমমান পরীক্ষায় পাস করেছেন আশেকুর রহমান, ফরিদুল ইসলাম, মো. জাফর আলম, জসিম উদ্দিন, জয়নাল আবেদিন, মো. মুজিবুল হক ও বেলাল উদ্দিন।

স্নাতক পাস করেছেন মাত্র তিনজন প্রার্থী। এর মধ্যে রয়েছেন ১ নম্বর ওয়ার্ডের মনোহর আলম, ২ নম্বর ওয়ার্ডের মিজবাউল হক ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. শহিদুল ইসলাম ফোরকান।

৪৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে পেশার কলামে ৪৪ জন প্রার্থী নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এর মধ্যে চারজন ঠিকাদারী ব্যবসা করেন। তাঁরা হলেন আক্কাস আহমদ, জয়নাল আবেদিন, মো. মুজিবুল হক ও হুমায়ুন কবির।

অন্য ৪০ জন সরাসরি ব্যবসায়ী। এ ছাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মনোহর আলম আইনজীবী, ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মিজবাউল হক সাংবাদিক ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মো. হাসান উল্লাহ কাইছার বেকার (গৃহস্তের কাজ করেন)।

৪৭ জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে ২৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালত ও থানায় মামলা রয়েছে। তিনজনের বিরুদ্ধে অতীতে মামলা থাকলেও বর্তমানে তাঁরা সব মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

অন্য ১৭ জনের বিরুদ্ধে কখনো কোনো আদালত কিংবা থানায় মামলা হয়নি। পাঁচটির বেশি মামলা রয়েছে ছয়জনের। এরমধ্যে ২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর নুরুল আমিনের রয়েছে ১৫ টি মামলা। ইতিমেধ্যে তিনি তিনটি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের ফোরকানুল ইসলামের মামলা রয়েছে ১২ টি। তিনি ছয়টি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

৬ নম্বর ওয়ার্ডের শিব্বির আহমদের আছে ১১ টি মামলা, খালাস পেয়েছেন সাতটি মামলা থেকে।

৮ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর শহিদুল ইসলামের ফোরকানের রয়েছে সাতটি মামলা। বর্তমানে এসব মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সেলিমের রয়েছে সাতটি মামলা। তিনি একটি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

১ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর নুর হোসেনের রয়েছে ছয়টি মামলা। তিনিও একটি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

এই ছয়জন কাউন্সিলর প্রার্থীর মধ্যে নুর হোসেন ও ফোরকানুল ইসলাম সম্প্রতি বিএনপি থেকে আওয়ামীলীগে যোগ দিয়েছেন। অন্য চারজন এখনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

জানতে চাইলে ২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর নুরুল আমিন আমাদের রামুকে বলেন, ‘আমার সব মামলার বাদি আওয়ামীলীগের লোকজন ও পুলিশ। অপরাধ না করলেও প্রতিহিংস্বা ও হয়রানি করতে তাঁরা এসব মামলা দায়ের করেছেন।’

বাকি ২১ জনের এক থেকে চারটি করে মোট ৩১ টি মামলা রয়েছে।

জানতে চাইলে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহিরুল ইসলাম খানেআমাদের রামুকে বলেন, ‘প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা থাকতেই পারে। তবে আমরা যতটুকু জেনেছে সব প্রার্থী তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় জামিনে রয়েছেন। জামিনে থাকলে তাঁদের প্রচারণা চালাতে কোনো সমস্যা নেই।’

জানতে চাইলে সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) চকরিয়া উপজেলা সভাপতি ও ডুলাহাজারা কলেজের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী আমাদের রামুকে বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে শিক্ষিত মানুষের হার খুব কম। বাংলাদেশের পরিবেশ পরিস্থিতিতে সততা ও নৈতিকতার কোনো মূল্য না থাকায় শিক্ষিত ও ভালো মানুষেরা নিজেকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রেখেছেন। সমাজে সুশাসন প্রতিষ্টার স্বার্থে শিক্ষিত ও ভালো মানুষ যাতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন, সেই চেষ্টা আমাদের থাকতে হবে। ব্যবসায়ীদেরও ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি থেকে বের হয়ে জনগণের সেবক হতে হবে।’

২০ সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের হলফনামা
হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০ জন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের মধ্যে পাঁচজন স্বশিক্ষিত, চারজন অষ্টমশ্রেণি, ছয়জন এসএসসি, দুইজন এইচএসসি ও তিনজন স্নাতক পাস।

পেশার কলামের ১২ জন উল্লেখ করেছেন গৃহিনী হিসেবে। একজন মাছ চাষ করেন। তিনজন লাইফ ইন্স্যুরেন্সে, দুইজন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একলাবে ও দুইজন ব্র্যাক পরিচালিত শিখন স্কুলে চাকরি করেন।

২০ জনের মধ্যে ১৮ জনের কোনো মামলা নেই। দুইজনের মধ্যে ৭, ৮, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর আনজুমান আরা বেগমের চারটি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে একটি মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। আরেকজন ৪, ৫, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জেসমিন হক জেসির একটি মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।