স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর জানা গেল রামুর গৃহবধূ দিপালী বড়ুয়ার কীর্তি

তাসনীম হাসান:
দিপালী বড়ুয়া। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নেন নি বটে। কিন্তু অন্তরালে এই নারীর অবদানটা এতই অসামান্য যে কোনো অংশেই মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে কম বলা যাবে না। ৭১ এর দিনগুলোতে তিনি ছিলেন কক্সবাজারের রামু উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের ‘প্রাণ’। বিপদের সময়ে তাদের আশ্রয় দেওয়া, পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে আগলে রাখা-কী নেই তার অবদানের হিসেবে?

তাই আশপাশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হতে দেখে, স্বীকৃতি হিসেবে সার্টিফিকেট মিলতে দেখে দিপালী বড়ুয়াকে তার ঘনিষ্ঠজনদের কেউ কেউ বলেছিলেন ‘‘মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য আবেদন করুন, একটা মুক্তিযুদ্ধ সনদ থাকলে সন্তানদের চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধে হবে।’’

কিন্তু এসব আমলে না নিয়ে দিপালী বড়ুয়ার চূড়ান্ত নির্বিকার উক্তি, ‘আমার এসবের দরকার নেই, দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই বড় স্বীকৃতি।’

হয়তো স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও আড়ালেই থেকে যেত দিপালী বড়ুয়ার কীর্তি। কিন্তু এই পড়ন্ত বয়সে তাকে সামনে নিয়ে এসেছেন সেই দিনগুলোতে তার সহায়তা পাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা। তাও ঘটনাচক্রে।

১৫ জানুয়ারি (রোববার) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি নির্মান করে দেওয়া প্রকল্পের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের রামুতে বীর মুক্তিযোদ্ধা রমেশ বড়ুয়াকে নির্মাণ করে দেওয়া ‘বীর নিবাস’ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠান ছিল।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন রামু-কক্সবাজার আসনের সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

সেই অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা রমেশ বড়ুয়া বলেন, ‘যুদ্ধচলাকালীন সময়ে আমি প্রচণ্ডভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। গ্রামের এক কোনার এক বাড়িতে অত্যন্ত গোপনে আমি আশ্রয় নিয়েছিলাম। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে তার খবর চলে যায় পাকিস্তানী দোসরদের কাছে। খুব অনিরাপদ বোধ করতে লাগলাম আমি। চারদিকে যখন ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজছিল, ভয়ে কেউ যখন আমার বিপদে এগিয়ে আসছিল না তখন দিপালী বড়ুয়া নামের এক নারী আমাকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘দিপালী বড়ুয়া আমাকে বোরকা পরিয়ে নিজেও বোরকা পরিধান করে পার্বত্য এলাকার দূর্গম সোনাইছড়ির রাস্তা দিয়ে প্রায় ২৬ কিলোমিটার পথ পাঁয়ে হেটে সেদিন তার বাপের বাড়িতে নিয়ে যান। সেই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে আশ্রয় দিতে সবাই ভয় পেতেন। দিপালীর বাবাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু তিনি তার বাবাকে বুঝিয়ে রাজী করালেন দিপালী বড়ুয়া। আমি সেখানে ২২দিন থেকে সুস্থ হওয়ার পর আবার যুদ্ধে ফিরে গিয়েছিলাম।’

স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলেন রমেশ বড়ুয়া। সেই কান্না নিয়ে বলতে থাকেন, ‘দিপালী বড়ুয়া সেদিন এগিয়ে না আসলে হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশ আমার দেখা হত না।’

Dipali Barua-2 - Copy
পরিবারের সাথে আনন্দঘন মুহূর্তে দিপালী বড়ুয়া

অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ উপজেলা কমান্ডার নুরুল হক বলেন, ‘যুদ্ধকালীন সময়ে আমাদের প্রাক্তন সাংসদ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মরহুম ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী ও দিপালী বড়ুয়ার বাপের বাড়িতে ছিলাম কিছুদিন।দিপালীর বড়ুয়ার বাবার বাড়িতে আমি সহ ৮ থেকে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে তিনি রান্না করে খাওয়াতেন।’

মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে দিপালী বড়ুয়ার অবদানের কথা শুনে তাকে অনুষ্ঠানে ডেকে আনেন সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল। পরে দিপালী বড়ুয়া অনুষ্ঠানস্থলে আসলে তিনি তার মুখ থেকে ৭১ এর সেই দিনগুলোর কথা শুনেন। পরে তাকে সম্মাননা জানান সাংসদ।

দিপালী বড়ুয়ার ছেলে রতন বড়ুয়া বলেন, ‘আমার মা সবসময় চাপা স্বভাবের, মেরুদণ্ডের হাঁড় বেঁকে যাওয়ায় সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না অনেক দিন থেকে। মা আমাদের কখনো বলেন নি তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবে সহায়তা করেছিলেন। আমরা শুধু জানতাম মুক্তিযুদ্ধের সময় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নানা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মা তাদের রান্না করে খাওয়াইছিলেন। কিন্তু রোববার মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে আমার মায়ের এত অবদানের কথা শুনে গর্বে বুক ভরে গেল।’

তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মায়ের কীর্তি সম্পর্কে শোনার পর মাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম ‘মা তুমি কোনো স্বীকৃতি নাও নি কেনো?’’ তার জবাবে মা বলেছেন দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই আমার স্বীকৃতি।’