‘সাংবাদিকতায় আসতে হবে প্রস্তুতি নিয়েই’

একজন সংবাদকর্মীর প্রতিদিনের পেশাগত চ্যালেঞ্জগুলো আগামী দিনের সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেছেন, যারা আগ্রহী তাদের প্রস্তুতি নিয়েই এ পেশায় আসা উচিৎ।

৩ মার্চ বৃহস্পতিবার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে ‘মিট দ্য এডিটর’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, সাংবাদিকতা ‘দুর্বলচিত্তের মানুষের’ কাজ নয়।

“এমন পেশায় যেও না, যা তুমি উপভোগ করতে পারবে না। সাংবাদিকতার জন্য যদি প্যাশন না থাকে, তাহলে সাংবাদিক হওয়া উচিৎ নয়। যদি তুমি নিয়মিত ফ্যামিলি ডিনারে অংশ নিতে চাও, তাহলে সাংবাদিকতা তোমার পেশা নয়।”

বাংলাদেশের প্রথম দ্বিভাষিক ইন্টারনেট সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক বলেন, একটি কর্মক্লান্ত দিনের পর মধ্যরাতেও যদি বড় কিছু ঘটে যায়, সংবাদকর্মীকে সেখানে ছুটে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে।

“যদি তুমি তোমার প্রিয় ভাগ্নির জন্মদিনের পার্টি মিস করতে রাজি না হও, তাহলে সাংবাদিকতা তোমার জন্য সঠিক পছন্দ নয়,” শিক্ষার্থীদের বলেন তিনি।

আলোচনার এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের নানা প্রশ্নের জবাব দিয়ে তাদের কৌতূহল মেটান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক।

চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ময়ূখ ইসলাম বলেন, মানুষ এখনও অনলাইন সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের বলে- ‘তুমি পত্রিকায় কাজ করতে পার না?’ আবার অন্যদিকে বলা হয়, প্রিন্ট সংবাদ মাধ্যম নাকি মারা যাচ্ছে। এটা কীভাবে সম্ভব?

জবাব দিতে গিয়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী তাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন- এ ধরনের প্রশ্নকারীর সংখ্যা কত?

বিটিআরসির তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ৫০ মিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তাদের ১০ শতাংশ মানুষও যদি নিউজ সাইটে যায়, তাহলে সংখ্যাটা হয় ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ। অন্যদিকে বাংলাদেশের সব মুদ্রিত পত্রিকার সম্মিলিত প্রচার সংখ্যা দশ লাখও নয়।

দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসকিন আল আনাসের প্রশ্নের জবাবে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “পৃথিবীতে কেউ নিরপেক্ষ নয়, আমিও নিরপেক্ষ নই। তবে বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা দুটো ভিন্ন বিষয়।

“একটি মৌলবাদী দল যখন সমাজকে অস্থির করার চেষ্টা করবে, তখন আমরা বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে সে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশ করব। সেখানে আমরা তাদের সমর্থন করব না।”

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অর্থসঙ্কটে পড়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন কি-না, এমন প্রশ্নও আসে শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে।

জবাবে তৌফিক ইমরোজ খালিদী সেই সময়ে ছড়িয়ে পড়া এ গুজবের পেছনের ঘটনাটি তুলে ধরেন।

“এ রকম কোনো আলোচনা, দর কষাকষি কারও সাথে হয়নি। তবে এক বন্ধু, যিনি অন্য একটি সংবাদ মাধ্যমের মালিক, আমার সঙ্গে লাঞ্চ করতে এসেছিলেন একদিন। সেখান থেকে ফিরে তিনি তার সহকর্মীদের বলেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বিক্রি হচ্ছে, তৌফিকের সঙ্গে কথা হয়েছে।

“পরে আমি তার অফিস থেকেও ফোন পেয়েছিলাম। এভাবেই বিষয়টা ছড়িয়েছে।”

সেনা নিয়ন্ত্রিত অনির্বাচিত সরকারের অধীনে সাংবাদিকতার জন্য ‘কঠিন’ সেই সময়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের অভিজ্ঞতার কথাও তিনি এ সময়ের তরুণদের সামনে তুলে ধরেন।

“আমরা তখন ভোগান্তির মুখে পড়েছি; এরপরও আমরা কাজকে উপভোগ করেছি। সে সময় আমরা বিকশিত হয়েছি, আমরা দেশের সবচেয়ে বড় সংবাদ পরিবেশকে পরিণত হয়েছি।”

সেই সময় অতিক্রম করে এসে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আজকের পরিকল্পনার বিষয়েও ইংগিত দেন প্রধান সম্পাদক।

“আজ আমি ছোট একটা তথ্য প্রকাশ করতে চাই। বড় একটি বেসরকারি ইকুইটি ফার্ম প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। আমরা তাদের সঙ্গে নেগোশিয়েট করেছি। কারণ আমরা আরও বিস্তৃত হতে চাই। আমরা এ প্রতিষ্ঠানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই।”

সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এর দেওয়া তথ্য যাচাই না করে ছাপার যে স্বীকারোক্তি সম্প্রতি ডেইলি স্টার সম্পাদক দিয়েছেন, তাতে সার্বিকভাবে সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে কি না- এমন প্রশ্নও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সামনে আসে।

02_ULAB_Meet+th
                                                                              প্রশ্ন করছেন এক শিক্ষার্থী

উত্তরে তিনি বলেন, “কোন মিডিয়া কখন তার বিশ্বাস নিয়ে থাকবে, কখন কেউ বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে তা তাদের সম্পাদকীয় নেতৃত্ব, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। মানুষ সবার উপর থেকে বিশ্বাস হারাচ্ছে না। ডেইলি স্টারও সব কাজ খারাপ করেনি।”

আলোচনার এ পর্যায়ে এসে সাংবাদিকতার তরুণ শিক্ষার্থীদের এ দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমের ইতিহাস ভালোভাবে জানার ওপর গুরুত্ব দেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

“গণমাধ্যমের ইতিহাস একটু জটিল। কারণ এখানে অনেক প্লেয়ার আছে। তবে সেই সময় ডেইলি স্টার একা ছাপেনি, এটা সত্যি কথা।”

গণমাধ্যমের কাজ আসলে কোনটি- সে বিষয়টিও শিক্ষার্থীদের বুঝে নিতে বলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক।

“ইন্ডিয়াতে ( এক অনুষ্ঠানে) আমাকে বলা হল, আমাদের নাকি কন্সট্রাকটিভ হতে হবে। উই হ্যাভ টু প্রোমোট ফ্রেন্ডশিপ বিটুইন….. (আমি বলেছি), না না, এটা আমাদের কাজ নয়; রাজনীতিবিদরা এটা করবে। আমরা সেটাকে কভার করব, বিশ্লেষণ করব।”

“ডেইলি স্টার যে কাজটা ভুল করেছিল বলে আমার মনে হয়েছে, সেটা হল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত হওয়ার চেষ্টা করেছিল।”

পেশাদারিত্বের উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “আমরা সমালোচনা করব, আমরা ভুলগুলো ধরব। আমরা নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করব। ইতিবাচক ও নেতিবাচক নির্দেশনা সেখান থেকে বের হয়ে আসবে। পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই।”

জরুরি অবস্থার আগে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও আসে শ্রোতাদের প্রশ্নে।

এই সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের উত্তরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, ২০০৬ সালের আগে যোগ্য প্রার্থী আন্দোলনে কারা কারা ছিলেন, তা অনেকেরই জানা। সেটি ছিল রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ, যা সমর্থনযোগ্য ছিল না।

“১১ তারিখের (২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি) পর প্রতিদিন সকালে সেনাপ্রধানের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে যেতেন দুজন সম্পাদক। আমরা জানতাম সেটা। আমার এক কলিগ বলেছিলেন, সেনাপ্রধানের সঙ্গে একটি মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য মাহফুজ আনাম অন্যদের ফোন করেছিলেন। এটা সাংবাদিকের কাজ নয়।”

তিনি বলেন, ওই ঘটনা নিয়ে এখন রাজনীতি হচ্ছে, কিন্তু সাংবাদিকতার মৌল নীতিমালা নিয়ে কথা কমই হচ্ছে।

“আসলে ভুলগুলো কোথায় ছিল? এডিটোরিয়াল প্রোসেসে সমস্যা ছিল?

“আমি স্বীকার করি, আমরা ভুল করি। আমাদের ইংরেজি সাইট দেখে মাঝে মাঝে আমার খুব একটা ভালো লাগে না। ভুলও থাকে। কিন্তু তথ্যের বিকৃতি করা যাবে না। তথ্যের যাচাই বাছাই না করে ছাপা যাবে না। সেটার একটা প্রক্রিয়া আছে।”

একাধিক সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়া, তা সম্ভব না হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন, সংবাদ প্রকাশে প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে ভুল করার ঝুঁকি- এসব বিষয় নিয়েও কথা বলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদক।

“আমরা সব সময় প্রথম হতে চাই না। আমরা সব সময় সঠিক হতে চাই। সব সময় সঠিক হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।”

সংবাদে তথ্যে যথার্থতার উপর সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, “যথার্থতাই চাবিকাঠি, তুমি যদি যথার্থ না হও, তুমি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।

“স্পষ্টভাবে সোর্সকে উল্লেখ করতে হবে। সোর্সের নির্ভরযোগ্যতা এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। যদি সোর্সকে নাম উল্লেখ ছাড়া রাখতে হয়, তাহলে তোমার পাঠককে জানতে দিতে হবে, কেন তুমি সেটা করছ।”

অপরাধের শিকার শিশু, কিশোর, নারীদের বিষয়ে সংবেদনশীল হওয়ার কথাও বলেন তিন দশক ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে তিনি বলেন, “স্বাধীনতা থাকা এক বিষয়, আর সেটাকে ব্যবহার করার সামর্থ্য অন্য বিষয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমরা (গণমাধ্যম) অপেক্ষাকৃত মুক্ত।

“আমাদের অনেক কলিগ বলতে চেষ্টা করেন, বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম মুক্ত নয়। সমস্যাটা আসলে মালিকানায়।…রাষ্ট্র যেভাবে গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা করতে চায়, রাজনীতিকরা যেভাবে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল মালিকদের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, সমস্যাটা সেখানে।”

“যদি রাজনীতিকরা চায় সকল প্রধান সংবাদ মাধ্যমের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় শেডি রেকর্ডের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে, তাহলে মিডিয়া এর চেয়ে বেশি কিছু করতে পারবে না।”

ইউল্যাবের সেন্টার ফর ল্যাঙ্গুয়েজ স্টাডিজের পরিচালক এটিএম সাজেদুল হক জানতে চান, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়োগ পেতে হলে কোন ধরনের ভাষাভিত্তিক যোগ্যতার প্রয়োজন হয়।

জবাবে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, সম্ভাব্য সবচেয়ে সহজ ভাষায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সাংবাদিকতা। শিরোনাম, টিজার বা খবরের কপি লেখার ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের দক্ষতা তৈরি হতে হয়, সেজন্য প্যাশন থাকতে হয়। যে সবচেয়ে সহজ ভাষায় গল্প বলতে পারে, তার পক্ষে এ কাজ সম্ভব।

“আপনাকে এটা উপভোগ করতে হবে। একবার আমি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া সাংবাদিকতার এক অধ্যাপককে নিয়োগ দিয়েছিলাম। ১৮ দিন পর তিনি আমাকে ইমেইল করে জানালেন, এ কাজের চাপ তিনি আর নিতে পারছেন না। আবার অনেক তরুণও দ্রুত স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠতে পারেন। সব পেশারই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ও সমস্যা রয়েছে।”

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ইমরান রহমান শিক্ষার্থীদের সামনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলেন, “আজ এমন একজন ব্যক্তি এখানে উপস্থিত হয়েছেন, যিনি দেশে ইন্টারনেট ও এসএমএসের মাধ্যমে খবর সরবরাহের অন্যতম অগ্রদূত। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সময়কে সামনে রেখে আজ তিনি এখানে কথা বলতে এসেছেন।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সম্পাদকের বক্তব্যের পর এক সময় সাংবাদিকতা পেশায় থাকা আসিউজ্জামান বলেন, “তার বক্তব্য আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ১৯৯১ সালে। সম্ভবত আমরা দুজনেই একই সংবাদকক্ষে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম। তিনি ফরেন অফিস কভার করতেন, আর আমি সংসদ ও রাজনীতি।

“সেই সময় মোবাইল ফোন ছিল না। যে টাইপ রাইটারে আমি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম, সেটা এখনো আমার কাছে আছে। সেটা দেখে এখন হয়তো তোমাদের মনে হবে, এটা আঙুলের ব্যায়ামের একটা কিছু।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বক্তব্যের সূত্র ধরে ইউল্যাবের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান জুড উইলিয়াম আর জেনিলো শিক্ষার্থীদের বলেন, “পেশাগত জীবনে সাংবাদিক হতে হলে তোমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ত্যাগ স্বীকারের এই ধাপ সাংবাদিক হওয়ার পরে শুরু হবে না। শিক্ষার্থী হিসেবে এটা এখনই শুরু করতে হবে।”

বিডিনিউজ থেকে নেয়া