মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা

রহমতের স্বাধীনতা:
তখনো ওঠেনি লাল সূর্য।
ডিমের লালির মতো টলটলে লাল।
তরমুজ-ফালির মতো তরতাজা লাল।

কুয়াশায় জমে আছে পানের বরজ।
শিশিরের ফোটা জমে আছে সেগুন পাতায়।
বানর-বানরী গায়ে গা লাগিয়ে গতরে গরম জমায়।
বনমোরগ ঘাড় বাঁকিয়ে বনমুরগীর দিকে তাকায়।
চূড়া ছেড়ে তরতর ছুটে চলে পাহাড়ি ঝর্নাধারা।
রাতজাগা পাখি হঠাৎ ডানা ঝাপটায়।

তরঙ্গিত মুরুংবালার আদলে গতর বাগিয়ে
পুবদিগন্ত আড়াল করে শুয়ে আছে
হাজার-এক রজনীর সাক্ষী লুসাই পাহাড়।
না, কোটি বছরেও বাঁকা হয়নি তার ঘাড়।

তবে ঈষৎ বাঁকা হয়ে গেছে রহমতের শরীর।
এখনো তিনকুড়ি হয়নি তার বয়স।
কিন্তু দুনিয়াটা যেন দেখছে হাজারকুড়ি বছর ধরে।
দেখতে দেখতে তার পেটানো শরীরেও নামছে ধস।

এককালের কিশোর, এখন প্রৌঢ় রহমত।
সে কিন্তু গা করে না কালের ধকল।
বালিকুচির ওপর পা ফেলে ফেলে
সে এগিয়ে যায় দরিয়ার দিকে।

গোঁয়াখালির নুন্যাছড়ি ছেড়ে মৈনপাহাড়।
তারপর নাফ সাঁতরিয়ে মংডু।
তারপর শাম্পানে-শাম্পানে দরিয়াপাড়ি।
তারপর এই জলটিপ সোনাদিয়া।
তারপর এইতো তার দুনিয়াবাড়ি।
আহা, এইতো তার
এইজন্মের মুক্তস্বাধীন জমিদারি!

নিত্যদিনের ভোরবেলার মতো
রহমত মৈনপাহাড়ের চূড়ায় চোখ রেখে
খালি পায়ে হাঁটছে দরিয়ার মউজের দিকে।
ঠিক প্রথম সূর্যরশ্মি ফোটার সঙ্গে সঙ্গে
রহমত স্পর্শ করবে দরিয়ার নোনাজল।
জল তো নয়, যেন কোটি কোটি বছরের
পিপাসার্ত দরিয়ার চিবুক।
তারপর সেই নোনাজল
ছিটাতে শুরু করবে সূর্যের দিকে।
যেন সূর্য এক মঙ্গলঘট।
যেন সূর্য এক মোরগঝুঁটি।
যেন সূর্য এক আরাধনার লাল জবা।
যেন একমাত্র এই সূর্য-ই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অমরাত্না।

তারপর
জল, রশ্মি আর দৃষ্টি এক রেখায় টেনে
নুয়ে-পড়া শরীরটা টান টান করে
পুব-পশ্চিমের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে
ডানা ছড়ানোর ভঙ্গিতে হাতদুটো মেলে ধরে
জলস্থলনভোনীলের ঘুরন্তমানুষ রহমত।

তারপর বলে:
আমারও হুঁশ আছে হুঁশ,
আমি এক দরিয়ামানুষ;
আমি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মতো জন্মস্বাধীন;
এই বঙ্গদরিয়ার জলে ডানামেলা
গঙ্গাকইতরের মতো উড়ন্ত-স্বাধীন।

আমি কারো অধীন নই,
কেউ নয় আমার অধীন।