বিজয় এসেছে প্রয়োজন মুক্তি

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু:

আজ বাঙ্গালির বিজয় উৎসবের দিন। রাত বারটার অপেক্ষায় ছিল গোটা বাংলাদেশ। জেগে ছিল সমগ্র জাতি। যে জাতি স্বাধীনতা পেতে এত ত্যাগ স্বীকার করতে পারে বিজয়ের উল্লাস সত্যি তাদের সাজে।

এদেশের মানুষ সব সময় শোষিত এবং নির্যাতিত হয়ে এসেছে। তবে শোষণ আর নির্যাতন যেমন যন্ত্রনা দেয় তেমন মুক্তির পথ ও দেখায়। সংসারে অভাব আছে বলে মানুষ অভাব মোচনের চেষ্টা করে, দুঃখ আছে বলে সুখের সন্ধান করে। শোষণ – নির্যাতন মানুষকে স্বাধীনতার কথা ভাবতে বাধ্য করে। বিশ্বমানের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদী প্রথার বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করে সফল হতে পেরেছেন শ্বেতকায়রা আফ্রিকানদের শোষণ – নির্যাতন করত বলে।

তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার এবং সেদেশের রাষ্ট্রীয় বাহিনী বাংলা ভাষাভাষী জনগণের উপর শোষণ – নির্যাতন না করলে অখন্ড পাকিস্তান এত সহজে বিভক্ত হতো কিনা বলা দায়। স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন চোখে শুধু শুধু ধরেনি। সকল প্রকার শোষণ – নির্যাতন থেকে মুক্তি, আপন ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার চিন্তা-চেতনা থেকেই এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন ভূখন্ডের জন্ম হয়েছে যার নাম বাংলাদেশ। আমাদের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা, তাই আমাদের দেশের নামটাও বাংলাদেশ। জাতি হিসেবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই বাংলা ভাষাভাষী। নাগরিক পরিচয়ে আমরা সবাই বাংলাদেশী।

এখন কথা হল, যেটি স্বাধীনতা যুদ্ধ সেটি মুক্তিযুদ্ধ কিনা ? স্বাধীন হলে পরে মুক্ত হওয়া যায় কিনা ? ‘৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ হল ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ এবং ভাষার দুইটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোন ভূখন্ড অখন্ড রাখা আর আলাদা করার সর্বাত্নক চেষ্ঠা। তাই অনেকে বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের যুদ্ধ’। জাতির পিতার কালজয়ী উক্তি-“এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম” তাহলে তিনি কী স্বাধীনতা এবং মুক্তিকে আলাদা করে দেখেছিলেন ? বাস্তবতায়ও তাই।

একটি স্বতন্ত্র মানচিত্র, পতাকা, রাষ্ট গঠন করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন অথন্ড ভূখন্ডের পূর্ণ স্বাধীনতা। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই একখন্ড ভূখন্ড স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত। এই ভূখন্ডের মানচিত্র, পতাকা, ভাষা, সবকিছুই পাকিস্তান থেকে আলাদা। এদেশ এখন পুর্ব পাকিস্তান নয়; স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামে পরিচিতি পেয়েছে বিশ্ব মানচিত্রে। এখন ভারত কিংবা পাকিস্তান কোন দেশের পরাধীন নয় বাংলাদেশ। এর নাম দেশের স্বাধীনতা।

আমাদের শোষণ-নির্যাতন মুক্তিও প্রয়োজন ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিলো স্বাধীনতা আসলে পরে মুক্তিও মিলবে। প্রথম লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছে। এখন এদেশের মানুষের উপর কোন ধরনের বৈদেশিক শোষণ- নির্যাতন নেই। তবে পরিপূর্ণ মুক্তি এখনও আসেনি। ক্ষুধা, দারিদ্র, দুর্নীতি, নিরক্ষতা ,সাম্প্রদায়িকতা এবং নাগরিক বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভে আমরা এখনও শতভাগ সফল নই।

স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ সাড়ে চার দশক সময় পাড়ি দিয়ে অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশ যেখানে উঠে এসেছে তাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে এটা চুড়ান্ত উন্নতি নয়।

দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ কোন দল বা নেতৃত্বের প্রয়োজন হয় বটে কিন্তু দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতি, ধর্ম, দল-মত নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণ এবং সর্বাত্নক সহযোগিতা প্রয়োজন। তবেই একটি দেশ কিংবা একটি জাতি প্রগতির রাজ্যে আরোহণ করতে পারে।

মহান বিজয় দিবসে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জানাই অশেষ শ্রদ্ধা এবং সকল শহীদদের পারলোকিক সদগতি কামনা করছি।

বিজয়ের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবার প্রাণে, জনে জনে।

জয় বাংলা, বাংলাদেশ চিরজীবি হউক।