সাঁওতালদের জমির দাবির সত্যতা মিলেছে

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রংপুর চিনিকল এলাকায় সাঁওতালদের জমির দাবির সত্যতা মিলেছে। জমি নিয়ে সাঁওতালদের ওপর হামলার ঘটনায় গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির গোপন প্রতিবেদনে এ দাবির সত্যতা উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে সাঁওতালদের দাবির বিষয়ে অবহিত থাকার পরেও চিনিকল ব্যবস্থাপক ও শিল্প সচিবের নির্লিপ্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে।রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।

রংপুর চিনিকলের অধিগ্রহণ করা জমি নিয়ে গত ৬ নভেম্বর সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন ও হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার পর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সাঁওতালরা। এসময় সাঁওতালদের সঙ্গে স্থানীয়রাও যোগ দেয়। এ ঘটনার পর এ বিষয়ে একটি প্রশাসনিক তদন্ত হয়। গত ২৮ নভেম্বর প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির ২৪ পাতার প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদ। ওই প্রতিবেদনে চিনিকলের জমির ওপরে সাঁওতালদের দাবির কথা একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে।

২৪ পাতার ওই প্রতিবেদনে ২০১৫ সালের ২১ জুন জেলা প্রশাসককে দেওয়া গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর আরেকটি গোপন প্রতিবেদন নথি হিসেবে যুক্ত করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চিনিকলের জমিতে ‘আখ ছাড়াও ধান, তামাক ও রবি শস্য আবাদ করা হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত: ১৯৬২ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকল প্রতিষ্ঠার সময় সেখানে সাঁওতাল ও স্থানীয়দের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। সাঁওতালদের সঙ্গে সেসময় আপোসরফায় উল্লেখ করা হয়েছিল, যদি এসব জমিতে আখ চাষের আর প্রয়োজন না হয় বা অন্য কোনও ফসল চাষাবাদ করা হয় তবে সাঁওতালরা তাদের জমি ফেরত পাওয়ার দাবিদার হবে। এই শর্ত সাপেক্ষে সেখানে এক হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন। শর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অধিগ্রহণ করা এসব জমিতে আখ চাষ করতেই হবে। যদি আখ চাষ না করা হয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা তাদের জমি ফেরত পাবেন। এরপর ২০০৪ সালে বিরাষ্ট্রীয়করণ নীতিমালার আওতায় রংপুর চিনিকল সরকার লে-অফ ঘোষণা করলে জমি ফেরত পাওয়ার বিষয়ে প্রথম সরব হয়ে ওঠে সাঁওতালরা। তবে চিনিকলটি ২০০৬ সালে আবার চালু করা হলে এ দাবি খানিকটা স্তিমিত হতে থাকে। কিন্তু, চিনিকলটি অব্যাহতভাবে লোকসান দিতে থাকলে এ ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সেসময় চিনিকলের ৮০ শতাংশ জমিতে আখ চাষের শর্ত দিয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ একর জমি লিজ দেওয়া হয়। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যায় লিজগ্রহীতারা এ শর্ত ভঙ্গ করে ৮০ শতাংশ জমিতে আখ চাষের বদলে অন্য ফসল ও শস্য চাষ করতে থাকে। এর ফলে ফুঁসে উঠতে থাকে সাঁওতাল ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয়রা। তারা শর্তভঙ্গের দাবিতে পৈত্রিক সম্পত্তি ফের চায় চিনিকলের কাছে।

জানা গেছে, সাঁওতাল ও স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের অব্যাহত দাবি ও চাপের মুখে ২০১৫ সালে এই লিজপ্রথা বাতিল করে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। এদিকে, জমি ফিরে পাওয়ার দাবিতে সাঁওতালসহ স্থানীয়দের আন্দোলনও তীব্র হতে থাকে। এরপর পৈত্রিক জমি ফেরতের দাবিতে সাঁওতালদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও চিনিকল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়।

সাঁওতালদের জমি ফেরত দাবির আবেদনের প্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে উপস্থাপিত গোপন ওই প্রতিবেদনে নথি হিসেবে জমা দেওয়া অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের ২০১৫ সালের প্রতিবেদনের মতামত অংশে বলা হয়েছে,‘রংপুর সুগার মিল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আবেদনকারীর বক্তব্য এবং দাখিলকৃত কাগজপত্র পর্যালোচনায় আবেদনকারীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।’ বলাবাহুল্য, আবেদনকারী বলতে এখানে সাঁওতাল ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয়দের বোঝানো হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘রংপুর সুগার মিল কর্তৃপক্ষ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের আলোকে লিজ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং ইক্ষু ও অন্যান্য ফসল আবাদ করে আসছেন।’ ফলে চিনিকলের জমিতে লিজ দেওয়ার সময় জমি অধিগ্রহণের মূল শর্ত ভঙ্গ করে আখের সঙ্গে অন্য ফসলও যে চাষ করা হয়েছে তার প্রমাণ দিচ্ছে এই প্রতিবেদন।

ওই গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাঁওতালদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ২৮ মে প্রশাসনিক তদন্তে চিনিকল কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়, ‘কোন আইনের ধারা বলে বা কোন পরিপত্রের আলোকে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সমস্ত সম্পত্তিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে ধান, গম, ভুট্টা, তামাক, সরিষা, আলু ইত্যাদি ফসল চাষাবাদ করা হচ্ছে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে মহিমাগঞ্জ সুগার মিল (রংপুর চিনিকল) কর্তৃপক্ষ ওই সম্পত্তি লিজ প্রদান করেছেন?’

এর ব্যাখ্যায় চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কে জানান, চিনিকলের অন্তর্গত ১ হাজার ৮৪২.৩০ একর জমির মধ্যে স্থাপনা ও আনুষাঙ্গিক কারণে ১ হাজার ৫০২ একর জমি আবাদযোগ্য। এর মধ্যে কৃষিনীতি অনুযায়ী চক্রাকারে অর্ধেক জমিতে আখ ও বাকি অর্ধেক জমিতে অন্যান্য ফসল চাষ করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ‘২০১৫ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবাদযোগ্য এক হাজার ৫০২ একর জমিতে আখ এবং অন্যান্য ফসল করার জন্য লিজ দেওয়া হয়। লিজের পর আখ এবং অন্যান্য ফসল আবাদ করা হয়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ একর জমিতে আখ চাষের পরিকল্পনা আছে।’

যদিও গত ২০১৬ সালে আখ চাষ না করা জমিতে গত ১ জুলাই সাঁওতালরা অস্থায়ী ঘর-বাড়ি নির্মাণ করেছে বলে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গত ২ জুলাই জেলা প্রশাসককে দেওয়া গাইবান্ধা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘৩০ জুন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের কাটা নামক স্থানে আদিবাসীদের প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যেহেতু ওই সম্পত্তিতে বর্তমানে আখ চাষ হচ্ছে না, সেহেতু ওই সম্পত্তি দ্রুত নিজ নিজ সম্পত্তি দখল নেওয়ার জন্য আদিবাসীদের আহ্বান জানান বক্তারা। বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয় গোপন ওই প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে এ বিষয়ে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘শিল্প সচিবকে ২৪ জুন লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, আখ চাষ না করার জন্য জমি ফেরতের দাবি করছেন আদিবাসীরা। আন্দোলনে পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে।’

তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্ত করা ৫ মে শিল্প সচিবের কাছে পাঠানো জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পাঠানো পত্রেও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘প্রাণহানিসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।’

প্রতিবেদনে সঙ্গে যুক্ত করা গত ২১ জুন গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়,‘চিনিকলের সব জমিতে আখ মাড়াই করা সম্ভব হয় না। পরিদর্শনকালে জমিতে ধান, তামাক ও মিষ্টি কুমড়ার আবাদ করতে দেখা যায়।’

জমির দাবিতে চিনিকলের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের অভিযোগের সত্যতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনের মূল অংশেও উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনের মূল অংশে বলা হয়, ‘২০০৪ সাল থেকে চিনিকল লিজ পুষিয়ে নিতে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের ৭০০/৮০০ একর জমি লিজ দেওয়া শুরু করে। লিজ গ্রহীতারা আখ চাষের (৮০ শতাংশ আবাদ করতে হবে) শর্ত না মানাসহ গড়িমসি করে। তদন্তকারী কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে মূল প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সুগারমিল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আবেদনকরীর বক্তব্য এবং দাখিল করা কগজপত্র পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।’

ঘটনার সূত্রপাত

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৪ সালে রংপুর চিনিকল লে-অফ ঘোষণা করে সরকার। ২০০৬ সালে আবার চালু করা হয়। লোকসান সামলাতে ৮০ শতাংশ জমিতে আখ চাষের শর্ত দিয়ে লিজ দেওয়া হয় ৭০০ থেকে ৮০০ একর জমি। কিন্তু আখ চাষ না করে অন্য ফসল আবাদ শুরু হয়। লিজ বাতিলের পর ২০১৫ সাল থেকে চিনিকল ওই জমিতে আখ ছাড়াও অন্য ফসল চাষ করে।

এ কারণে পৈত্রিক সম্পত্তির দাবিতে সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে সংগঠনের ব্যানারে পথসভা, মানববন্ধন ও জনসভা চলতে থাকে ২০১৫ সাল থেকে।