সভ্যতায় ঘুনেপোঁকা ধরেছে

তৌহিদুল ইসলাম রবিন:
‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস,অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’-কথাটা কতটুকু যুক্তিসংগত?

ছোট বেলা থেকেই নিজের পরিবার,সমাজ এবং সকলের মুখে এই কথাটা শুনেই বড় হতে হয় অনেককে।

আমি মনে করি মানুষের মানুসিকতার উপর প্রচন্ড প্রভাব ফেলছে এই লাইন দু’টি।

একজন অসৎ মানুষকে তোমার “সঙ্গ” দিয়ে ভালো করার চেষ্টা করো-এমন কথা কোথাও লেখা আছে কিনা বা কেউ বলে কিনা আমার জানা নেই।

সমাজ থেকে খারাপের সমাপ্তি হবে কিভাবে এই নিয়ে বড্ড আশংকা কাজ করে আমার মনে।

মানুষ খারাপ হয়ে জন্ম নেয়না এটা সবারই জানা কথা। একটি পরিবার,সমাজ এবং দারিদ্রতার অভিশাপে খারাপ মানুষের তৈরী হয়।

ভালোবাসা যে ঘৃণা করার চেয়েও সর্বোত্তম একটি মানবীয় গুণ তা আমরা ভুলে যাই। আমরা ভালোরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি খারাপের থেকে দূরে থাকার জন্য। আমি/আমরা ভালো থাকলেই হলো,অন্যকে ভালো করতে চেষ্টা করার কোনো দরকার নেই।

আমাদের সভ্যতায় ঘুনেপোঁকা ধরেছে।

কারো ভেতরেই চেষ্টা নেই খারাপ সমাজ থেকে অন্তত একজন খারাপকে ভালো করার। একজন খারাপ লোক সমাজে থাকলে তার দ্বারা আপনার আমার সন্তান,ভাই-বোন বা আত্মীয়স্বজনের কেউ না কেউ খারাপ তৈরী হবে।একজন খারাপ লোকই পারে অসংখ্য ভালোকে খারাপে পরিনত করতে।

এই অভিশপ্ত ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের ভালোটুকু দিয়ে একজন একজন করে খারাপগুলোকে ভালোতে পরিণত করতে হবে। বন্ধুত্ব করে তাদের সঙ্গে মিশতে হবে।

বন্ধুত্ব নাকি জীবনের সূর্যোদয়ের মতন। একজন ভালো বন্ধু সবারই কাম্য। একজন সৎ ভালো বন্ধুর সানিধ্য পেতে সবাই ব্যাকুল থাকে। সঙ্গী যদি ভালো-চরিত্রবান হয়, তবে সহযাত্রী অপর সঙ্গীও ভালো হতে বাধ্য। সমাজ সংস্কারের বিষয়টা আপনার কর্তব্য মনে করতে হবে।

কারোর দুর্বলতা এবং তার ত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেই সংশোধন হবেনা। আপনিতো ভালো ? সুতরাং সংশোধনের ব্যাপারে আপনাকেই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করতে হবে।

খারাপ ব্যক্তিটির সঙ্গে গভীরভাবে মেলামেশা করে বন্ধুসুলভ হয়ে তার সাথে সকল বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে হবে। মেলামেশার মাধ্যমে তার মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে খারাপ ব্যক্তির অসংখ্য দোষ ত্রুটির মধ্যেও কি কি সদগুনাবলী রয়েছে তা তালিকা করে তার সদগুণাবলীর প্রশংসা করতে হবে বেশি বেশি।

কোন ব্যক্তি যতই অসৎ চরিত্রের হোক না কেন, তার মধ্যে কিছু সৎগুণ নিশ্চয়ই থাকবে। সদগুণাবলীর প্রশংসা করতে গিয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এটা তোষামোদ বা ছলচাতুরীর রূপ ধারণ না করে। কারো তোষামোদ করা এবং সত্যিকারের প্রশংসা করার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে যা আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।

আপনি দরদ এবং আন্তরিকতার সঙ্গে মিশতে থাকলে আপনাকে আপনজন বলে ভাবতে শুরু করবে এবং অকপটে মনের সব কথা প্রকাশ করতে শুরু করবে। এ ভাবে সহানুভূতি ও সদ্ব্যবহারের দ্বারা কারো হৃদয় জয় করার পর এ ব্যক্তি দ্বারা তখনই কিছু সৎ কাজ করানো সম্ভব হবে। এখন আপনি সহানুভুতির সঙ্গে তার চরিত্রের এমন কোন দোষ-ত্রুটি পরিহার করতে বলেন তাহলে তার জন্যে বিষয়টি তেমন কিছু অসুবিধাজনক লাগবেনা এবং অনায়াসে তা সংশোধনের জন্যে এগিয়ে আসবে নিজে থেকেই আর আপনার যে কোন পরামর্শ বা সদ-উপদেশ গ্রহণ করতে মোটেই দ্বিধাবোধ করবেনা।

অনুরূপভাবে তার এ সত্য-উপলব্ধি এবং সংশোধনী গ্রহণ করার মনোভবেরও যদি আপনি প্রশংসা করেন তাহলে দেখতে পাবেন আরো দিগুণ উৎসাহ-প্রেরণা নিয়ে সে দিনের পর দিন ভালোর দিকে অগ্রসর হয়ে চলছে নতুন শক্তি ও প্রেরণা নিয়ে।

এমনি ভাবে ধৈর্য ও সহানুভূতির সঙ্গে খারাপ সংস্কার ও সংশোধনের কাজে এগিয়ে আসলে অল্পদিনের মধ্যেই খারাপ ব্যক্তিটি ভালো পথের সন্ধান লাভ করবে। আপনাকে স্মরণ রাখতে হবে যে, কারো মন-মগজকে পরিশুদ্ধ করা মোটেই ছেলে খেলা নয়। নৈতিক অধঃপতনের অতল গহ্বর থেকে হাত ধরে মানুষকে মানবতার উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত করতে হলে অনেক চেষ্টাি আর সাধনার প্রয়োজন।

এ জন্য সত্যিকার সহানুভূতিশীল ভালো ব্যক্তিকে রক্ত পানি করে এবং মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অক্লান্ত পরশ্রিম করতে হবে।

মনে রাখতে হবে “ভালো বন্ধুত্ব” হচ্ছে ইবাদতের মত। ভালো ব্যক্তিরা মন থেকে চাইলে সমাজ এবং রাষ্ট্রকে অভিশপ্ত খারাপি থেকে মুক্তি দিয়ে একটি সুন্দর উজ্জল ভালোয় পরিপূর্ণ পৃথিবী উপহার দিয়ে যেতে পারবে নতুন প্রজন্মকে।

আসুন সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখি মানুষে মানুষে ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দিয়ে।