গড়ে উঠছে রোহিঙ্গাদের নতুন বসতি

শত অভাব অনটনের মধ্যেও নতুন করে বসতি স্থাপন শুরু করেছে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পে অবস্থানরত স্বজনদের বস্তিতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় নিজ উদ্যোগে এসব বস্তিঘর গড়ে তুলছেন তারা। এ সুযোগে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি তাদের মালিকানাধীন পরিত্যক্ত জমিতে বসতি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে ভাড়ার নামে শুরু করছেন বাণিজ্য। এমন অভিযোগ তুলেছেন কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক।খবর বাংলা টিবিউনের।

মিয়ানমারে সহিংসতার পর সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এখনও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই আশ্রয়ের সন্ধানে আসছেন রোহিঙ্গারা, সীমান্ত পার হয়ে দলে দলে প্রবেশ করছেন বাংলাদেশে। অনুপ্রবেশের পর অনিবন্ধিত ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি ক্যাম্পের বাইরেও বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অবস্থান নিচ্ছেন তারা। এভাবে অবৈধভাবে আসা এসব রোহিঙ্গারা কৌশলে মিশে যাচ্ছেন স্থানীয়দের সঙ্গে।

এ পর্যন্ত কতজন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তার কোনও সঠিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশ সরকারের কাছে নেই। তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) দাবি করছে, শরণার্থী হিসেবে ২১ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

এসব রোহিঙ্গা শুরুতে স্থানীয় শরণার্থী ক্যাম্পের পাশে গড়ে ওঠা বস্তিতে আশ্রয় নেন। এখন তারা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছেন কক্সবাজারের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাদের কেউ কেউ থাকছেন ভাড়া বাসায়। কেউ আবার নিজ উদ্যোগে বসতি স্থাপন করতে শুরু করছেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়হীনতাকে পুঁজি করে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি শুরু করেছেন বাণিজ্য। রোহিঙ্গাদের সরাসরি আশ্রয় দিয়ে নতুন করে বস্তি নির্মাণ করছেন তারা। স্কুল ঘরের মতো লম্বা করে তৈরি করছেন রোহিঙ্গাদের জন্য থাকার জায়গা। একে তারা বলছেন ‘সেট’।
এমন একজন স্থানীয় যুবক জাহাঙ্গীর আলম । তিনি সেট নির্মাণের কথা স্বীকার করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া প্রত্যেক আমাদের মানবিক দায়িত্ব। এ কারণে তাদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।’ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে সরকারের কোনও অনুমতি আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।’

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী সৈয়দুল আমিন। তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এসেছেন প্রায় এক সপ্তাহ হলো। এতদিন পরিচিত স্বজনদের একটি বস্তিতে ছিলেন তিনি। সেখানে পাঁচ জনের জায়গায় থাকতেন আট জন। এত কষ্ট করে তিনি আর থাকতে চান না। তাই স্থানীয় যুবক জাহাঙ্গীরের জমি ভাড়া নিয়ে একটি কুঁড়ে ঘর তৈরি করছেন নিজ উদ্যোগে।

একইভাবে পরিবারের পাঁচ সন্তান নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ৫০ বছর বয়সী শরণার্থী মরিয়ম বেগম। তিনি জানিয়েছেন, বস্তিতে তার স্থান হয়নি। তাই ক্যাম্পের পাশে ছোট একটি ঘরে আশ্রয় নেন তিনি। এর জন্য তাকে ভাড়া গুণতে হবে ৬শ থেকে ৮শ টাকা। কেবল মরিয়ম ও সৈয়দুলই নয়, তাদের মতো অনেকেই এখন ভাড়া বাসা ও নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলা নতুন ঘরে আশ্রয় নিচ্ছেন।

কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দলে দলে রোহিঙ্গা আসার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির সুবিধাবাদী চক্র বস্তির মতো করে সেট নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে বাণিজ্য করে যাচ্ছে। এতে করে রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার উৎসাহ পাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সীমান্ত পার হয়ে আসা শরণার্থীরা কোনও ধরনের বিধিনিষেধ মানছে না। তারা যেখানে খুশি চলে যাচ্ছে। এ কারণে হুমকির মুখে রয়েছে গোটা কক্সবাজার।’

সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিদিনই দলে দলে শরণার্থীরা আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে উল্লেখ করে আইওএ ম’র কক্সবাজার অফিসের প্রধান সানজুক্তা সাহানি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে নতুন করে আসা ২১ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। প্রতিদিন এভাবে শরণার্থী রোহিঙ্গারা আসতে থাকলে আগামী সপ্তাহে তাদের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
সানজুক্তা সাহানি আরও বলেন, ‘এখন যেসব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বা অন্যান্য স্থানে অবস্থান করছে তাদের অধিকাংশ অভাব অনটনে রয়েছে।’

প্রসঙ্গত, গত ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বেশ কয়েককটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে সীমান্ত পুলিশের ৯ সদস্য নিহত হয়। সেই হামলার জন্য রোহিঙ্গা মুসলমানদের দায়ী করে আসছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এরপর থেকে রোহিঙ্গারা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে থাকে। সেই অনুপ্রবেশ এখনও অব্যাহত রয়েছে।