রোহিঙ্গা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বাড়ছে

সুনীল বড়ুয়া:
কক্সবাজারের শরনার্থী ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন বেড়ে চলেছে রোহিঙ্গার সংখ্যা। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দমন-নিপীড়নের মুখে অনুপ্রবেশের বিষয়টিকে আপাতত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলেও বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠাও।

১৯৯১ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আসা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে বসবাসরত প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা এখন কক্সবাজারের বিষ ফোঁড়া। বিশেষ করে উখিয়া টেকনাফের অনিবন্ধিত ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ নানা অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়ায় পর্যটন শহর কক্সবাজারের জন্য বড় হুমকী হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু।

এদিকে গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমার সেনা ক্যাম্পে হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে কতজন রোহিঙ্গা এদেশে অনুপ্রবেশ করেছে,তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই সীমান্তরক্ষি বাহিনী বিজিবির কাছেও। তবে বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন,এ সংখ্যা দশ হাজারের কম নয়। থাকা-খাওয়া,চিকিৎসাসহ নানা মানবিক সংকটে বর্তমানে এসব রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। শিশু সন্তানদের নিয়ে এই তীব্র শীতেও অনেককে রাত কাটাতে হচ্ছে খোলা আকাশের নীচে।

জানাগেছে,টেকনাফ নয়াপাড়া নিবন্ধিত শরনার্থী ক্যাম্পে আছে প্রায় ১৭ হাজার রোহিঙ্গা। এ ক্যাম্পের আশে পাশে অনিবন্ধিত ক্যাম্প এবং আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আরও প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা। অন্যদিকে উখিয়া কুতুপালং শরনার্থী ক্যাম্পে সরকারী তালিকা ভুক্ত ১৫ হাজার এবং পাশের অনিবন্ধিত ক্যাম্প ও জেলার বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা অবৈধভাবে কক্সবাজারে অবস্থান করছে।

child-copy

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-নিপীড়ন বন্ধ না হওয়ায় উখিয়া-টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে রোহিঙ্গারা এদেশে অনুপ্রবেশ করছে। রাতের আঁধারে নাফনদী কেন্দ্রিক এক শ্রেণীর দালাল টাকার বিনিময়ে এসব রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে সহযোহিতা করছে। টেকনাফ লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতা (মেম্বার) মো. ইলিয়াছ জানান, এ ক্যাম্পের ৬টি ব্লকে দুইহাজার ৯২ পরিবার বসবাস করতো। গত দশদিনে এখানে আরো যোগ হয়েছে প্রায় পাঁচশো পরিবার। সং যা খ্যায় হবে প্রায় আড়াই হাজার।

তবে টেকনাফ-২ বিজিবির পরিচালক লে.কর্নেল আবুজার আল জাহিদ জানান, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। সর্বশেষ গত রোববার ভোরে নাফ নদী সংলগ্ন তিনটি পয়েন্ট থেকে রাহিঙ্গাবাহি ৬টি নৌকা প্রতিহত করেছে। এছাও নাফ নদীর যেসব পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বেশি ঘটছে সেসব পয়েন্টে বিজিবির নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।

গত শুক্রবার কক্সবাজারের টেকনাফে এক সংবাদ সম্মেলনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেছেন, স্থানীয় দালালদের সহায়তায় কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। তবে কি পরিমাণ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে তার পরিসংখ্যান বিজিবির কাছে নেই বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বিজিবির একার পক্ষে ৬৩ কিলোমিটার জলসীমাসহ ২৭১ কিলোমিটার জলপথের শতভাগ নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। যেসব পয়েন্টে বিজিবির টহল কম সেসব পয়েন্ট দিয়ে দালালরা টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঢুকাচ্ছে। ওই পয়েন্টগুলোতে বিজিবির সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে।

স্থানীয় লোকজন এবং পুলিশ জানায়, জেলার চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই,ধর্ষনসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ড সংঘটিত করে রোহিঙ্গরা। জেলার অপরাধ জগতের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ রোহিঙ্গাদের হাতে। চলতি বছরের ১৩ মে রাতে টেকনাফের নয়াপাড়া রেজিষ্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে আনসার কমান্ডার আলি হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসময় হামলাকারীরা লুট করে ১১টি অস্ত্র ও ৬শ রাউন্ড গুলি। দীর্ঘদিনেও সেই লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি। এ হামলার অভিযোগের তীরও রোহিঙ্গাদের দিকে। রোহিঙ্গাদের সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘঠিয়েছে এবং এ ঘটনায় লুন্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়ায় এসব উদ্ধার করা যাচ্ছেনা বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে দাবি করা হচ্ছে।

চলতি বছরের ৫ জুলাই দিবাগত রাতে বাড়িতে ঢুকে টেকনাফ সদর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মো. সিরাজুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত রোহিঙ্গারা। অবশ্য এ ঘটনায় রোহিঙ্গা ডাকাত আবদুল হাকিমকে অভিযুক্ত করে থানায় হত্যা মামলাও করা হয়।

শুধু এসব ঘটনা নয়, জেলা পুলিশের সিনিয়র এক কর্মকর্তার ভাষ্য, শুধু উখিয়া টেকনাফ নয়,কক্সবাজার শহরের দরিয়া নগর,হিমছড়িসহ আশপাশের পাহাড়ী এলাকায় অসংখ্য রোহিঙ্গার বসবাস। সরকারী পাহাড় দখল করে সেখানে বসতি করছে রোহিঙ্গারা। তিনি বলেন,জেলায় যেসব অপরাধ কর্মকান্ড ঘটে বেশিরভাগ ঘটনায় রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সহসভাপতি প্রকৌশলী কানন পাল বলেন,মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর অমানবিক দমন-নিপীড়ন কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে হয়তো রোহিঙ্গারা এদেশে চলে আসছে। তাদের প্রতি অবশ্যই আমাদের সহানুভুতি থাকবে। পাশাপাশি এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে,কক্সবাজারের বিষফোঁড়া কিন্তু রোহিঙ্গা।

rohingya-3-copy

কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু মোর্র্শেদ চৌধুরী খোকা জানান, রোহিঙ্গা সমস্যা এখন শুধু আমাদের কক্সবাজারে সীমাবদ্ধ নেই,এটি আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসাবে রুপ নিয়েছে। তবে মিয়ানমার যা করছে অবশ্যই ভাল কিছু করছেনা। আমরা এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

তিনি বলেন,১৯৯১-৯২ সালের পর থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে চার লাখ রোহিঙ্গা এদেশে অবস্থান করছে। যা আমাদের কক্সবাজারবাসীর জন্য উদ্বেগ-উৎকন্ঠার বিষয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, দুই যুগেও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান পায়নি কক্সবাজারবাসী। তিনি বলেন,কক্সবাজারের অর্থনীতির মূল ভিত্তি পর্যটন শিল্পই একসময় হুমকীর মুখে পড়তে পারে শুধুমাত্র এই রোহিঙ্গাদের জন্য। এ অবস্থায় সরকারের উচিত ছিল রোহিঙ্গা নিয়ে কাজ করে ইউএনএইচসিআর,আই.ও.এমসহ বিভিন্ন সংস্থার সাথে বসে একটা রুপরেখা তৈরী করা। নতুনকরে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের যাতে সমাজে মিশে যেতে না পারে এই উদ্যোগ নেওয়া।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলী জানান, ওরাও মানুষ। এপরিস্থিতিতে ওদের প্রতি আমরা অবশ্যই মানবিক আচরণ করবো। তবে যেভাবে রোহিঙ্গারা ঢুকছে এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক।