জেলা পরিষদ নির্বাচন: দলের সমর্থন পেতে জেলা আ. লীগ নেতাদের দৌড়ঝাঁপ

প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিতব্য জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন পেতে মরিয়া জেলা পর্যায়ের তৃনমূল নেতারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। মনোয়নপ্রত্যাশীদের কেউ-কেউ দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠজনসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এজন্য অনেক সমর্থন প্রত্যাশী জেলা নেতা বর্তমানে ঢাকায় অবস্থানও করছেন। খবর বাংলা ট্রিবিউনের।

মনোনয়নপ্রত্যাশী বেশ কয়েকজন জেলা পর্যায় ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এদিকে চেয়ারম্যান পদের পাশাপাশি সাধারণ ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদেও দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা চেষ্টা-তদবির চালাচ্ছেন। তবে এ দু’টি পদের জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে নামের তালিকা পাঠানোর নির্দেশ থাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশীরা জেলা কমিটির নেতাদের কাছেই ধর্ণা দিচ্ছেন।

এবারই প্রথমবারের মতো জেলা পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সংসদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকলেও জেলা পরিষদে প্রত্যক্ষ ভোটের বিধান নেই। পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন পরোক্ষ ভোটে। ভোট দেবেন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তাদের ভোটে ১ জন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য ও সংরক্ষিত ৫ জন নারী সদস্য নির্বাচিত হবেন।

নির্বাচন কমিশন ২০ নভেম্বর দেশের ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ৩ ও ৪ ডিসেম্বর, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ১১ ডিসেম্বর ও প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ১২ ডিসেম্বর। ২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গণভবনে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য পদে দলীয় সমর্থন চূড়ান্ত হবে। দলের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নিজেদের প্রার্থীতা নিশ্চিত করার জন্য জেলা পর্যায়ের নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের কাছে দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যাচ্ছেন।

জেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়াকেই তারা জেলা নির্বাচনে বিজয় বলে ভাবছেন। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয় জেলা পরিষদের প্রার্থীতা প্রত্যাশীদের মধ্যে এমন মনোভাব তৈরি করেছে। এ জন্য দলীয় মনোনয়ন পেতে সর্বস্ব নিয়োগ করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তারা মনে করেন, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি নির্বাচন না করার ঘোষণা দেওয়ায় নির্বাচনটি হবে অনেকটাই একতরফা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে। ফলে যারা দলের সমর্থন পাবেন তারাই এগিয়ে থাকবেন।

আওয়ামী লীগের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেতে ৭০৩ জন আবেদন করেছেন। দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে সব থেকে বেশি আবেদন এসেছে খুলনা থেকে। এ বিভাগে আবেদন পড়েছে ১৩৩টি। আর সবচেয়ে কম ৩২টি আবেদন পড়েছে সিলেট বিভাগ থেকে। জেলা পর্যায়ে সর্বাধিক ২৯টি আবেদন পড়েছে পাবনা জেলা থেকে। এরপর শেরপুর থেকে ২৫টি, নোয়াখালীতে ২৩টি, চাঁদপুর ও পঞ্চগড় থেকে ২২টি করে আবেদন পড়েছে।

শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন পাল বলেন, ‘আমি ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছি। এখন পযর্ন্ত দলের কাছে কিছু চাইনি। এবার প্রথমবারের মতো আবেদন করেছি। জেলা কমিটিও একক প্রার্থী হিসেবে আমার পক্ষে রেজুলেশন দিয়েছে। আশা করি নেত্রী আমাকে বিমুখ করবেন না।’

কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে চন্দন পাল বলেন, ‘আমার জেলায় কেন্দ্রীয় নেতা রয়েছেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী। উনি মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য নন। তারপরও আমি উনার কাছে দোয়া চেয়েছি। আমার এলাকার অন্য দু’জন সংসদ সদস্যের কাছেও দোয়া চেয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে চন্দন পাল বলেন, ‘এই নির্বাচনটি যেহেতু স্থানীয় সরকার পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের ভোটে অনুষ্ঠিত হবে। আর সারাদেশে আমাদের দলের সমর্থিত জনপ্রতিনিধিরাই বেশি। এজন্য দলের সমর্থন পেলে বিজয় অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যাবে।’ চন্দন পাল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় শেরপুর অবস্থান করলেও রাতেই তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেবেন বলে জানান।

মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান জেলা প্রশাসক গোলাম মহিউদ্দিন দলের সমর্থন পেতে আবেদন জানিয়েছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘নেত্রী আমাকে জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আশাকরি এবার নির্বাচনে দলের সমর্থন দেবেন।’

তবে দল থেকে সমর্থন না পেলে নির্বাচন করার কোনও ইচ্ছা নেই উল্লেখ করে মহিউদ্দিন বলেন, ‘নেত্রী যাকে দেবেন আমরা তার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করব।’ মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের এই নেতাও বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদে সমর্থন প্রত্যাশী কামরুল আহসান শাহজাহান বলেন, ‘আমি আবেদন করেছি। সমর্থন পেলে নির্বাচন করব। আর নেত্রী অন্য কাউকে সমর্থন দিলে তার জন্য কাজ করব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারা দেশে স্থানীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধি বেশি থাকায় জেলা পরিষদেও দলের মনোনয়ন যারা পাবেন তাদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি।’

ভোটার পরিস্থিতি

কয়েকটি জেলার ভোটার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে বেশিরভাগ ভোটারই কোনও না কোনওভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত। এক্ষেত্রে কেউ রয়েছেন জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ের পদ ধারী। এছাড়া অনেকের পদপদবি না থাকলেও পারিবারিকভাবে তারা আওয়ামী পরিবারের সদস্য।

এক সময় বিএনপি জামাতের ঘাঁটি হিসেব পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভোটের হিসেবে আওয়ামী লীগ এগিয়ে রয়েছে। এ জেলার ৬৪৬ জন ভোটারের মধ্যে আওয়ামী লীগের এককভাবে রয়েছে ৩১৭ জন জনপ্রতিনিধি। আর বিএনপি-জামায়াতের তিনশ জনেরও কম। এ জেলায় রয়েছেন ৩৫ জনের মতো স্বতন্ত্র ভোটার। বিএনপি জামায়াত এ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থীর এখানে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্য এ জেলায় বিএনপি জামায়াতের পরোক্ষ সমর্থন পেয়ে স্বতন্ত্র কেউ নির্বাচন করলে ফল উল্টে যেতে পারে বলে পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে।

বরিশালে জেলা পরিষদ নির্বাচনে মোট সাড়ে ১২০০ ভোটারের মধ্যে আওয়ামী লীগের রয়েছেন ৯০০জনের বেশি। এছাড়া বিএনপি-জামায়াতের তিনশ’ এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দল মিলে ৫০জনের মতো ভোটার রয়েছেন। একই ধরনের পরিসংখ্যান রাজশাহীতে। এ জেলার মোট ভোটার ১২০০-র মধ্যে আওয়ামী লীগের রয়েছেন ৭২৫ জন। বিএনপির ৪৩৫ এবং অন্যান্য ৪০ জনের মতো ভোটার। বরগুনায় মোট ভোটার ৬১৬ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪১০ জন ও বিএনপির ২০০ জন। বাকি ৬ জন ভোটার স্বতন্ত্র। বাগেরহাটে মোট ভোটার ১ হাজার ৩০ জনের মতো। এর মধ্যে এক হাজারের বেশিই আওয়ামী লীগের ভোটার। বিএনপি ও জামায়াত মিলে এ জেলায় ২০টির মতো ভোটার রয়েছেন।

এই কয়েকটি জেলার মতো সারা দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠেয় ৬১টি জেলার চিত্র কম বেশি একই ধরনের। ফলে জেলা পরিষদে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে একক প্রার্থী সমর্থন এলে পৌরসভা ও ইউনিয়নের মতো এ নির্বাচনের ফসলও আওয়ামী লীগের ঘরেই উঠবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।