বিদেশি কূটনীতিকদের রাখাইন পরিস্থিতি জানাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রাখাইন প্রদেশে গত অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বৃহস্পতিবার বিদেশি কূটনীতিকদের অবহিত করবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা সীমান্তের ওপারের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং এর একটি নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়েছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আমাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছি এবং ঢাকায় অবস্থিত অন্যান্য রাষ্ট্রদূতদের বাংলাদেশের অবস্থান জানাবো।খবর বাংলা ট্রিবিউনের।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যার উৎস খুঁজে বের করা এবং এর সমাধান মিয়ানমারকেই বের করতে হবে।

অক্টোবর মাসের ৯ তারিখে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এলাকায় সন্ত্রাসীদের সমন্বিত হামলায় নয় পুলিশ সদস্য নিহত হয়। এর দুই দিনের মাথায় ১১ অক্টোবর মঙ্গলবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরও ১২ জনের মৃত্যুর কথা জানায়।

হিউম্যান রাইটস স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে জানায়, ১০ নভেম্বর থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সহিংসতায় নতুন করে মংগদাউ জেলার পাঁচটি গ্রামে ৮২০টি ঘর-বাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। হিউম্যান রাইটসের হিসাব মতে, সবমিলে এক মাসে ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর সংখ্যা ১২৫০-এ দাঁড়িয়েছে।

রাখাইন রাজ্যের সংঘর্ষকে হামলাকারীদের খোঁজে ‘কিয়ারেন্স অপারেশন’ হিসেবে অভিহিত করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা বলছে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইসলামি চরমপন্থা দমনে কাজ করছেন তারা।

সেখানে সংবাদমাধ্যমকেও প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে জাতিগত দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেখানে ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া, নারীদের ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চলছে।

জাতিসংঘের হিসাবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সেখানে ৩০ হাজার মানুষ ঘর হারিয়েছেন। পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ। তবে রাজ্য থেকে পালিয়ে যেতে গিয়েও উগ্র জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধদের বাধার মুখে পড়ছেন তারা।

৪০ দিন ধরে রাখাইন রাজ্যে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ত্রাণসংস্থাগুলো। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা এই ত্রাণ কার্যক্রমের সমন্বয় করছে।জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন,‘আমাদের সহায়তার মূল লক্ষ্য হলো তারা যেন বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য না হয়।’

এদিকে বুধবার বাংলাদেশে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিও মিন্ট থানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকাণ্ডের কারণে রাখাইন প্রদেশের সহিংস পরিস্থিতির জন্য চরম উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

সশস্ত্র বাহিনীর এ কর্মকাণ্ডের কারণে সেখানকার লোকদের দুর্ভোগ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পরে কামরুল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সীমান্তের ওপারে যে ঘটনা ঘটছে, তার প্রতিবাদ করেছি। লোকজন যেন তাদের গ্রামে ফিরে যেতে পারেন, এমন একটি সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্যও আমরা আমরা দাবি জানিয়েছি।’

আমরা আরও বলেছি, ‘সেখানে যেন কোনও লুটপাট, ঘরবাড়ি পোড়ানো, ধর্ষণের ঘটনা না ঘটে এবং মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতেতে এটি বাংলাদেশের অবস্থান।’

তিনি জানান,‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করেছে।রাখাইন প্রদেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ এই চিঠিতে মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে।’

বাংলাদেশ মনে করে, রাখাইন প্রদেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফেরত আসলে, যারা এখন সীমান্ত অতিক্রম করেছে, যারা সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য অপেক্ষা করছে এবং যারা রাখাইন প্রদেশে উচ্ছেদ হয়েছে, তারা সবাই কোনও ভয় ছাড়াই নিরাপদে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে।

রাখাইন প্রদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী যেন সীমান্তে আশ্রয় নিতে বাধ্য না হয়, সেজন্য বাংলাদেশ মিয়ানমারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছে।

মিয়ানমারের বিভিন্ন ঘটনার জন্য বাংলাদেশকে জড়িয়ে সেদেশের গণমাধ্যমে যেসব রিপোর্ট করা হচ্ছে তারও প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ।

চিঠিতে রাখাইন প্রদেশ থেকে মুসলিম জনগোষ্ঠী যেন ব্যপকহারে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে এবং বাংলাদেশ সীমান্তের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহযোগিতার জন্য মিয়ামারকে অনুরোধ জানানো হয়।

রাখাইন প্রদেশে বাছবিচারহীনভাবে শক্তি প্রয়োগ এবং মিলিটারি অভিযানের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে দাবি জানিয়েছে, তা বিবেচনা করার জন্য বাংলাদেশ মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।