রোহিঙ্গা প্রশ্নে সরকারের অবস্থানে সায় মানবাধিকার কমিশনের

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার আহ্বান উপেক্ষা করে মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ঢুকতে না দিতে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম‌্যান কাজী রিয়াজুল হক।
তিনি বলেছেন, “দেশের মানুষকে ক্ষতি করে বিশ্বমানবতা দেখানো সমীচীন হবে না। আমার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে, আমার দেশের মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষা করা।” খবর বিডিনিউজের।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে গাজীপুরে বুধবার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে এই উত্তর আসে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম‌্যানের।

তিন দশক ধরে ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করে আসা বাংলাদেশ নতুন করে শরণার্থী নিতে নারাজ।

২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দেওয়ার পর এবারও একই নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

এদিকে গত অক্টোবরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ‌্যে সীমান্ত চৌকিতে হামলার পর সেনাবাহিনীর অভিযানের শিকার রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশ সীমান্ত পানে ছুটছে।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের জন‌্য বাংলাদেশকে সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

তাতে অসম্মত বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গাদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া এবং জালিয়াতি করে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের বিষয়টিও বলছে।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম‌্যান রিয়াজুল বলেন, “নতুন মানুষ নিয়ে আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় এমন কোনো কাজ করতে পারি না। আমার দেশের মানুষের জন্য যেটা মঙ্গলজনক হবে, যেটা কল্যাণকর হবে, আমরা সেটার পক্ষেই যাব।

“রোহিঙ্গারা এদেশে এসে বিভিন্ন ক্রাইম করছে। বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট করে নিয়ে বিদেশে গিয়েও তারা ক্রাইম করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।”

রিয়াজুল আরও বলেন, “আপনারা জানেন মিয়ানমার থেকে পার্বত্য জেলাগুলো দিয়ে একটা রুট আছে, যেখান দিয়ে অস্ত্র যেমন আসে, ইয়াবাও আসে। এ বিষয়ে আমরা যদি স্ট্রিক না হই, তাহলে এটা বাংলাদেশকে শেষ করে দেবে।

“এমনিতেই ইয়াবার ভয়ে আমরা এখন আতঙ্কিত। সেই কারণে এত বড় রিস্ক তো আমরা নিতে পারি না। কাকে ঢুকতে দেব? সঙ্গে করে অস্ত্র নিয়ে আসবে না, ইয়াবা নিয়ে আসবে না, এটা তো বলা যায় না।”

গণতন্ত্রের পথেখ যাত্রা করা মিয়ানমারে অং সান সুচির সমালোচনা করে মানবাধিকার চেয়ারম্যান বলেন, “তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অথচ উনি ক্ষমতায় আসার পর মানুষের ওপর নির্যাতন হচ্ছে।”

রোহিঙ্গা ঠেকাতে বাংলাদেশ ইতোমধ‌্যে সীমান্তে বাড়তি বিজিবি সদস‌্য মোতায়েন করেছে। গত কয়েক দিনে কয়েকশ রোহিঙ্গাকে ফেরতও পাঠানো হয়েছে।

বারবার আহ্বান সত্ত্বেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো উদ‌্যোগ নিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার।

এবার সীমান্ত পানে ঢলের প্রেক্ষপটে বুধবার মিয়ানমার সরকারকে তলবও করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা রিয়াজুল বলেন, ১৯৭৮ সাল থেকে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করেছিল। দেশে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা দেশে ঢুকেছিল। পরে আলাপ আলোচনা করে তাদের ওই দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এক কিছু কাল পরে ব‌্যাপক সংখ‌্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে।

কক্সবাজারের দুটি শরণার্থী শিবিরে সরকারি হিসাবে প্রায় ৩৫ হাজারের মতো রোহিঙ্গা থাকলেও এর অনেকগুণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রামে।

মিয়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গাদের জঙ্গি তৎপরতায় ব‌্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ‘ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা’

রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসা মিয়ানমার সরকার এই জনগোষ্ঠীর মানুষদের বাংলাদেশে ‘ঠেলে’ দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

বুধবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

এতে বলা হয়, “কমিটি নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি সহমর্মিতা জানায় এবং মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তাদের ওপর নির্যাতনের নিন্দা জ্ঞাপন করে।

“কমিটির পক্ষ থেকে নিরীহ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার যে অপচেষ্টা করা হচ্ছে তা প্রতিহত করতে বিশ্বের সকল বিবেকমান মানুষকে জাগ্রত হওয়ার আহবান জানানো হয়।”

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দুদের ওপর হামলা নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটি দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।