বাংলা বর্ণমালায় কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষা

মুহম্মদ নূরুল ইসলামঃ
বাংলাদেশের প্রান্তিক জেলা কক্সবাজার। এ জেলার রয়েছে একটি নিজস্ব কথ্যভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। এই কথ্যভাষার রয়েছে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কক্সবাজার বৃহত্তর চট্টগ্রামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের কথ্য ভাষা প্রায় একই ধরণের হলেও উভয় অঞ্চলের ভাষার মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট পার্থক্য। তাই চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপ-ভাষাকে বলা হয় চাঁড়ি বা চাঁটি আর কক্সবাজার অঞ্চলের উপ-ভাষাকে বলা হয় রোঁয়াই আঞ্চলিক ভাষা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা তথা কথ্যভাষা নিয়ে অনেকেই গবেষণা করেছেন। এখনো অনেকেই গবেষণায় রত। কিন্তু কক্সবাজারের ভাষা নিয়ে কোনো গবেষণা কর্ম এযাবৎ চোখে পড়ে নি। কক্সবাজার তথা বৃহত্তর চট্টগ্রামের নিজস্ব কথ্যভাষা রয়েছে কিন্তু নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। ফলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের কথ্যভাষার সব শব্দ এখনো স্থায়ী রূপ নিতে পারে নি। এ অঞ্চলের মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে এই কথ্যভাষাকে ধরে রেখেছে যা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। অজ্ঞতা, অসাবধানতা, সংরক্ষণ তথা স্থায়ী রূপ লাভ না করার কারণে পৃথিবী থেকে ইতোমধ্যেই অনেক ভাষা হারিয়ে গেছে বা মরে গেছে। পণ্ডিতদের মতে পৃথিবীতে বিভিন্ন উপভাষা থেকে প্রতি বছর একাধিক শব্দ মারা যাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া ভাষা স্থায়ী রূপ লাভ করতে পারে নি বলেই তার এই দুরবস্থা। অবাক হওয়ার নয়, অনুরূপভাবে কক্সবাজার তথা বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাও একদিন পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে আমাদের মাতৃভাষার (আঞ্চলিকভাষার) অনেক শব্দ মরে গেছে বা হারিয়ে গেছে যা পুনরুদ্ধার করা খুবই কঠিন। এই প্রবন্ধে বাংলাভাষা বর্ণমালা ব্যবহার করে কক্সবাজার তথা বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শব্দসম্ভার দেখানো হলো। ফলে এই প্রবন্ধকে বাংলা বর্ণমালার মাধ্যমে আমাদের কথ্যভাষার পরিচিতি পর্বের প্রথম ধাপ বলা যেতে পারে।

মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে কক্সবাজারের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন অনুভব করছি। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত জেলা কক্সবাজার। জেলার পূর্ব পাশে রয়েছে আন্তর্জাতিক নদী নাফ এবং তার পূর্বে প্রতিবেশী মিয়ানমার বা প্রাক্তন বার্মা। নাফ নদীর পূর্ব পার্শ্বের অংশটি স্বাধীন আরাকান-এর অধীন ছিলো। কক্সবাজার বিমান বন্দর সংলগ্ন নাজিরারটেক থেকে শুরু করে টেকনাফ উপজেলার বদরমোকাম (সাম্প্রতিক সময়ে যা নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে) পর্যন্ত দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত। জেলার পূর্ব পার্শ্বে রয়েছে গিরিকুন্তলা বনানীর সবুজ শ্যামলিমা শোভিত গভীর জঙ্গল আর পশ্চিমে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর। প্রাকৃতিক সম্পদ, পর্যটন শিল্পসহ সম্পদের সমাহারে কক্সবাজার দেশি-বিদেশি মানুষের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত। জেলার ভূ-রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাস বহু পুরনো।

প্রাচীনকালে চট্টগ্রাম ও আরাকান (বর্তমান মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ যা চট্টগ্রামের মানুষের কাছে রোসাঙ্গ নামে বেশি পরিচিত ছিল) ছিল অভিন্ন রাজ্য। এই দুই রাজ্যের সেতু-বন্ধন ছিল বর্তমান কক্সবাজার এলাকা। সে সূত্রে আদি-চট্টগ্রাম ও আরাকানের ইতিহাসের সঙ্গে কক্সবাজারের আদি-ইতিহাসের যোগসূত্রের সন্ধান করেন ড. আবদুল করিম, আবদুল হক চৌধুরীসহ অনেক পণ্ডিত-গবেষক। কালে কালে বহু বিদেশি-বিভাষী শাসক-শোষক ও রাজা-বাদশাহর হাত বদল হয়েছে এই ভূ-খণ্ড। সর্বশেষ ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন হিরাম ‘কক্স’-এর নামধারণে নিজস্ব সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে এগিয়ে চলছে এ অঞ্চল।

ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের ন্যায় কক্সবাজারের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও বেশ সমৃদ্ধ। মধ্যযুগে আরাকানের অভিন্ন রাজ্য হওয়ায় আরাকান অমাত্যসভায় লালিত বাংলা সাহিত্যের প্রভাব তৎকালীন কক্সবাজারকেও আলোকিত করেছিল। শুধু তাই নয়, গবেষণায় দেখা গেছে কক্সবাজার অঞ্চলে পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের মানুষের আগমন ঘটেছিল। এখানে আগমন ঘটেছে তুর্কি, চীনা, আরবি, পাখতুন, পাঞ্জাবি, মধ্য ভারতীয়, সাঁওতাল, রাখাইন, মগ, চাকমা, চাক, ত্রিপুরা, ইংরেজ, পতুর্গিজ, ভুটিয়াসহ অনেকের। তাঁদের সাথে এসেছে তাঁদের ভাষা, সংস্কৃতি। এর ফলে কক্সবাজার অঞ্চলের ভাষা, শব্দভাণ্ডার, সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে সমৃদ্ধ। এখানকার মানুষের মন ও মনন পুঁথি-পাণ্ডুলিপি ও লোকায়ত সাহিত্য-সংস্কৃতিতে লালিত। এখনও এই এলাকার গ্রামে-গ্রামে পুঁথির আসর বসে, শোনা যায় নানান রোমান্টিক কাব্যকথা। কবির লড়াই, হঁওলা, হাইল্যাশারিসহ হরেক রকমের গ্রামীণ সংস্কৃতির চর্চা হতে দেখা যায়। তদুপরি সমুদ্র ও অরণ্য প্রভাবিত অঞ্চল হিসাবে এখানকার লোকায়ত সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যও বৈচিত্র্যময়। যদিও আকাশ সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিসহ আধুনিক সংস্কৃতির নামে এসব তৃণমূলীয় মানুষের প্রাণের সাংস্কৃতিক স্পন্দন ক্ষীণ হয়ে আসছে।

এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বাংলা উপ-ভাষার এক অনন্য সংযোজন। এ ভাষার উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য, ধ্বনি বৈচিত্র্য ও গঠন সম্পর্কে ভাষা-তাত্ত্বিক আলোচনায় সাহিত্যবিশারদ আবদুল করিম (১৮৭১-১৯৫৩) মন্তব্য করেন যে, ‘চেষ্টা করলে আমরাও অহমীয়াদের মতো একটি আলাদা ভাষা সৃষ্টি করতে পারতাম’।

কক্সবাজার জেলাসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার গঠন বৈশিষ্ট্য এতই বিচিত্র যে, সমগ্র এলাকার প্রায় বিশ মাইল অন্তর এ ভাষার অভ্যন্তরীণ একাধিক উপ-ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর দুই পাশের জনগোষ্ঠীর ভাষার স্বতন্ত্র উচ্চারণরীতি ও অর্থগত তারতম্য এই উপ-ভাষাসমূহের স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করে। কর্ণফুলী নদীর উত্তর পাশের মীরসরাই-সীতাকুন্ড এলাকার সঙ্গে হাটহাজারি-রাউজান-রাঙ্গুনিয়া এলাকার ভাষার স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। আবার পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী ও সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এলাকার সঙ্গে মীরসরাই-সীতাকুন্ড ও হাটহাজারি-রাউজান-রাঙ্গুনিয়া এলাকার ভাষার তফাৎ রয়েছে। একইভাবে কক্সবাজার এলাকার ভাষা উপরোক্ত এলাকাগুলোর ভাষা থেকে অনেকটাই আলাদা। শুধু কি তাই, কক্সবাজার জেলার অভ্যন্তরে মহেশখালী দ্বীপ ও সীমান্ত শহর টেকনাফ উপজেলার ভাষা ও উচ্চারণেও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় দেখা যাবে যে, মীরসরাই-সীতাকুণ্ড এলাকার ভাষা নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা দ্বারা প্রভাবিত। তদ্রুপ কক্সবাজার এলাকার ভাষা রোসাঙ্গ বা রোহিঙ্গাদের উচ্চারণরীতি দ্বারা প্রভাবিত। ফলে কক্সবাজার এলাকা বৃহত্তর চট্টগ্রামের অন্তর্গত হয়েও আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণরীতি ও অর্থগত তারতম্যের ফলে চট্টগ্রামের অন্য এলাকা থেকে অনেকটাই স্বতন্ত্র।

সাহিত্যবিশারদ আবদুল করিম (১৮৭১-১৯৫৩), সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবদুর রশিদ সিদ্দিকী (১৮৯৪-১৯৫১), ভাষাবিজ্ঞানী ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০২-১৯৮২), শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে পৃথক পৃথক ভাবে আলোচনা করেছেন। নিজ নিজ গ্রন্থে তাঁরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রচলিত বিপুল সংখ্যক প্রবাদ-প্রবচনও সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া কবি ওহীদুল আলম (১৯১১-১৯৯৮), সাংবাদিক নুরুল ইছলাম চৌধুরী (১৯৩৩-১৯৮৬), ছড়াকার নূর মোহাম্মদ রফিক, গবেষক আহমেদ আমিন চৌধুরী, সাংবাদিক-গবেষক মাহবুবুল হাসান চট্টগ্রাম অঞ্চলের শব্দভাণ্ডার সংগ্রহ করেছেন।

বাংলা বর্ণমালার প্রায় সব বর্ণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় এক একটি অর্থবোধক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মূলত এখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বাংলা বর্ণমালার প্রায় প্রতিটি বর্ণ দিয়ে কীভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক শব্দ গঠন করা যায়। তবে এখানে বাংলা স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জন বর্ণের কয়েকটি বর্ণ ব্যবহার করা হয় নি।
অ- বাংলা স্বরবর্ণমালার প্রথম বর্ণ। বলা যেতে পারে এটি বাংলা ভাষার প্রথম বর্ণ। স্থানীয় ভাষায় ‘অ’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। ‘অ’ বর্ণ দিয়ে নিজের উপস্থিতি প্রকাশ করে। এছাড়াও ‘অ’ বর্ণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘ওহে’ বা ‘ওগো’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
আ- বাংলা স্বরবর্ণমালার দ্বিতীয় বর্ণ। স্থানীয় ভাষায় ‘আ’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। ‘আ’ বর্ণ ব্যথাসূচক মুখের স্বগোক্তি। যেমন শরীরের কোথাও ব্যথা লাগলে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘আ’ তথা ‘আহ্’ শব্দ।

ই- স্থানীয় ভাষায় ‘ই’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। নিকটতর কোনা বস্তু চিহ্নিত করা বা নিকটতর কিছু নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে দেখা বোঝাতে ‘ই’ ব্যবহার করা হয়।
উ- স্থানীয় ভাষায় ‘উ’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। আঘাতজনিত মুখ থেকে প্রথম যে শব্দটি বের হয় তা হচ্ছে ‘উ’। পাশাপাশি কোনো দুঃসংবাদ শুনলেও ‘উ’ শব্দ মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। আবার অনেক দূর থেকে কারো ডাক বা আহবানের সাড়া দেওয়ার জন্য ‘উ’ বর্ণ ব্যবহার করা হয়।

এ- স্থানীয় ভাষায় ‘এ’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। ‘এ’ সম্বোধনের উত্তর, নিজের উপস্থিতি প্রমাণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কথোপকথনের সময় কারো কথার প্রতিউত্তর বা কারো কথার সমর্থনে ‘এ’ বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
ঐ- স্থানীয় ভাষায় ‘ঐ’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। কোনো কিছুকে নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা বা দেখিয়ে দেয়ার জন্য ‘ঐ’ বর্ণ ব্যবহৃত হয়। যেমন- ঐখানে।
ও- স্থানীয় ভাষায় ‘ও’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ও’ এবং ‘উ’ বলতে গেলে প্রায় একই অর্থবোধক বর্ণ। আঘাত বা দুঃসংবাদ শুনে মুখ থেকে প্রথম যে শব্দটি বের হয় তা হচ্ছে ‘ও’। আবার অনেক দূর থেকে কারো ডাক বা আহবানের সাড়া দেওয়ার জন্য ‘ও’ বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
ঔ- স্থানীয় ভাষায় ‘ঔ’ একটি পূর্ণ অর্থবোধক বর্ণ। কারো ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ‘ঔ’ বর্ণ ব্যবহার করা হয়।
ক১- বাংলা ব্যঞ্জন বর্ণমালার প্রথম বর্ণ। স্থানীয় ভাষায় ‘ক’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। যেমন- ক১Ñ কহ, কও, কওয়া, কইয়ো। ক২- বমি। (আরবি ‘ক্বয়’ শব্দটি বাংলা ভাষায় ‘কয়’ হিসেবে এসেছে। উক্ত ‘কয়’ শব্দটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের চরিত্র অনুযায়ী আরো সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘ক’তে এসে দাঁড়িয়েছে। যেমন বলা যেতে পারে ‘তুই ‘ক’ ন গরিচ’-এর মানভাষায় ‘তুই বমি করিস না।)
খ- স্থানীয় ভাষায় ‘খ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘খ’ বর্ণ দিয়ে কাউকে খাওয়ার জন্য নির্দেশ বা আহবান করা হয়। যেমন-এটা, ওটা ‘খ’ (এটা, ওটা খাও)। যেমন- ‘খ’ না (খেয়ে নাও), ইয়ান ন ‘খ’-র কিয়া (এটা খাচ্ছো না কেনো?) । ‘খ’ বর্ণ উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধ্বনিতত্ত্বের বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। এখানে মহাপ্রাণের ব্যবহার লক্ষণীয়।
গ- স্থানীয় ভাষায় ‘গ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘গ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কাউকে গান গাওয়ার জন্য আহবান জানানো হয়। যেমন- তুই গ (তুমি গাও)।
ঘ-স্থানীয় ভাষায় ‘ঘ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ঘ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ঘষা-মাজা করা বোঝানো হয়। যেমন-‘তুই এড়ে ন ‘ঘ’-ইচ’ (তুমি এখানে ঘষা-মাজা করো না)। ‘ঘ’ বর্ণ উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধ্বনিতত্ত্বের বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। এখানে মহাপ্রাণের ব্যবহার লক্ষণীয়।
চ- স্থানীয় ভাষায় ‘চ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘চ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কোনো কিছু চাওয়া, দেখা বা পরিদর্শনকে নির্দেশ করে। এছাড়াও ‘চ’ বর্ণ দিয়ে জমি চাষ করাও বোঝায়। যেমন- তুঁই ‘চ’ গই অর্থাৎ ‘তুমি গিয়ে দেখ’। আবার একই বাক্যের ভিন্ন অর্থ বুঝাতে ‘তুঁই ‘চ’ গই’ অর্থাৎ ‘তুমি গিয়ে (জমি) চাষ কর’। কবি’র ভাষায় বলতে হয়-‘চ-রে পারাইল্যা ভাইয়ান নথের ঢুলানি’।
ছ- স্থানীয় ভাষায় ‘ছ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ছ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে যে কোনো কিছুর ছানা বা বাচুরকে নির্দেশ করে। যেমন-কুরার ছ, গরুর ছ, ছাগলের ছ, কুকুরের ছ, বিড়ালের ছ ইত্যাদি। ‘ছ’ বর্ণ উচ্চারণের ক্ষেত্রে ধ্বনিতত্ত্বের বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। এখানে মহাপ্রাণের ব্যবহার লক্ষণীয়।
জ- স্থানীয় ভাষায় ‘জ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘জ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে জাওয়ার (যাওয়ার) জন্য নির্দেশ করা হয়। যেমন- তুঁই জ (য) (তুমি যাও)।
ট-স্থানীয় ভাষায় ‘ট’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ট’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে বেকার ঘুরাঘুরি করা অর্থে বোঝায়। যেমন- ‘ট’ ‘ট’ ন গরিচ (ঘুরাঘুরি করো না)।
ত- স্থানীয় ভাষায় ‘ত’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ত’ বর্ণ স্থানীয়ভাবে প্রশ্নবোধক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও ঘরে রক্ষিত বাসি তরকারি গরম দেওয়া অর্থে ‘ত’ ব্যবহৃত হয়। যেমন- ‘ত’ অর্থে ‘ত-অ’ (তবু), তও (তবু) অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‘তরকারি ত দেয়’ (তরকারি গরম দাও)।
থ- স্থানীয় ভাষায় ‘থ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘থ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্নবোধক শব্দ বা অবাক হওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন- তারে দেই আঁই ‘থ’ হই গিই (তাকে দেখে আমি ‘থ’ বনে গেলাম)। ‘থ’ বর্ণ উচ্চারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধ্বনিতত্ত্বের বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। এখানে মহাপ্রাণের ব্যবহার লক্ষণীয়।
দ- স্থানীয় ভাষায় ‘দ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘দ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছু দেওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন-তারে ভাত দ (তাকে ভাত দাও)। লোহার তৈরি দা’কে স্থানীয়ভাবে ‘দ’ বলা হয়। যেমন- বলা যেতে পারে ‘আঁরে ‘দ’ গান দ (আমাকে ‘দা’ টা দাও)।
ধ- স্থানীয় ভাষায় ‘ধ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ধ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ধাওয়া বা পালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশসূচক বাক্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- তুঁই ধ-গৈ (তুমি পালিয়ে যাও)। ‘ধ’ বর্ণ উচ্চারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধ্বনিতত্ত্বের বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। এখানে মহাপ্রাণের ব্যবহার লক্ষণীয়।
ন-স্থানীয় ভাষায় ‘ন’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ন’ বর্ণটি স্থানীয়ভাবে না, নৌকা বা নাও, নয় বা ৯ ও নঅয় অর্থে ব্যবহৃত হয়। ‘ন’ বর্ণের বিভিন্ন ব্যবহার রয়েছে। ‘ন’ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘না’ বা ‘নঅয়’ (নহে) সূচক উত্তরও ব্যবহার করা হয়। যেমন-আঁই ‘ন’ যাইয়ুম (আমি যাব না)। আবার ‘ন’ অর্থে নৌকা, যেমন- আঁর ‘ন’ তে যা (আমার নৌকাতে যাও)। অন্যদিকে ‘ন’ অর্থে গুণিতকের ৭, ৮, ৯, ১০ বা ‘নয়’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যদিও ‘ন’ বর্ণটি বাংলা বর্ণমালার একটি বর্ণ কিন্তু স্থানীয়ভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফার্সী ‘নাও্’ শব্দটি স্থানীয় ভাবে বিকৃত হয়ে ‘ন’ হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে।) উপরের কয়েকটি বর্ণের মতো ‘ন’ বর্ণের ভিন্ন অর্থও প্রকাশ করে।
প- স্থানীয় ভাষায় ‘প’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘প’ বর্ণ দিয়েও স্থানীয়ভাবে ‘প’, ‘প’ করা বোঝায়। ‘প’, ‘প’ বলতে কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে কারো পেছনে ঘুরাঘুরি করা। উপরের কয়েকটি বর্ণের মতো, ‘প’ বর্ণের ভিন্ন অর্থও দেখা যায়। কিছু পাওয়া অর্থেও ‘প’ ব্যবহৃত হয়। যেমন- কিছু প-নে (কিছু পাওয়া যায়?)।
ফ- স্থানীয় ভাষায় ‘ফ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ফ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে গালের ‘ফ’ কে নির্দেশ করে। ‘ফ’ বর্ণ উচ্চারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধ্বনিতত্ত্বের বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। এখানে মহাপ্রাণের ব্যবহার লক্ষণীয়।
ব- স্থানীয় ভাষায় ‘ব’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ব’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘বঅ’, ‘বওয়া’, ‘বসা’, ‘বহন করা’, ‘বেয়ে নেয়া’, ‘নৌকা বেয়ে নেয়া’ ইত্যাদি বোঝায়। যেমন-তুমি বসো বোঝাতে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘তুই ব’, নৌকা বেয়ে নেয়া বুঝাতে ‘তুঁই ‘ন’ ‘ব’ (তুমি নৌকা বাও?)। এছাড়াও গরুকে থামার জন্য স্থানীয়ভাবে ‘ব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন-গরুকে থামার জন্য ‘ব’ ‘ব’ শব্দ ব্যবহার করা হয়।
ভ- স্থানীয় ভাষায় ‘ভ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ভ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কোনো কিছু ভাঙ্গার জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন- তুঁই ইয়ান ‘ভ’ চাই (তুমি এটা ভাঙ্গো দেখি?)। ‘ভ’ এর ভিন্ন অর্থও চোখে পড়ার মতো। যেমন- কৌশল অবলম্বন করে ‘ভান’ ধরাকে স্থানীয়ভাবে ‘ভ’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন- তুই ভ ন ধরিচ (তুমি ভান ধরো না)। এছাড়াও ‘ভ’ অর্থে রীতিনীতি বা আইনকানুনকেও বুঝায়। এক্ষেত্রে একটি প্রবাদও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। যেমন- হ দেইখখছ ভ ন দেখছ। ‘ভ’ বর্ণ উচ্চারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধ্বনিতত্ত্বের বিষয়টি চোখে পড়ার মতো। এখানে মহাপ্রাণের ব্যবহার লক্ষণীয়।
ম- স্থানীয় ভাষায় ‘ম’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণের পরে একটি শিশুর মুখ থেকে সর্বপ্রথম যে শব্দটি বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে ‘ম’। ‘ম’ বর্ণটি ক্রমেই ‘মা’ শব্দে রূপলাভ করে। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে ছাগলের মুখ থেকে যে শব্দটি বের হয় তাও ‘ম’।
য- স্থানীয় ভাষায় ‘য’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘জ’ বর্ষের ন্যায় স্থানীয়ভাবে আদেশসূচক যাওয়া অর্থে ‘য’ ব্যবহার করা হয়। যেমন-তুই য (তুমি যাও)।
র- স্থানীয় ভাষায় ‘র’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘র’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে অপেক্ষা বা সবুর করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ‘র’, ‘র’ আওয়াজ করে সাপুড়ে সাপের খেলা দেখাবার সময় ব্যবহার করে। যদিও সাপুড়েরা স্থানীয় ভাষাভাষী নয়। উপরের কয়েকটি বর্ণের মতো ‘র’-এরও ভিন্ন অর্থ চোখে পড়ে। ‘র’ বর্ণ দিয়ে কাকেও হুমকি দেওয়া হয়। যেমন- তুঁই ‘র’ ন খুলিছ (তুমি শব্দ করো না বা তুমি মুখে ‘র’ করবে না)।
ল- স্থানীয় ভাষায় ‘ল’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘ল’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছু ধরা বা নেওয়াকে বোঝানো হয়। যেমন-তুই ওয়ান ল (তুমি ওটা নাও)। ‘ল’-এর ভিন্ন অর্থ ও ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। যেমন- ‘হাজির’ অর্থেও ‘ল’ ব্যবহার করা হয়। আরবি শব্দ লব্বাইক (হাজির)-এর সংক্ষিপ্তকরণ ‘ল’। যেমন- পূর্বে কাউকে ডাকলে তিনি প্রতিউত্তরে শুধু তাঁর উপস্থিতি বুঝাবার জন্য ‘ল’ বলেই সাড়া দিতো। আরবি লব্বায়েক থেকে ‘ল’ হয়েছে যার অর্থ আমি হাজির আছি। যা এখন মোটেই ব্যবহার হয় না।
শ- স্থানীয় ভাষায় ‘শ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘শ’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘শতক’ বা ‘শত’ কে বোঝানো হয়। যেমন- শÑ শঅ, কতশ’।
স- স্থানীয় ভাষায় ‘স’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। ‘শ’ বর্ণের ন্যায় ‘স’ বর্ণ দিয়ে স্থানীয়ভাবে ‘শতক’ বা ‘শ’ কে বোঝানো হয়। যেমন- স স।
হ- স্থানীয় ভাষায় ‘হ’ একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থবোধক বর্ণ। উত্তরসূচক ‘হ্যাঁ’-এর জন্য ‘হ’ ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে ‘হ’ বর্ণ দিয়ে সাঁকোকে বোঝানো হয়। যেমন-‘অ পঅলা হ ন লারিচ’ (পাগলা, সাঁকো নাড়িছ না)।

লেখক- লোকসাহিত্য-ইতিহাস গবেষক, সাংবাদিক, সভাপতি, কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী ও আহবায়ক, কক্সবাজার ইতিহাস গবেষণা পরিষদ।