নবান্ন উৎসবে শেকড়ের সন্ধান

নগর সংস্কৃতিতে বুঁদ হয়ে বাংলার হাজার বছরের কৃষ্টি-কালচার ভুলতে বসা নবপ্রজন্মকে মাটির কাছে ফিরিয়ে নিতে রাজধানীতে শুরু হয়েছে নবান্ন নবান্ন উৎসব।
প্রতিবছরের মতো এবারও অগ্রহায়ণের প্রথম দিন, নতুন ফসল ঘরে তোলার দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় যেন সব প্রাণ মিলেছে শেকড়ের খোঁজে।খবর বিডিনিউজের।

মঙ্গলবার সকাল ৮টায় জাতীয় নবান্ন উৎসব উদযাপন পর্ষদ আয়োজিত ‘এসো মিলি সবে নবান্ন উৎসবে’ শিরোনামের উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

সূচনালগ্নে নবান্ন উৎসবকে বাঙালির সংস্কৃতির ‘অন্যতম উল্লেখযোগ্য’ অনুষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “যে কৃষি আমাদের জীবনপ্রবাহ নিশ্চিত করে, তা নিয়েই তো আজকের এই উৎসব।

“এ উৎসবে এসে কি জাতি, কি ধর্ম, কি বর্ণ- তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আজ আমরা এক দেহে লীন হয়ে গেছি। আজ আমাদের সবার একটাই পরিচয়, আমরা বাঙালি। এই তো উৎসবের মাহাত্ম্য।”

নবান্ন কথন পর্বে অংশ নেন উৎসব উদযাপন পরিষদের কো-চেয়ারম্যান শুভ রহমান, চেয়ারম্যান লায়লা হাসান, বক্তব্য দেন উৎসবের সহযোগী ল্যাবএইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম শামীম।

লায়লা হাসান নবান্ন উৎসবকে জাতীয়ভাবে উদযাপন ও এই দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটি দাবি করেন।

এর আগে সকাল ৭টায় এস এম মোর্তজা বশীর মুরাদের বংশীবাদনে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর স্বভূমি লেখক শিল্পী কেন্দ্র পরিবেশন করে দেশাত্মবোধক গান ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ লাবণ্য’।

সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর ‘আবার জমবে মেলা হাটখোলা’-গণসংগীত পরিবেশনার পর নৃত্য পরিবেশনায় আসে নৃত্যজন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গারোদের নাচের দল আচিক নাচের মুদ্রায় তুলে ধরে জুম চাষের নানা পদ্ধতি।

দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নন্দন কলাকেন্দ্র ও কাঁদামাটি। দলীয় সংগৗত পরিবেশন করে আনন্দন, বহ্নিশিখা, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। একক সংগীত পরিবেশন করেন ফরিদা পারভিন, তানভির সজিব, অনিমা রায়।

উৎসবে এসেছেন এ প্রজন্মের অভিনেত্রী শান্তা রহমান। পিরোজপুরে নানাবাড়িতে দেখা নবান্ন উৎসবের স্মৃতি ‘খুব পোড়ায়’ তাকে।

“নগরের এ উৎসব তো গুটিকয়েক মানুষের জন্য। আসল উৎসব তো গ্রামে। গ্রামে থাকতে দেখেছি, সেখানে নবান্ন উপলক্ষে কৃষকের ঘরে ঘরে আনন্দের ধুম লাগে। সে উৎসবের ছিঁটেফোঁটাও তো ঢাকায় পাব না।

“তবে কী, আমাদের ফুরসত তো নেই। তাই নাগরিক উৎসবে আমরা যত শামিল হব, ততই আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে জানব। শেকড়ের টানে বাঙালি সংস্কৃতিকে লালনের পাশাপাশি ছড়িয়েও দিতে পারবো আমরা।”

পাকা ধানের ঘ্রাণ, কাস্তে হাতে কৃষাণের ছুটে চলা, কৃষাণীর ধান মাড়াইয়ের দৃশ্য- গ্রামবাংলার চিরায়ত এই দৃশ্যর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উম্মে সাহারা ও নেত্রকোণার লিজা আক্তারের মন থেকে এখনও ভুলে যায়নি।

লিজা বলেন, “এই সেদিনও নবান্ন উৎসব দেখেছি। সে কী ধুম লাগে। নতুন ধান উঠে ঘরে, ঘরে ঘরে পিঠাপুলির উৎসব। সে কি ভোলা যায়?”

পিঠাপুলির উৎসবের কথা শোনান গোপালগঞ্জের পারুলিয়া গ্রামের সুরাইয়া পারভিন। পিঠা নিয়ে নানা ‘সংস্কার’ এর কথাও বলেন।

“নতুন ধান ঘরে এলেই নতুন পিঠা তৈরি হবে। প্রথম পিঠাটি চুলার পাশে রেখে দিতেন মায়েরা। নতুন ধানের চালে ক্ষির-পায়েস তৈরি করে পাঠানো হত মসজিদে। কতদিন পেরিয়ে গেছে। ঢাকায় তো এসবের কিছু নেই। ছেলেমেয়েরা কত কিছু দেখে না।”

চট্টগ্রামের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, “প্রকৃত উৎসব দেখতে হলে যেতে হবে মাটির কাছে। ঢাকায় থেকে এ উৎসবের কিছুই বোঝা যাবে না।”

উৎসব দেখতে এসে নন্দিতা দাশ বলেন, “শহরে কখন ছয়টি ঋতু আসে, কখন যে চলে যায় বোঝা যায় না। এ উৎসবগুলো এসে মনে করিয়ে দেয়, আমাদের দেশটি ষড়ঋতুর দেশ। উৎসব নিয়ে আরও অনেক জানা-বোঝার রয়েছে আমাদের।”

আয়োজকরা জানিয়েছেন, উৎসবের প্রথম পর্ব শেষ হবে বেলা ১২টায়। এরপর বিকাল ৪টায় দ্বিতীয় পর্বটি চলবে চারুকলার বকুলতলা ও ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে।