রসরাজ বিলে মাছ ধরছিল, ফোন ছিল বাড়িতে

রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে যখন ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার ছবি পোস্ট দেওয়া হয়, তখন অভিযুক্ত রসরাজ বিলে মাছ ধরছিল। তার স্যামসাং এনড্রয়েড মোবাইলফোন সেটটি তখন বাড়িতে ছিল। ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি জেনে সে বাড়ি ছুটে যায়। ডিবি পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য জানিয়েছে রসরাজ। রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউনের।

ডিবি পুলিশের একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, ‘এসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে।’

রসরাজের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়,‘তার নামে ফেসবুক আইডি থাকলেও পাসওয়ার্ড সে জানে না।’ সূত্রটি আরও জানায়, ‘ফেসবুকে ছবি পোস্টের পর তা ডিলিট করা ও ক্ষমা চেয়ে স্ট্যাটাস দেওয়ার কাজটি যে অন্য কেউ করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। উত্তেজনা প্রশমন করতে রসরাজের ভাই হৃদয়ের কাছ থেকে ওই মোবাইলফোন নিয়ে আশুতোষ নামে এক যুবক ওই স্ট্যাটাস দেয়। তবে স্ট্যাটাস দেওয়ার সময় রসরাজ গ্রেফতার ছিল।’

এদিকে রবিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরের আশুতোষ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. ছায়েদুল হক বলেন, ‘রসরাজ দাস ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার ওই ছবি আপলোড করেনি। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছবিটি ঢাকা থেকে পোস্ট করা হয়েছে। কারা এই ছবিটি পোস্ট করেছে, তার তদন্তও চলছে। এই ছবিটি এখন ফরেনসিক ল্যাবে আছে। নাসিরনগরের দুই-চারটা লোক এই ষড়যন্ত্র করছে।’
এ সময় সাংবাদিকরা ষড়যন্ত্রকারীদের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা ষড়যন্ত্র করছে, আমি সবসময় তাদের মোকাবিলা করে আসছি।’

রসরাজের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মিজান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘রিমান্ডে রসরাজ বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে। আমরা এখনও তার বক্তব্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইনি।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডিবির ওসি মো. মফিজ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শনিবার মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। এর পরই আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রসরাজ ছবি আপলোডের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।’
এদিকে ঘটনার পর থেকেই রসরাজের বাড়িতে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কোথায় আছে, তাও কেউ জানে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আব্দুল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা একাধিকবার তার বাড়িতে গিয়েছি। কিন্তু তার পরিবারের লোকজনকে সেখানে পাওয়া যায়নি। তারা কোথায় আছে, সে ব্যাপারে পুলিশের কাছে কোনও তথ্য নেই।’

নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি, রসরাজের ফেসবুক আইডিটি স্থানীয় আরও এক যুবক ব্যবহার করতো। রসরাজ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে। ফলে তার পক্ষে এভাবে ছবি এডিট করা কোনোভাবেই সম্ভব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মোবাইল বিল নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে কোনও একটি পক্ষ রসরাজকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।’

শনিবার রসরাজের বাড়িতে যায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবিরের নেতত্বে ২০ সদস্যের প্রতিনিধি দল। পরে শাহরিয়ার কবির সাংবাদিকদের জানান, ‘রসরাজের ঘরে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ছবি রয়েছে। যে মুসলমান ক্রিকেটারের ছবি ঘরে সাঁটিয়ে রাখে সে কখনও এত সাম্প্রদায়িক আচরণ করতে পারে না। এছাড়া সে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, রসরাজ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শিকার। তাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
ওই প্রতিনিধি দলের সদস্য সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক দাবি করেন, ‘রসরাজের পক্ষে কোনও আইনজীবীকে লড়তে দেওয়া হয়নি। তার পক্ষে একজন ওকালতনামা জমা দিতে চাইলে বিচারক সেটা গ্রহণ করেননি। রসরাজের কোনও কথা না শুনেই তাকে রিমান্ডে দেওয়া হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে রবিবার নাসিরনগরে বেশ কিছু মন্দির এবং বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে রসরাজকে গ্রেফতারের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালতে নেওয়া হয়। পুলিশ সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে শুনানি শেষে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান সোহাগ উদ্দিন তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।